মসজিদে মসজিদে সম্প্রীতির আহ্বান

আপডেট: অক্টোবর ১৬, ২০২১, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক :


কুমিল্লার পূজান্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। দেশের কয়েকটি জায়গায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা রোধে তৎপর ছিলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জুমা’র নামাজ শেষে নগরীতে বিক্ষোভ, সমাবেশ এড়াতে মসজিদগুলোর সামনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারও করা হয়েছিলো। আর রাজশাহীর মসজিদে মসজিদে মুসল্লিদের সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানালেন খতিবরা। একইসঙ্গে এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে দোষীদের শাস্তির দাবিও জানান তারা।

জুমা’র নামাজে মসজিদগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন খতিবরা। শুক্রবার (১৫ অক্টোবর) নগরীর দড়িখরবোনা জামে মসজিদ, গ্রেটার রোড জামে মসজিদ, উপশহর মডেল মসজিদ, সাহেববাজার বড়মসজিদসহ আরও কয়েকটি মসজিদ ঘুরে দেখা যায়, খতিবরা মুসল্লিদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে কোরআন ও হাদিস থেকে বক্তব্য রাখছেন। শৃঙ্খলা বজায় রেখে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে খতিবরা বলেন, বাংলাদেশ শান্তি ও সৌহার্দের স্থান।

যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের এমন সহাবস্থান নেই। এদেশে যে যার ধর্ম কর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে পারে। কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার যে ঘটনা ঘটেছে সেটা হিন্দু হোক আর মুসলিম হোক, এ ধরনের কাজে কোনো প্রকৃত ধার্মিকের হাত থাকতে পারে না। এটা বকধার্মিকের কাজ। যা স্পষ্ট উস্কানিমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

খতিবরা আরও বলেন, এদেশের জন্মলগ্ন থেকে সাম্প্রদায়িক যে সম্প্রীতি রয়েছে এই ঘটনা তা নষ্ট করতে পরিকল্পিত নীলনকশাও হতে পারে। দেশের ঈর্ষান্বিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে কিছু দুষ্কৃতিকারী রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়িয়ে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টাও করতে পারে। তাই একজন দায়িত্বশীল মুসলিম হিসেবে এবিষয়ে সকলকে সজাগ থাকতে হবে। এরই মধ্যে দেশের আইন শৃঙ্খলাবাহিনী এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে। এঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানান তারা।

রাজশাহী ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গণশিক্ষা কার্যক্রমের ফিল্ড অফিসার এসএম হুমায়ুন কবির বলেন, কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার যে ঘটনা ঘটেছে তা দুঃখজনক। কোনো ধার্মিক ব্যক্তি সে যে ধর্মের হোক এমন কাজ করতে পারে না। এর মাধ্যমে দুষ্কৃতিকারীরা দেশের সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবিষয়ে মুসল্লিদের সচেতন করতে এরইমধ্যে মসজিদগুলোতে জুমা’র নামাজে এ সর্ম্পকিত বক্তব্য দিতে ইমামদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। এছাড়া তাদের যে জনবল রয়েছে এর মধ্যেমেও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

এদিকে, হাতে হাত রেখে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদহারণ সৃষ্টি করলো নারায়ণগঞ্জের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। পূজা মন্ডপে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে যে কোনো পরিস্থিতিতে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা। এ সময় পূজা মন্ডপের সামনে হিন্দু মুসলিম একে অপরের হাত ধরে উঁচুতে তুলে ধরে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বৃহস্পতিবার (১৪ অক্টোবর) রাতে ফতুল্লার ধর্মগঞ্জ শীর্ষ মহল রাধানগর গোবিন্দ মন্দিরে এ ঘোষণা দেন মুসল্লিরা। এ সময় আয়োজক কমিটির প্রধান দিলীপ কুমার মন্ডল মুসল্লিদের পূজামন্ডপে অভ্যর্থনা জানান।

মন্ডপে মানবিক নারায়ণগঞ্জ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক রোমান চৌধুরী সুমন বলেন, কোনো ধর্মকে অসম্মান করা যাবে না। আমার অনেক হিন্দু বন্ধু আছে যাদের আমি নামাজের সময় বলেছি, আমি নামাজ আদায় করে আসি। সে সময় হিন্দু বন্ধু আমার জন্য মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছে। এ দেশ হিন্দু, বৌদ্ধ সব ধর্মের মানুষের দেশ। হিন্দু ভাইয়েরা যদি আমাদের ইবাদতের সময় মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে পারে। তাহলে আমরা কেন পূজায় তাদের পাশে দাঁড়াবো না?

মন্ডপে মুসল্লিদের আগমন শুভেচ্ছা জানিয়ে আয়োজক কমিটির প্রধান দিলীপ কুমার মন্ডল বলেন, এভাবে সবাই যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে আমাদের মধ্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি সৃষ্টি হবে। একে অপরের ধর্মের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি পাবে। মুসল্লিরা পূজায় এসে ধর্মীয় সৌহার্দ্য সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের অভয় দিয়ে আনন্দিত করেছেন। তাদের এ আগমন সবার জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

মহিলা পরিষদ রাজশাহী জেলার বিবৃতি: কুমিল্লাসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদে তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রাজশাহী জেলা শাখা। জেলা শাখার সভাপতি কল্পনা রায় ও সাধারণ সম্পাদক অঞ্জনা সরকার স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে লক্ষ্য করলাম যে, মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘিপাড়ের একটি পূজা মন্ডপে পরিকল্পিত উস্কানিমূলক ঘটনার প্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা চালানো হয়।

যার কারণে বিভিন্ন পূজা মন্ডপে হামলা ভাংচুর উৎসবে অংশগ্রহণে হেনস্থা, পরিবারের প্রতি সহিংসতাসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে (চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে, চট্টগ্রাম, রংপুর) বেশ কয়েকটি মন্দিরে হামলা ও পুলিশের সাথে হামলাকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সংবাদ আমাদের ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এই অপতৎপরতায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আশংকা প্রকাশ করছে। আমরা মনে করি এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হুমকির মুখে ফেলতে কোন কুচক্রি মহলের ষড়যন্ত্র। সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের শৈথিল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে এধরনের ঘটনার মধ্য দিয়ে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক এবং সহিংস কর্মকান্ড কঠোর হস্তে দমন করার জন্য জোর দাবি জানানো হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এই ঘটনার দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষি ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানাচ্ছে। সেই সাথে সাম্প্রদায়িক উষ্কানিসহ যে কোন ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে সকল সামাজিক শক্তিকে এগিয়ে এসে পাশে থাকার আহবান জানাচ্ছে।