মহন্তের অকালে চলে যাওয়ার দায়ভার কার?

আপডেট: মার্চ ১২, ২০১৭, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



অকালে ঝরে যাওয়া সদালাপী হাস্যোজ্জ্বল, মেধাবী ও বন্ধু সুলভ ছেলেটির সকলকে আপন করে নেয়ার ছিল অসাধারণ ক্ষমতা। পরিবারে সবার ছোট হলেও ছিলেন সবার অভিভাবকের মত। এমন ছেলের অকাল মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নিহত মহন্তের পরিবারসহ পুঠিয়াবাসী। আর ছেলের মৃত্যু শোকে সাতদিন ধরে বাকরুদ্ধ মা কল্পনারানী হালদার। নাওয়া খাওয়া ছেড়ে শুধু চোঁখের পানি ফেলছেন অঝরে। কথাও বলছেন না কারোরই সাথে। আর এমন গুণি বন্ধুর অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছেনা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু-বান্ধবসহ তার অফিসের সহকর্মীরা। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তার মৃত্যু সংবাদে চলছে ঝড়। একইসাথে ক্ষোভও প্রকাশ করছেন শত শত ব্যক্তি। বিনা অপরাধে কেন কর্মস্থলে যোগদানের তিন দিনের মাথায় মহন্তকে বদলি করা হল?
জানা গেছে, গত ১ মার্চ বিকেলে অফিস শেষে জয়পুরহাট জেলা সদরে অটোরিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে পাঁচদিন একটি বেসরকারি হাসপাতালে লাইফ-সাপোর্টে থাকা অবস্থায় কল্পনা রানী হালদারের আদরের ছেলে ৩৪তম বিসিএস, নন ক্যাডার ও সদ্য নিয়োগ পাওয়া সঞ্চয় অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মহন্ত কুমার হালদার (৩২) মারা যায়। তিনি রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ী থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে বারইপাড়া গ্রামের নিখিলচন্দ্র হালদারের ছেলে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, পিচঢালা পথ ধরে চার কক্ষ বিশিষ্ট টিন সেটের বাড়ির গেট ভেদ করতেই বারান্দায় পূর্বদিক হয়ে বসে থাকা একটি বৃদ্ধ নারীকে সবাই ঘিরে আছেন। তিনি কথা বলছেন না, শুধু মানুষের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। হয়তো, সবার মাঝে তার আদরের খোকাকে খুঁজছেন। আর অঝোরে চোঁখের পানি ফেলছেন। মহন্তের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে প্রতিনিয়তই দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিনই আসছেন মানুষ। মহন্তের এতো শুভাকাক্সিক্ষ আছে তা দেখেও অবাক নিহতের পরিবার। কিন্তু সকলের মাঝেই ক্ষোভ অনেক। তাদের প্রশ্ন, মহন্তের অকালে ঝরে যাওয়ার জন্য দায়ি কে? তার কর্ম দপ্তর নাকি শ্রমিকদের অন্যায় অবোরোধ ?
নিহতের ভাই শ্রীমন্ত কুমার হালদার জানান, ঘটনার দিন আহত অবস্থায় মহন্তকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করেন। এর ৬ ঘণ্টা পর সঙ্কটাপণ্ন অবস্থায় তাকে বগুড়া শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেও তার শঙ্কা না কাটায় ভর্তির একদিন পর চিকিৎসকরা মহন্তের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণের নির্দেশ দেন। কিন্তু সে সময় পরিবহন ধর্মঘট থাকায় বিকল্প ব্যবস্থায় মহন্তকে ঢাকায় নিতে পারেন নি তার অসচ্ছল পরিবার। যে কারণে বগুড়ার বেসরকারি হাসপাতাল তেস্লা নিউরোসাইন্স হসপিটালের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ৫ মার্চ রোববার বিকেল ৩টায় হেরে যান মহন্ত।
অসচ্ছল নিখিল চন্দ্র হালদারের তিন ছেলে এক মেয়ের মধ্যে মহন্ত কুমার ছিলেন তৃতীয়। বড় ছেলে পীরগাছা বাজারের পান বিক্রেতা সুমন্ত কুমার হালদার, মেজো ছেলে রাজশাহী কলেজ থেকে মাস্টার্স করা শ্রীমন্ত কুমার হালদার এবং ছোট মেয়ে রত্না রানী হালদার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ করে মাস্টার্স করছেন।
নিহত মহন্ত কুমার হালদার পড়াশোনা ও বন্ধু সুলভ সম্পর্কের দিক থেকে ছিল অনন্য। যে কারণে মাত্র ৩২ বছর বয়সেই হাজারো মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছিলেন। এলাকার শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে পরামর্শ নিতে যেতেন তাঁর কাছে। কিন্তু কখনো মহন্ত কাউকে নিরাশ করেন নি। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, তর্ক-বিতর্ক তো দূরের কথা, মহন্ত কোনদিন কারোর সাথে উচ্চ স্বরে কথাও বলেন নি। বিপদে আপদে শুধু খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে যেতেন মহন্ত।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মহন্ত কুমার হালদার ২০০১ সালে পুঠিয়া পিএন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ থেকে এইসএসসি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ থেকে অনার্স এবং ২০০৯ সালে মাস্টার্স শেষ করেন। এরপর ৩৪তম বিসিএস, নন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে গত ২২ জানুয়ারি সঞ্চয় অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এরপর ২৪ জানুয়ারি যোগদান করেন এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলা সঞ্চয় অফিসের সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের তিন দিনের মাথায় ১৬ ফেব্রুয়ারি অদৃশ্য কারণে সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা স্বাক্ষরিত আদেশে মহন্ত কুমার হালদারকে জয়পুরহাট জেলায় বদলি করা হয়। সেখানেই অফিস শেষে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাযোগে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচদিন পর তার মৃত্যু হয় তার।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ