মহাজ্ঞানী আল্বেরুনী

আপডেট: মার্চ ২১, ২০২০, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

ড. কানাই লাল রায়


হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতি সমন্বয়ের অগ্রপথিক, সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বহুভাষাবিদ্ পণ্ডিত, প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, পরিব্রাজক, সুপ্রসিদ্ধ ‘তারীখ্-উল-হিন্দ্’ গ্রন্থের লেখক মহামনীষী আল্বেরুনী মধ্য এশিয়াস্থ তুর্কীস্থানের অন্তর্গত খোয়ারিজম (বর্তমান খিভা) অঞ্চলের ‘কাস’ নামক স্থানে ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরোনাম আবু রায়হান মুহম্মদ বিন আহম্মদ আল্বেরুনী। ‘বেরুনী’ শব্দের অর্থ বহিরাগত। রাজধানী উরগেঞ্জের লোকেরা শহরের বাইরের লোকজনকে বলত ‘বেরুনী’ বা বহিরাগত। কাস নামক শহরতলী গ্রামে আবু রায়হানের বাড়ি, তাই তিনি ওই ‘বেরুনী’ অভিধা পেয়েছিলেন। আবু রায়হান জাতিতে ছিলেন পারসিক এবং উত্তরাঞ্চলের তুর্কী প্রভাবিত ফারসি তাঁর মাতৃভাষা ছিল।
আল্বেরুনীর পারিবারিক বা বাল্যজীবনের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি তাঁর গ্রন্থে তাঁর দু’জন শিক্ষকের নামোল্লেখ করেছেন। ‘এঁরা হলেন আবু নস্র মনসুর বিন আলী বিন ইরাক জিলানী এবং বাগদাদ র্সখসী। শিক্ষকদের সহযোগিতায় এবং নিজের স্বাভাবিক জ্ঞান স্পৃহার অনুপ্রেরণায় আল্বেরুনী গণিত, জ্যোতিষ, চিকিৎসাশাস্ত্র, ভূবিদ্যা, ইতিহাস, ধর্মতত্ব, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। গজনীর সুলতান মাহ্মুদ কর্তৃক খোয়ারিজম বিজিত হলে পরাজিত পক্ষের অন্যতম প্রতিভূরূপে তিনি ১০১৭ খ্রিস্টাব্দে গজনীতে নীত হয়েছিলেন। মাহ্মুদ পাঞ্জাবের কিয়দংশ স্বীয় সাম্রাজ্যভুক্ত করলে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের এ সকল অঞ্চল পরিদর্শন করবার সুযোগ পান এবং সংস্কৃত ভাষা উত্তমরূপে আয়ত্ত করে হিন্দু শাস্ত্র ও ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা আরম্ভ করেন। ইতিপূর্বেই তিনি স্বীয় মাতৃভাষা ফারসি ছাড়া আরবি, হিব্রু, সিরিয়াক প্রভৃতি ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন এবং গ্রিক ভাষা না জানলেও আরবি ও সিরিয়াক অনুবাদের মাধ্যমে গ্রিক গণিত ও জ্যোতিষ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন।
আল্বেরুনী একাদিক্রমে সাত বছর ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষা বিশেষত সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করে এদেশের জনসাধারণের ও পণ্ডিতশ্রেণির লোকের সঙ্গে যতদূর সম্ভব মেলামেশা করে সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতার দ্বারা যে-জ্ঞান তিনি লাভ করেছিলেন, তাই তাঁর ‘তারীখ্ উল হিন্দ্’ বা ভারতবর্ষের ইতিহাস নামক বিরাট গ্রন্থে লিখে গেছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে গ্রিক ও আরব দর্শন ও বিজ্ঞানের সাথে তার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। আরবি ভাষায় রচিত ‘তারীখ্ উল হিন্দ্’ গ্রন্থটির পুরোনাম তহ্কীক মা লি’ল-হিন্দ্ মিন্ মক্কাল মক্কবুল ফি’ল অক্কল্ অও মর্ধূল’। এই গ্রন্থের আশিটি অধ্যায়ে হিন্দুদের ধর্মতত্ব, সমাজ ব্যবস্থা, আচার ও উৎসবাদি, সাহিত্য, দর্শন, গণিত, বিজ্ঞান, ফলিত জ্যোতিষ, কালগণন পদ্ধতি, ব্যবহারশাস্ত্র, ভূগোল, ব্রহ্মাণ্ডতত্ব, চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্য ও সহানুভূতি সহকারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিষয়ে প্রামাণিক গ্রন্থসমূহের মধ্যে ‘তারীখ্ উল হিন্দ্’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ। এই গ্রন্থ পাঠে একাদশ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অবস্থা সম্পর্কে অতি সুস্পষ্ট ধারণা জন্মে। আল্বেরুনীর রচনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি নিরপেক্ষ দর্শকের মত তন্ন তন্ন করে আলোচনা করে তবে কোনো বিষয় গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং তাতে তাঁর ব্যক্তিগত মতামতের আভাস খুব কমই আছে।
একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বন্দি অবস্থায় সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ভাষা শিক্ষা করা ও ভিন্ন কোনো সভ্যতা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় স্থাপন করা যে কিরূপ কঠিন তা আল্বেরুনী খুলে না বললেও ‘তারীখ্ উল হিন্দ্’ গ্রন্থের প্রস্তাবনায় উল্লিখিত, এই সংক্ষিপ্ত কৈফিয়ত থেকে বোঝা যায়। তিনি লিখেছেন, “হিন্দুদেরকে সম্যকভাবে বোঝা আমারই পক্ষে খুব কষ্টকর হয়েছে, অন্য কারুর ত কথাই নাই, যদি না আল্লাহর অনুগ্রহ তাকে ইচ্ছামত ভ্রমণের স্বাধীনতা না দেয়, যে-স্বাধীনতা আমার অদৃষ্টে ছিল না, কারণ কোনো কাজই আমার ইচ্ছা ও সুবিধামত সম্পন্ন করার সুযোগ ও ক্ষমতা আমার ছিল না।”
ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে পক্ষপাতহীন সঠিক বিবরণ লেখবার প্রেরণা তিনি তাঁর গুরু আবু সোহেলের কাছ থেকে প্রাপ্ত হন। আবু সোহেল কথা প্রসঙ্গে একদিন তাঁকে বলেছিলেন সাধারণ লেখকের একটা প্রধান দোষ এই যে, তাঁরা নিরপেক্ষতার দাবি করেন বটে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেরূপ নিরপেক্ষ হতে পারেন না। তাঁরা যখন অপরের ধর্ম সম্বন্ধে আলোচনা করেন তখন নিরপেক্ষ নীতি একেবারেই বিস্মৃত হয়ে যান। ভারতবর্ষের ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে যেসব গ্রন্থ ফারসিতে আছে, তার বেশির ভাগই জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে লেখাÑ সাক্ষাৎ প্রমাণ ও জ্ঞানের ভিত্তিতে তা রচিত হয়নি।’ সেজন্য তিনি আল্বেরুনীকে বলেন যে, “ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে এমন গ্রন্থ লিখতে হবে যাতে যথার্থ সত্য উদ্ঘাটিত হতে পারে।” তাই আল্বেরুনী অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে গুরুর আদেশ পালন করতে মনস্থ করলেন। আল্বেরুনী তাঁর ‘তারীখ্ উল হিন্দ্’ গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছেনÑ “আমি হিন্দুধর্ম ও সভ্যতা সম্বন্ধে লিখিতে অগ্রসর হইলাম। আমি যদিও মুসলমান, তবুও তাহাদের ধর্ম ও সভ্যতাকে যেমন ভাবে দেখিয়াছি ঠিক সেইভাবে বর্ণনা করিতে কাতর হই নাই। তাহাদের ধর্মনীতি যদিও ইসলামের অনুরূপ নহে, তবুও তাহা কোন রূপ রং ফলাইয়া লিখি নাইÑ ইহা নিরপেক্ষ ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা মাত্র। ইহাতে আমার অতি রঞ্জন কিছুই থাকিবে না।”
তারীখ্-উল-হিন্দ্ গ্রন্থের আসল আরবি নামের অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘বুদ্ধি বিচারে যা গ্রহণযোগ্য আর যা গ্রহণযোগ্য নয়, হিন্দুদের সব রকম চিন্তা-পদ্ধতির সঠিক বর্ণনা।’ প্রকৃতপক্ষেও আল্বেরুনীর ‘তারীখ-উল-হিন্দ্’ গ্রন্থটি হিন্দু-সভ্যতা সংস্কৃতির এবং দশম-একাদশ শতাব্দীর ভারতীয় সমাজের একটি নিখুঁত চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। আল্বেরুনী মনে করতেন, ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নিঃসন্দেহ বটে’, কিন্তু বিজ্ঞান ও দর্শনে ভারতীয় হিন্দুদের কৃতিত্বও অনস্বীকার্য।’ হিন্দুদের যেমন প্রশংসনীয় গুণ আছে, তেমনি তাদের বহু জঘন্য রীতি ও অভ্যাস আছে, যা সভ্য মুসলমানের মনে ঘৃণার উদ্রেক করে। কিন্তু তাঁর ধারণা, এই রীতি ও অভ্যাসের জন্য একমাত্র হিন্দুকেই দোষী মনে করা উচিত নয়, কেননা সে রকম কদাচার ও ভ্রান্তির দৃষ্টান্ত অন্যান্য সভ্য জাতি আরব, গ্রিক, ইরানি ও মুসলমানদের মধ্যেও ত পাওয়া যায়। স্বচ্ছ দৃষ্টি ও নিরপেক্ষ বিচারের সমন্বয়ে তিনি হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতির যে- বর্ণনা দিয়েছেন, তার মধ্যে আভাসে ইঙ্গিতে এই কথাই বার বার বলতে চেয়েছেন।
পাশ্চাত্যের অনেক পণ্ডিত প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের বিষয় আলোচনা করতে যেয়ে নানা ভ্রমে পড়ে যান। কারণ, তাঁরা অনুবাদের অনুবাদ পড়ে সাত নকলে আসলকে হারিয়ে ফেলেন। তাঁরা দশম একাদশ শতাব্দীর ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, উপমহাদেশের হিন্দুরা বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত ছিল, তাদের মধ্যে কোনোরূপ সংহতি বা ঐক্য ছিল না। তারা বহু দেবতার উপাসক এবং ব্রাহ্মণাদি নানা বর্ণে বিভক্ত ছিল। কিন্তু শত পার্থক্যের মধ্যেও যে সমগ্র হিন্দু সমাজে একটা এক জাতীয়তার ভাব ছিল, তীক্ষèদর্শী আল্বেরুনী তা লক্ষ্য করেছিলেন। যদিও দেশে নানাবিধ দেবদেবীর পূজা-অর্চনা ছিল, বর্ণাশ্রম ধর্ম প্রচলিত ছিল, ছিল শক্ত-বৈষ্ণব, শৈব প্রভৃতি নানা সম্প্রদায়-উপসম্প্রদায়, ছিল সেশ্বর-নিরীশ্বর প্রভৃতি বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদÑ তথাপি বিভিন্ন মতাদর্শের সম্প্রদায় উপসম্প্রদায়গুলি পরস্পরের সঙ্গে শান্তি ও শৃঙ্খলার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়েছিল। ধর্ম-সংক্রান্ত ব্যাপারে তর্ক বিতর্ক হত, বিচার হত, কিন্তু বাক্যুদ্ধ কখনও বাহুযুদ্ধে রূপান্তরিত হত না। আল্বেরুনী হিন্দুদের বিভিন্ন দার্শনিক ও অন্যান্য মতবাদ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এসব, আপাত বিরোধী মতবাদ সমূহের মধ্যে একটি সাধারণ ভিত্তি আছে। হিন্দুরা যে একটি অখণ্ড অবিভাজ্য জাতি এবং নানা বিভিন্নতার মাঝেও সমগ্র হিন্দু সমাজে যে একটি সাধারণ ঐক্যের ধারা সতত প্রবহমান ওই একাদশ শতাব্দীতে মনীষী আল্বেরুনীর তা দৃষ্টি এড়ায়নি। বিভিন্ন স্থানে সামাজিক আচার-ব্যবহারে কিছু কিছু ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও, বেরুনী লক্ষ্য করেছেন, সমগ্র উপমহাদেশের হিন্দুদের মধ্যে সেই একই ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও জীবন-সম্বন্ধে একই আদর্শ ছিল। উচ্চশিক্ষিত হিন্দু তথা দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক গোষ্ঠী বহু দেবতাবাদ সম্বন্ধে সমাজের সাধারণ জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক ধারণা পোষণ করতেন। মূর্তিপূজা বা বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতি বিশ্বাস সাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করলেও তাঁরা নিজেরা তাতে প্রগাঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন দেবদেবীর পূজাকে তারা উদারভাবে দেখতেন, যদিও তাঁরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়একমেবাদ্বিতীয়ম্।
উপমহাদেশের ধর্ম ও দর্শনের কিছু কিছু তত্ব আগেই আরবীয় মুসলমানের কাছে পৌঁছেছিল যার একটা অস্পষ্ট অসংলগ্ন ধারণা আল্বেরুনী তাঁর পূর্বসূরিদের রচনায় পেয়েছিলেন। কিন্তু সম্ভবত তিনিই সর্ব প্রথম হিন্দুদের মূলগ্রন্থের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় স্থাপন করেন। গীতার মহদ্ভাবের প্রতি তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর আগে আরবরা এই গ্রন্থটির সংবাদ পেয়েছিলেন বলে মনে হয় না। আল্বেরুনী গীতার সম্পূর্ণ অনুবাদ করেননি বটে, কিন্তু বেশ কয়েকটি দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিয়েছেন তাঁর ‘তারীখ্-উল-হিন্দ্’ গ্রন্থে। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে গ্রন্থটি তিনি সম্পূর্ণ পাঠ করেছিলেন। তেমনি, ‘তারীখ্-উল-হিন্দ্’ গ্রন্থে বেদ, পুরাণ, মনুস্মৃতির সঙ্গে রামায়ণ মহাভারতেরও কিছু কিছু উদ্ধৃতি আছে। বৌদ্ধধর্মের কোনো গ্রন্থ তিনি পাননি, কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষু বা শ্রমণের সঙ্গেও তাঁর দেখা হয়নি। এজন্য আল্বেরুনীর আক্ষেপ ছিল। বৌদ্ধদের সম্বন্ধে তাঁর যৎসামান্য জ্ঞান তাঁর পূর্বসূরি আবুল আব্বাস ইরান শাহরীর অধুনালুপ্ত গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত বলে স্বীকার করেছেন।
‘তারীখ্-উল-হিন্দ্’ ছাড়াও আল্বেরুনী ভারতীয় জ্যোতিঃশাস্ত্রের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিশটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাছাড়া, মহর্ষি কপিলকৃত সাংখ্যদর্শন, পতঞ্জলিকৃত যোগদর্শন, পৌলিশ সিদ্ধান্ত, ব্রহ্মসিদ্ধাস্ত, বৃহৎসংহিতা, খণ্ডখাদ্যক, বরাহমিহিরের লঘুজাতকর্ম প্রভৃতি গ্রন্থ সংস্কৃত থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। এগুলির মধ্যে মাত্র দুটির অর্থাৎ পাতঞ্জলি দর্শন ও রাশিনির্ণয় (রাশিকাতুল হিন্দ্) পুথি আজ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তিনি ইউক্লিড ও টলেমির দুটি গ্রন্থ (সম্ভবত আরবি অনুবাদ থেকে) এবং গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়কারী যন্ত্র-বিষয়ক স্বরচিত একটি গ্রন্থের সংস্কৃত অনুবাদ করেছিলেন। এই অনুবাদগুলি এখন লুপ্ত। আরবি ভাষায় তাঁর অন্য দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব আল্ আসার আল্ বাক্কিয়া আল্ ইল ক্কুরুন্ অল খলিয়’ (বিভিন্ন জাতির কালনিরূপণ শাস্ত্র) ও আল-ক্কানূন অল্্ মাস্দি ফিল্ হইয়া ওয়াল নুজুম্ (জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক)। তাঁর রচিত সব সমেত সাতাশটি গ্রন্থ বর্তমান আছে। যদিও বর্তমানে পণ্ডিতেরা আল্বেরুনীর রচিত একশ আশিটি গ্রন্থের নাম পেয়েছেন।
আল্বেরুনীর নিজের প্রস্তুত তালিকাটি বিষয়ানুযায়ী নিরূপিত। জ্যোতিষ-পদ্ধতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে আঠারটি; বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক তথ্য, আয়তন, দূরত্ব, দিক নির্ণয় ইত্যাদিÑপনেরটি; গণিত পদ্ধতিÑআটটি; সূর্যকিরণ ও ছায়ার বৈজ্ঞানিক তথ্যÑচারটি; জ্যোতির্বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি নির্মাণ বিষয়েÑপাঁচটি; জ্যোতিষশাস্ত্রে শুভাশুভ ফলাফল নির্ণয়Ñবারটি; জ্যোতিষগণনাবিধিÑ সাতটি; উপন্যাস, কাব্য ও অতিপ্রাকৃত কিংবদন্তি-বিষয়কÑ তেরটি; ধর্ম বিশ্বাস ও আচরণ বিষয়েÑছয়টি। আরও ছয়টি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গিয়েছিল।
আল্বেরুনী গজনীতেই পরিণত বয়সে পরলোক গমন করেন। সাধারণভাবে প্রচার ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর ৭ মাস। অবশ্য আল্বেরুনী প্রণীত একটি ভেষজ গ্রন্থে তিনি নিজেই বলেছেন যে, ওই গ্রন্থ প্রণয়নকালে তাঁর বয়স ৮০ বছর অতিক্রম করেছে। সে হিসাবে তার মৃত্যুর তারিখ ১০৫০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে হতে পারে না।
আল্বেরুনী সম্বন্ধে একজন জার্মান পণ্ডিত বলেছেন- “He is the greatest intellectual giant that Islam has ever produced,” তিনি যে মুসলমানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন, তাই নয় তাঁর সমসাময়িককালে তিনি পৃথিবীর একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর জ্ঞান-জিজ্ঞাসা যে কত প্রবল ছিল নিম্নের এই ঘটনা থেকে তা বেশ বোঝা যায় ইয়াকুত রুমী নামক দ্বাদশ শতকের একজন লেখক ‘মুজাবুল আদিববা’ নামক সাহিত্য সাধকদের চরিত্র গ্রন্থে আল্বেরুনীর মৃত্যুকালের একটি ঘটনা তাঁর সমসাময়িক নৈয়ায়িক আবুল হাসানের মুখের কথায় বর্ণনা করেছেনÑ ‘ওস্তাদ আল্বেরুনী যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর, তখন আমি তাঁকে দেখতে গেলাম। সে অবস্থাতেও তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনÑ একদিন তুমি উত্তরাধিকার আইনে মাতামহীর সম্পর্কের শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণয় করার নিয়ম সম্পর্কে কি বলেছিলে? তাঁর অবস্থা দেখে বললাম, এখন কি সে বিষয় আলোচনা করার সময়? তিনি বললেন, বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞতা নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে বিষয়টির জ্ঞান লাভ করে যাওয়া কি তুমি শ্রেয় মনে কর না? অগত্যা আমি বিষয়টির পুনরায় ব্যাখ্যা করলাম। তিনি তা স্মরণ করে নিলেন। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তখনও আমি পথেই ছিলাম এমন সময় কান্নার রোল শোনা গেল। বুঝলাম ওস্তাদ আল্বেরুনী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।”
আল্বেরুনীর ব্যক্তি চরিত্র সম্বন্ধে বলা হয়েছে, কথাবার্তায় তিনি ছিলেন নির্ভীক, স্পষ্ট বাক্ ও অনমনীয়। তবে তাঁর ব্যবহার ছিল ভদ্র, মার্জিত, মিষ্ট ও আন্তরিকতাপূর্ণ। তাঁর দেহ বর্ণ ছিল উজ্বল গৌর, দেহ নাতিদীর্ঘ ও ঈষৎ মেদবহুল।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:
আল্বেরুনীর ভারততত্ব, অধ্যাপক আবু মোহামেদ হাবিবুল্লাহ।
আল্বেরুনী, সত্যেন সেন।
সাধক দারাশিকো, রেজাউল করীম।
ভারত কোষ, ১ম খণ্ড।
বাংলা বিশ্বকোষ, ১ম খণ্ড।
ভারতের ইতিহাস, ড. নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহ ও ড. অনিল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রাচীন বিশ্বসাহিত্য, ড. নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, সাহিত্য সংসদ, ১৯৭৬।
লেখক: প্রফেসর (অবসরপ্রাপ্ত), ভাষা বিভাগ (সংস্কৃত), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।