মহান মে দিবস : চামড়া ও পাদুকা শ্রমিক প্রসঙ্গ

আপডেট: মে ১, ২০২২, ১:০২ পূর্বাহ্ণ

শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ


শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দুর্বার আন্দোলনের রক্তস্রোত স্মৃতি বিজড়িত মে দিবস আজ। ঐতিহাসিক মে দিবস বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ সারাবিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা রক্ষার দিন, ন্যায্য পাওনা তথা অধিকার আদায়ের দিন। পৃথিবীর কোটি কোটি শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কাছে এই দিনটি একদিকে যেমন গৌরবের অপরদিকে নিদারুণ কষ্টের ও ত্যাগের।

আট ঘণ্টাকে প্রমাণ কর্মঘণ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ১৮৮৬ সালের পহেলা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত এক অনন্য গৌরবময় ইতিহাস আজকের দিনটি। মহান মে দিবসের সাথে শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের অধিকার, স্বার্থ ও কল্যাণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শ্রমিকদের প্রতি অবিচারের অবসান ঘটানোর সূতিকাগার এই মে দিবস। মূলত এ কারণেই দিবসটি পৃথিবীর মেহনতি মানুষের কাছে একইসাথে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, আবেগ ও অনুপ্রেরণার। শ্রমিকদের অস্তিত্ব, ন্যায্য পাওনা ও মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে প্রাণ বিসর্জনকারী সকলকে বিন¤্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

১৮৮৬ থেকে ২০২২। ১৩৬ বছরে আমূল পরিবর্তন হয়েছে মানব সমাজ ও সভ্যতার। কিন্তু যথাযথভাবে শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েই গেছে। আমাদের সকল উৎপাদনই শ্রমমুখি। শ্রমিকের অবদান ছাড়া পৃথিবীর তাবৎ উন্নয়ন, সভ্যতা ও অগ্রগতি চিন্তার অতীত।

শ্রমিকের উৎপাদনের উপর মালিকানা ও অংশিদারিত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব প্রকৃত অগ্রগতি। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের সীমা ছিল না। মালিকেরা নামমাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে হতদরিদ্র, মেহনতি মানুষের শ্রম কিনে নিতেন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়েও শ্রমিকেরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হত। ছিল না মর্যাদা; দাস-দাসীর মত জীবন যাপন করতে হতো শ্রমিকদের।

মালিকপক্ষের দিক থেকে প্রাপ্তি ছিল শুধুই সীমাহীন অমর্যাদা, শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন আর শোষণ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে সামনে আগানো ছাড়া আর বিকল্প পথ থাকে না। ঠিক তখনই মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। এই বিষয়গুলোর পুঞ্জিভুত ক্ষোভ থেকেই মে দিবসের রক্তাক্ত ইতিহাস রচিত হয়েছিল।

বিশ্বের ৮০ টির অধিক দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও মে দিবস সরকারি ছুটি হিসেবে স্বীকৃত। ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মে দিবস পালিত হয় এবং স্বাধীনতার পর তা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। বঙ্গবন্ধু ১ মে কে “মহান মে দিবস” হিসেবে স্বীকৃতি দেন। একই সাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের রবিদাস ও ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষ চামড়া ও পাদুকা শিল্পের সাথে যুক্ত। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাকা চামড়া দিয়ে জুতা স্যান্ডেল প্রস্তুতকরণ এবং পুরনো জুতা মেরামতের কাজে সিদ্ধহস্ত এ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ। বংশানুক্রমেই পূর্বপুরুষের সূত্র ধরেই এ কাজের অভিজ্ঞতা তারা অর্জন করে আসছে। জাতীয় অর্থনীতিতে চামড়াশিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও এই জনগোষ্ঠীর মানুষদের অবদানকে ওই অর্থে মূল্যায়ন করা হয়নি।

বর্তমানে এ খাত রপ্তানি আয়ের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও রবিদাস ও ঋষি সম্প্রদায়ের কারিগররা এর অংশীদার হতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা, সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যমান হচ্ছে না। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রের পাশাপাশি এই সম্প্রদায়ের মানুষদের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

যুগ যুগ ধরে মানুষের পায়ের জুতা সৌন্দর্যবর্ধক করণ, মেরামত ও তৈরি করার কাজে নিয়োজিত আছে রবিদাস (চর্মকার/পাদুকাশিল্পী) সম্প্রদায়। বৈশ্বিক মহামারি করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়েছিল সারাদেশের নগর-বন্দর-মফস্বলে কর্মরত এই জনগোষ্ঠীর মানুষ, যার রেশ এখনও কাটেনি।

সেবামূলক পেশায় নিয়োজিত রবিদাসরা দেশের সকল উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে বসবাসরত রয়েছেন। অর্থের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ পর্যায়ের এই জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলি। রবিদাসদের সিংহভাগই রাস্তার পাশে, পাড়া/মহল্লায় বসে অথবা ফেরি (ভাসমান) করে জুতার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। পাদুকা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই থেকে আড়াই কোটি মানুষ যুক্ত। মে দিবসের আজকের এই দিনে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

মহান মে দিবসে বাংলাদেশ তথা ও পৃথিবীর সকল শ্রমজীবী মানুষের প্রতি জানাচ্ছি রক্তিম শুভেচ্ছা ও অভিবাদন। শ্রমিক অধিকার আদায়ের এই শপথের দিনে চামড়া ও পাদুকা শ্রমিকদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বাঁচার দাবিতে রাষ্ট্রসহ সর্বমহলের কাছে

নিম্নলিখিত দাবি জানাচ্ছি : 
(১) সারাদেশে কর্মরত পাদুকা শ্রমিকদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করতে হবে। (২) পাদুকাশিল্পের বিকাশ ও দক্ষ পাদুকাশিল্পী এবং কারিগর গড়ে তুলতে দেশে-বিদেশে বিশেষ বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আশু উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

(৩) পাদুকা শিল্পের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কারখানা স্থাপন, আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে সুদবিহীন ঋণ দিতে হবে। (৪) পাদুকা শিল্পকে জাতীয় শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পাদুকা শিল্পের জন্য আলাদা শিল্পনগরী স্থাপন করতে হবে। (৫) পাদুকা ও চামড়াশিল্পে (সরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রবিদাস ও ঋষি সম্প্রদায়ের দক্ষ জনবল নিয়োগ করতে হবে। (৬) জাতীয় বাজেটে পাদুকা শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা (থোক বরাদ্দ, প্রণোদনা) ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

(৭) চামড়াকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে গণ্য করে কাঁচা চামড়ার উপযুক্ত মূল্য, প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে যুক্ত রবিদাসদের মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। (৮) মধ্যসত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে রবিদাসদের থেকে সরাসরি ন্যায্যমূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। (৯) দেশীয় পাদুকাশিল্প বিকাশের স্বার্থে বিদেশি জুতা আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

(১০) জুতা তৈরির কাঁচামাল ও পণ্যের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে। (১১) জুতা রপ্তানির ক্ষেত্রে উৎপাদনকারকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে হবে। (১২) করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় পাদুকাশিল্প ও পাদুকা শ্রমিকদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে। (১৩) শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দিতে হবে। (১৪) সর্বোপরি পাদুকা ও চামড়া শিল্প বিকাশ ও শ্রমিকদের উন্নয়নের জন্য সরকারের একটি বিশেষ কমিশন গঠন এবং এই কমিশনে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও পাদুকা শ্রমিকদের প্রকৃৃত প্রতিনিধি রাখা নিশ্চিত করতে হবে।

কবি নজরুলের ‘কুলি-মজুর’ কবিতার অংশবিশেষ দিয়েই শেষ করছি:
আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!