মহামান্য হাইকোর্টের রায় ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে রাজশাহী টেনিস কমপ্লেক্স থেকে রাজাকার জাফর ইমামের নাম অনতিবিলম্বে অপসারণ চাই

আপডেট: জুলাই ১১, ২০২০, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

মুস্তাফিজুর রহমান খান:


মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি অবিলম্বে রাজশাহী টেনিস কমপ্লেক্স থেকে কুখ্যাত রাজাকার, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দোসর জাফর ইমামের নাম অপসারণের সুপারিশ করেছে। সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী বিভাগীয় স্টেডিয়াম থেকে জাফর ইমামের ছবি সরিয়ে ফেলার কথা উল্লেখ করেছে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক ৩০ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলামকে আহ্বায়ক এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম ও হাসিনা মমতাজ, উপপরিচালক, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়কে সদস্য করে তিন সদস্য বিশিষ্ট ‘রাজশাহী আন্তর্জাতিক টেনিস কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি’ গঠন করেন।

ইতিপূর্বে ৯৮ জন মুক্তিযোদ্ধা একযোগে রাজশাহী টেনিস কমপ্লেক্স থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী ও স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার আলবদরদের দোসর জাফর ইমামের নাম অপসারণ প্রসঙ্গে জানান যে, স্বাধীনতার ৪৯ বছর আজ অতিবাহিত। স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আলবদর, জামায়াত এবং তাদের নব্য দোসররা আজো সক্রিয় দেশের বিরুদ্ধে, উন্নয়ন ও অগ্রগতির বিরুদ্ধে। তারা পাকিস্তানি শত্রুদের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানামুখি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এমতাবস্থায়, রাজশাহীতে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী রাজাকার আলবদরদের দোসর জাফর ইমামের নামে রাজশাহী আন্তর্জাতিক টেনিস কমপ্লেক্সের নামকরণ দেশ ও জাতির জন্য খুবই লজ্জাজনক এবং গভীর পরিতাপের বিষয়। রাজশাহীর সর্বস্তরের মানুষই জানেন, জাফর ইমাম রাজশাহীতে এনএসএফ এর মূল সংগঠক হিসেবে আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মীদের উপর নানা সময়ে প্রাণঘাতি হামলারও মূল নায়ক ছিলেন। আমরা মুক্তিযোদ্ধা ও রাজশাহীর সর্বস্তরের জনগণ অনতিবিলম্বে কুখ্যাত রাজাকার সহযোগী হত্যা ও সন্ত্রাসের মাস্টারমাইন্ড জাফর ইমামের নাম অপসারণ করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দেশের উচ্চ আদালত আমাদের রক্তার্জিত সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে এদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে রাখা যাবে না বলে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছেন। সম্প্রতি দেশের উচ্চতম আদালত এই মর্মে আরো নির্দেশ দিয়েছেন যে, ২০২০ এর ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশের সকল স্থাপনা থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীতা বিরোধীদের নাম অপসারণ করতে হবে। অতএব, এই বিষয়ে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা আবেদন জানায়।

 

অভিযোগের বিষয়বস্তু
১৯.০১.২০২০ খ্রি. তারিখ রাজশাহী জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ জেলা প্রশাসক, রাজশাহী বরাবর এই মর্মে অভিযোগ দাখিল করেন যে, ‘৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতাকারী ও পাকিস্তানের দোসর জাফর ইমাম এর নামে রাজশাহী আন্তর্জাতিক টেনিস কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তন করে তার নামে রাখা হয়েছে। উক্ত জাফর ইমাম বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী জেলার মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের তালিকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে হত্যা করতে সহযোগিতা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে এত কিছুর অভিযোগ থাকার পরেও রাজশাহী আন্তর্জাতিক টেনিস কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তন করে পাকিস্তানের দোসর জাফর ইমামের নামে উক্ত টেনিস কমপ্লেক্সের নামকরণ করা হয়। তারা এই নাম পরিবর্তনের জন্য তীব্র প্রতিবাদ জানান। সম্প্রতি দেশের উচ্চ আদালত কর্তৃক আমাদের রক্তার্জিত সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে এদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার নাম স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে রাখা যাবে না বলে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন এবং ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে দেশের সকল স্থাপনা থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম অপসারণের আদেশ দিয়েছেন। এমতাবস্থায় তাঁরা রাজশাহী আন্তর্জাতিক টেনিস কমপ্লেক্স হতে জাফর ইমামের নাম এবং রাজশাহী বিভাগীয় স্টেডিয়াম হতে জাফর ইমামের ছবি অপসারণের জন্য দাবি জানিয়েছেন।

 

অভিযুক্ত জাফর ইমাম ৭১’ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিল। উপরোক্ত বিষয়টি প্রমাণের জন্য গৃহীত সকল মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের লিখিত বক্তব্য পর্যালোচনা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সকলের বক্তব্য এবং উপস্থাপিত তথ্যাদি ও ডকুমেন্ট পর্যালোচনায় বক্তব্যের সম** থাকায় সন্দেহতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে তিনি একজন কুখ্যাত রাজাকার এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ছিলেন। তার উদ্যোগেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সহযোগিতায় এনএসএফ (ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন) নামক গু-া ক্যাডার বাহিনী সৃষ্টি করা হয় এবং এই বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ জনগণের ওপর নির্বিচারে নির্যাতন চালায়। জাফর ইমাম এবং তার সহযোগীদের সহায়তায় এবং তাদের প্রদানকৃত তালিকা অনুসরণ করেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজশাহী জেলার অগণিত বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে নির্যাতন করে হত্যা করেছে।

রাজশাহী আন্তর্জাতিক টেনিস কমপ্লেক্স এর নাম জাফর ইমামের নামে নামকরণের ইতিবৃত্ত
উপরোক্ত বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য জাফর ইমাম টেনিস কমপ্লেক্স, রাজশাহী এর সেক্রেটারিকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি প্রেরণের জন্য পত্র প্রেরণ করা হয়। উক্ত পত্রের জবাবে জাফর ইমাম টেনিস কমপ্লেক্সের সেক্রেটারি ২৩.০২.২০২০ খ্রি. তারিখের জেডআইটিসি/এডিএম-তদন্ত/২০২০(১) নং স্মারকপত্রের মাধ্যমে উক্ত টেনিস কমপ্লেক্সের নাম জাফর ইমাম টেনিস কমপ্লেক্স, রাজশাহী নামকরণের বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণি ও অন্যান্য কাগজপত্রাদি প্রেরণ করেন। প্রাপ্ত ডুকুমেন্টস পর্যালোচনা করা হলে দেখা যায় যে, অভিযুক্ত জাফর ইমাম ২০.০৫.২০০৪ খ্রি. তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর ২৩.০৬.২০০৪ খ্রি. তারিখে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় ২২.০৫.২০০৪ খ্রি. তারিখে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় পেশকৃত উক্ত টেনিস কমপ্লেক্সের নাম রাজশাহী টেনিস কমপ্লেক্স হতে পরিবর্তন করে জাফর ইমামের স্মরণে জাফর ইমাম টেনিস কমপ্লেক্স করা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি দৃঢ়করণের ও উক্ত টেনিস কমপ্লেক্সের গঠনতন্ত্রে এই নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রস্তাব পেশ করা হয় এবং আগামী ৩/৪ মাসের মধ্যে সাধারণ সভা আহবান করে সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়াও ২৫.০৬.২০০৪ খ্রি. তারিখ মরহুম জাফর ইমামের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও মাগফেরাত কামনার লক্ষ্যে দিনভর কোরআনখানি অনুষ্ঠান, দুপুরে সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে খাদ্য পরিবেশন এবং আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন মোস্তাক আহমেদ (মৃত), মো. আব্দুর রহমান (মৃত), এ.কিউ.এম ফজলুল হক (মৃত.) মাহমুদ জামিল, রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থা (মোবাইল : ০১৭১১-৮৩৮৪৩৭), মো. আশরাফুল হক, চীফ ইঞ্জিনিয়ার, রাসিক, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১১-৪৬৮৭৯৬) ও এস.এম আজিজুল আলম মন্টু, হেতেমখাঁ, প্রফেসরপাড়া, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১২-২৫০১১০) প্রমুখ। পরবর্তীতে ৩০.০৬.২০০৪ খ্রি. তারিখের টেনিস কমপ্লেক্সের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় উক্ত টেনিস কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তন করে জাফর ইমাম টেনিস কমপ্লেক্স নামকরণের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত দৃঢ়ীকরণ করা হয় এবং উক্ত নামকরণের বিষয়ে গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য ৩ (তিন) সদস্যের একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয। উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন এস.এম আজিজুল আলম মন্টু, হেতেমখা, প্রফেসরপাড়া, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১২-২৫০১১০), এ.কিউ.এম ফজলুল হক (মৃত), মোস্তাক আহমেদ (মৃত), এম.সি.এম আব্দুল্লাহ, আলুপট্টি, বোয়ালিয়া, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৬২৮-৯৪৫০৬৬), মো. আক্কাস আলী, শালবাগান, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১৮-৭০৯৩২৪), মো. আশরাফুল হক, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, রাসিক, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১১-৪৬৮৭৯৬) প্রমুখ। পরবর্তীতে ১১.০৮.২০০৪ খ্রি. তারিখের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণ, টেনিস কমপ্লেক্সের নতুন নামকরণ এবং টেনিস কমপ্লেক্সের যাবতীয় সম্প্রসারণ এবং সংরক্ষণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন এ.কিউ.এম ফজলুল হক (মৃত), মো. খসরু, জোত মহেষ, পাঠানপাড়া, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৫৫৬-৩৩৬০৫৪), মো. মতিউর রহমান জুলিয়াস, সিপাইপাড়া, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১৩-২০০১১১), ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু, কাজলা, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১৫-৬০১৩৫৯), এস.এম আজিজুল আলম মন্টু, হেতেম খা, প্রফেসারপাড়া, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১২-২৫০১১০), মো. এহসানুল হুদা দুলু, নানকিং রেস্টুরেন্ট, সিএন্ডবি মোড়, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৯৩৯-৫৫৫০০০), খোদা বক্স মৃধা (মৃত), ডা. মো. শাহাদত হোসেন রওশন, ঘোষপাড়া, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১৮-৬৯৯১৪১), মো. আক্কাস আলী, শালবাগান, রাজশাহী (মোবাইল : ০১৭১৮-৭০৯৩২৪), মো. নাসির উদ্দিন তরফদার, ঢাকা (মোবাইল : ০১৫৫০-১৫১২৩০), মোস্তাক আহমেদ (মৃত), মো. আশরাফুল হক, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, রাসিক, রাজশাাহী (মোবাইল : ০১৭১১-৪৬৮৭৯৬) ও আব্দুর রহমান (মৃত) প্রমুখ।
সাক্ষ্য বিশ্লেষণ ও বক্তব্য পর্যালোচনা
অভিযোগককারী মুক্তিযোদ্ধাগণ কর্তৃক দাখিলকৃত অভিযোগের এবং তদন্তকালে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি গৃহীত বক্তব্য পর্যালোচনা করা হয়। তাদের দাখিলকৃত সকল বক্তব্য পর্যালোচনায় প্রতীয়মান এই বক্তব্য তাদের প্রত্যেকেরই নিজের বক্তব্য। প্রত্যেকেই আবেদনে দাখিলকৃত বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন। তাদের বক্তব্যে প্রতীয়মান হয় যে, জাফর ইমাম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একজন দোসর ও কুখ্যাত রাজাকার ছিলেন এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি প্রত্যক্ষভাবে পাক হানাদার বাহিনীর সহযোগিতা করেছিলেন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ জনগণকে হত্যা করতে। এছাড়া তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি ছিলেন। তার উদ্যোগে এবং আইয়ুব খানের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজশাহী জেলার এনএসএফ (ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন) নামক সংগঠন গড়ে তোলা হয় এবং তাকে এর সভাপতি নির্বাচিত করা হয়্ তিনি সর্বদা রাজশাহী জেলাস্থ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। সামরিক বাহিনীর অফিসারগণও তাকে তাদের সাথে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অপারেশনে যেতেন। মূলত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টে আইয়ুব খানের আস্থাভাজন হওয়ায় তিনি এসব জঘন্য কাজ করার সাহস পেয়েছিলেন। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের জোহা হলে যে টর্চারসেল ছিল, তিনি সেখানে প্রায়শই যাওয়া আসা করতেন। তার এবং তার সতীর্থদের তৈরিকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা অনুসরণ করেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে আসত এবং অমানুষিক অত্যাচার চালিয়ে তাদেরকে হত্যা করত। এছাড়া রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বদ্ধভূমি এবং বাবলাবন এলাকায় যেসকল হত্যাকা- হয়েছিল সেগুলোর পেছনে তারই পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের বক্তব্য ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণে আরো প্রতীয়মান হয় যে, রাজশাহী জেলার গোয়েন্দা মুক্তিযোদ্ধারা সর্বদা তার সকল পদক্ষেপ গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য রাখতেন। এ কারণেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের গোয়েন্দা রিপোর্টের হিটলিস্টে ২ নম্বরে ছিলেন। সকলের বক্তব্যে একথা স্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে তিনি পাকিস্তানের দোসর ও একজন রাজাকার ছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী শক্তির পক্ষে কাজ করে গেছেন। মহান স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ জয়লাভ করলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং বিনা আবেদনে অনেকদিন তার কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন। তাকে বার বার নোটিশ করার পরেও তিনি তার কর্মক্ষেত্রে হাজির না হলে তার বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ আনা হয় এবং এই বিষয়টি যাচাই করার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তার নিয়মভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তার দুটি বর্ধিত বেতন কর্তন করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসলে জাফর ইমাম আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসেন এবং আদালতের মাধ্যমে পুনরায় শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহীতে তার পদে অধিষ্ঠিত হন। সামরিক সরকারের সময় তিনি তার পূর্ব পরিচয় ও সখ্যতা ব্যবহার করে তার গ্রেড উন্নয়ন করে ৫ম গ্রেডে নিয়ে আসেন এবং তার যোগদানকৃত মূল পদ ক্রীড়া অফিসার এর উন্নতি ঘটিয়ে উপ-ক্রীড়া পরিচালক করেন। এছাড়াও তিনি তার সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থার চিঠির বরাত দিয়ে ৪ (চার) বছরের অধিককাল ছুটিতে দেশ-বিদেশ ভ্রমণসহ অন্যান্য আনুসাঙ্গিক বিভিন্ন সুবিধাদি ভোগ করেন। শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী কর্তৃক দাখিলকৃত ডকুমেন্টসমূহ পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহীতে চাকরিকাল ৫৭ বছর হলেও তিনি চাতুর্যের মাধ্যমে উচ্চ আদালতকে ব্যবহার করেন এবং তার চাকরির মেয়াদ ৬০ বছর করেন। সর্বোপরি ৫৭ থেকে ৬০ এই ৩ (তিন) বছর তিনি কোনো কাজ না করেও তার বেতন, ভাতা, পেনশন সুবিধা বকেয়া উত্তোলন করেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে তার মৃত্যু হলে তার সম্মানার্থে রাজশাহী আন্তর্জাতিক টেনিস কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তন করে তার নামে অর্থাৎ জাফর ইমাম টেনিস কমপ্লেক্স নাম করণ করা হয়। তখন নামকরণকালে বাধা দেননি কেন জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধাগণ জানান, তৎকালীন সরকার ব্যবস্থায় তাদের পক্ষে এ ধরনের সরাসরি প্রতিবাদে ঝুঁকি ছিল। এছাড়া তদন্তকালে আরোও জানা যায় অত্র টেনিস কমপ্লেক্সের জমিদাতাও জাফর ইমাম নন। জাফর ইমাম ব্যক্তিগত কোনো অর্থ/জমি অত্র টেনিস কমপ্লেক্সের জন্য দান করেন নি।

 

মতামত ও সুপারিশ
সকলের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনায় এ কথাই স্পষ্ট হয় যে, জাফর ইমাম তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের পক্ষের ছাত্র সংগঠন এনএসএফ এর পদে অধীন থেকে আইয়ুব খান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষা বোর্ডে একটি ব্যতিক্রমি পদ সৃষ্টি করে সে পদে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত সরকারের ৫ম গ্রেডে বেতন-ভাতাদি, যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা, বিদেশ ভ্রমণ ও পেনশন গ্রহণ করছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা নির্যাতনে সরাসরি ভূমিকা পারন করেছেন। অভিযুক্ত জাফর ইমাম ২০০৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তখন বর্তমান সরকার অর্থাৎ স্বাধীনতার পক্ষের সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন না। যে কারণে সহজেই একটি প্রতিক্রিয়াশীল মহল এই টেনিস কমপ্লেক্সের নামকরণ করে। যেহেতু জাফর ইমাম স্বাধীনতা বিরোধী আইয়ুব, মোনায়েম সরকার তথা পশ্চিম পাকিস্তানি শক্তির সাথে আঁতাত করে বাংলাদেশ মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অত্যন্ত ঘৃণিত ও নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাগণের ওপর নির্যাতন-অত্যাচার করেছেন, যেহেতু মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা হলো দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল স্থাপনা ও সড়ক থেকৈ স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম অপসারণ করতে হবে সেহেতু সকল বিষয়সমূহ সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করে এবং উক্ত তদন্ত কমিটি কর্তৃক নি¤œরূপ মতামত ও সুপারিশসমূহ প্রদান করা হলো :
# অভিযুক্ত জাফর ইমামের নাম উক্ত টেনিস কমপ্লেক্স হতে অপসারণ করে পূর্বের নাম রাজশাহী আন্তর্জাতিক টেনিস কমপ্লেক্সে নামকরণ করা যেতে পারে অথবা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, সিভিল সোসাইটি, জনপ্রতিনিধি ও সর্বোপরি সরকারের দায়িত্বশীলদের মতামতের প্রেক্ষিতে নামকরণ করা যেতে পারে।
# একই সাথে রাজশাহী বিভাগীয় স্টেডিয়াম হতেও তার ছবি অপসারণ করার সুপারিশ করা হলো।

রাজশাহীর মুক্তিযোদ্ধারা অবিলম্বে সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। নতুবা তারা পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হবে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতা।