মাতৃভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

ড. মোহাম্মাদ আজিবার রহমান*:


ভাষা হলো মহান আল্লাহ পাকের দান। পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত পাঁচটি আয়াতের শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ মানুষকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন’। পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) কে সর্বপ্রথম ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। তাই মানুষের কাছে ভাষার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য অধিকারের কোনো মূল্যই নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মাতৃদুগ্ধ ও মাতৃভাষা সমান পুষ্টিকর’। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘নদীর গতিপথ যেমন নির্দেশ করে দেয়া যায় না, ভাষাও তেমনি’। মি. ফ্রিম্যান বলেন, ‘দুনিয়ার সকল মানুষই মাটির ভাষায় কথা বলে’। সুতরাং ভাষা চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। এটা হাজার হাজার বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। তাই ভাষার অধিকার খর্ব মানে জীবনের অধিকার খর্ব করা। ভাষার জন্য পৃথিবীতে বহু সংগ্রাম ও সংঘাত হয়েছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভাষার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা পৃথিবীতে বিরল। ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো- এই সুনাম কি একদিনে অর্জিত হয়েছে? উত্তর আমরা সবাই জানি যে, এ জন্য বহু আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে, রক্ত ঝরাতে হয়েছে। আর এ দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রােেম যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) অন্যতম। আজীবন মাতৃভাষাপ্রেমী এই মহান নেতা ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পূর্ব, ১৯৪৮ সালে রাজপথে আন্দোলন ও কারাবরণ এবং আইন সভার সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে তিনি মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বাংলা ভাষায় প্রণীত সংবিধান। ভাষা আন্দোলনেরই সুদূর প্রসারী ফলশ্রুতি স্বাধীন বাংলাদেশ। এই মহান আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আমাদের একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি সকলকে ছাপিয়ে অর্জন করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির খেতাব। সুতরাং ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
ভাষা আল্লাহর সৃষ্টি
মহান আল্লাহ পৃথিবীর সকল ভাষা সৃষ্টি করেছেন। মানব জাতিকে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতসমূহের মধ্যে মাতৃভাষা অন্যতম। মাতৃভাষার মাধ্যমেই সকল মানুষ তার দেশ-জাতি-সমাজকে উপলব্ধি করতে পারে। পবিত্র ইসলাম ধর্মেও মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। মহানবী (সা.) তাঁর জীবনাদর্শের সর্বত্রই দেশপ্রেম ও বিশুদ্ধ মাতৃভাষার চর্চার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আল্লাহ সব ভাষাই জানেন। মানব জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে মাতৃভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাঁকে ভাষাসহ বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান শিক্ষাদান করেন এবং এর মাধ্যমে ফিরিশতা ও জ্বিন জাতির ওপর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেন। আদম (আ.) এর বংশধরগণ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে ও বিভিন্ন ভাষা বলতে থাকে। কখনো পারস্পরিক ভাষার মিশ্রণে আরেকটি নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে ভাষার ক্রমবিকাশ ও বিস্তৃতি ঘটেছে। মহানবী (সা.) বলেন, ইবরাহীম (আ.) এর বংশে প্রথম বিশুদ্ধ আরবিতে কথা বলেন হযরত ইসমাঈল (আ.), যখন তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর। হযরত নূহ (আ.) এর দুই পুত্র হাম ও সাম এর নামে হেমেটিক ও সেমেটিক দ’ুটি ভাষাগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। তবে সেমেটিক ভাষাই বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে আছে। আফ্রিকার নিগ্রো, বার্বার ও মিসরীয়গণ হেমেটিক হিসেবে কথিত হলেও তাদের ভাষায় বিশেষ করে মিসরীয়দের ভাষায় সেমেটিক ভাষার প্রভাব সর্বাধিক। সামিয়রা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে তাদের ভাষায় তারতম্য দেখা দেয়। তন্মধ্যে প্রধান প্রধান সেমেটিক ভাষাগুলো হলো-আক্কাদিয়ান, ক্যানানাইট, উগারিটিক, অ্যামোরাইট, অ্যারামাইক, দক্ষিণ-এরাবিক ও ইথিওপিক এবং এরাবিক। প্রথমোক্ত ভাষাটি পরবর্তীতে ব্যবিলনিয় এবং আসীরিয় নামে দু’টি স্বতন্ত্র ভাষায় বিভক্ত হয়। ফিলিস্তিনের প্রাচীন নাম ‘কিনআন’ এর নামানুসারে ক্যাননীয় ভাষার উৎপত্তি। হিব্রু এই ভাষার সর্বাধিক প্রচলিত ধারা। হিব্রু ভাষাতেই সবচাইতে বেশি সাহিত্য রচিত হয়েছে। হৃদয়ে উত্থিত ভাষার পরীশিলিত রূপই হল সাহিত্য। তওরাত (Old Testament) এর প্রায় সবটুকু এ ভাষাতেই লেখা হয়েছে। বর্তমান যুগেও ইহুদীরা এ ভাষা ব্যবহার করে থাকে। তবে বহু ভাষা আজ অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। যেমনটি হয়েছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা ল্যাটিনের ক্ষেত্রে। যা বিভক্ত হয়ে বর্তমানে ফরাসী, ইতালীয়, স্পেনীয় প্রভৃতি স্বতন্ত্র ভাষায় রূপলাভ করেছে।
মাতৃভাষায় নবী-রাসূল প্রেরণ
মানুষ সৃষ্টির পর মানুষের মনের ভাব প্রকাশের পদ্ধতি ও তার মাধ্যম ভাষা আল্লাহই মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট ভাষার কথা বলা হয়নি। স্থান, কাল, বর্ণ, গোত্র মানব সমাজে অসংখ্য বিচিত্র ভাষা রয়েছে। তার নিকট সব ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক মানুষের কাছে তার মাতৃভাষার চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন আর কোনো ভাষা নেই। মানুষ ভূমিষ্ট হবার পর মাতৃস্নেহে বেড়ে উঠে এবং ধীরে ধীরে মায়ের ভাষা শিখে মনের ভাব প্রকাশ করে। তাইত, মা, মাতৃভাষা আমাদের অস্তিত্বের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আল্লাহ যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিভিন্ন ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। যিনি যে এলাকার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন, সে এলাকার ভাষাই ছিল তাঁর মাতৃভাষা। তাঁরা তাদের মাতৃভাষায় কথা বলেছেন, প্রচার করেছেন। মাতৃভাষাতেই আসমানী কিতাবাদি অবতীর্ণ হয়েছে। প্রধান চারটি আসমানী কিতাবের মধ্যে মূসা (আ.) এর ওপর ‘তাওরাত’ হিব্রু ভাষায়, হযরত ঈসা (আ.) এর প্রতি ‘ইঞ্জিল’ সুরিয়ানি ভাষায়, হযরত দাঊদ (আ.) এর ‘যবুর’ ইউনানি ভাষায় এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি ‘কুরআন’ আরবি ভাষায় নাযিল করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘এ পৃথিবীতে আমি যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছি, প্রত্যেককে তাঁর মাতৃভাষা তথা স্বজাতির ভাষাভাষি করে পাঠিয়েছি এজন্য যে, তাঁরা যেন মানুষের নিকট আমার দাওয়াত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে পারে।’ অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘তার আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোম-ল ও ভূম-ল সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ অত্র আয়াতে আসমান ও জমিন সৃষ্টি এবং মানুষের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র সৃষ্টিকে আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে ব্যক্ত করা হয়েছে। আসমান ও জমিনের কোনো অস্তিত্ব পূর্বে ছিল না। পরে আল্লাহর হুকুমে অস্তিত্ব লাভ করেছে। অনুরূপভাবে মানুষের ভাষা ও রং-বৈচিত্রের কোনো অস্তিত্ব পূর্বে ছিল না। পরে আল্লাহর হুকুমে অস্তিত্ব লাভ করেছে। কবি বলেন, ‘কথা তো অন্তরেই জন্ম নেয়। ভাষা তো ভাবের প্রকাশকারী মাত্র।’ ভাষার যাদুকরী শক্তিকে উৎসাহিত করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই ভাষার মধ্যে জাদু রয়েছে।’ ভাষাহীন মানুষ বাকশক্তিহীন প্রাণীর সমতুল্য। সুতরাং মানুষের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা আল্লাহর সুনিপুণ সৃষ্টিকৌশলের অন্যতম সুশীলিত বহিঃপ্রকাশ।
পৃথিবীতে প্রায় ৫০০০ ভাষায় মানুষ কথা বলে। তন্মধ্যে ভারতে ১৩০০ ভাষা প্রচলিত। ইসলাম মাতৃভাষার প্রতি এতই গুরুত্ব দিয়েছে যে, আল কুরআন আরবদের বিভিন্ন পঠনরীতিতে পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ জন্য কুরআন পাঠ ‘সাত কিরআত’ (পঠনরীতি) প্রচলিত আছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই কুরআন সাত হরফে বা উপভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব, এসব ভাষার মধ্যে যে ভাষাটি তোমাদের কাছে সহজ হয়, সে ভাষায়ই তোমরা তা পাঠ কর।’ হযরত মুহাম্মাদ (সা.) দোভাষী নিয়োগ করতেন। আন্তজার্তিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য মহানবী (সা.) হযরত যায়িদ বিন সাবিত (রা.) কে হিব্রু, হাবশী, ফারসী, রোমান ইত্যাদি বিদেশি ভাষা শিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি মহানবী (সা.) এর দরবারে ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। বিদেশি ভাষা শিক্ষা করে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বুঝে তাদের চিঠিপত্র পড়া, লেখা ও ভাব বিনিময়ের জন্য তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সাহাবিদের মধ্যে অনেকেই আরবি ছাড়াও অন্যান্য ভাষা যেমন, পারস্য, মিসরীয়, রোমান ও আফ্রিকান ভাষা জানতেন এবং সেসব ভাষাতে উত্তম বক্তৃতা প্রদান করতেন। মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার সৃষ্টিগত তথা জন্মগত অধিকার। আল্লাহ বলেন, ‘দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।’ মানুষের ন্যায় ফিরিশতা, জিন, উড়ন্ত বিহঙ্গপাল এবং অন্যান্য সৃষ্টি সকলেই তাদের নিজ নিজ ভাষা ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে নিরন্তরভাবে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা প্রকাশ করে থাকে। হযরত সুলায়মান (আ.) বিভিন্ন প্রাণীর ভাষা বুঝতে পারতেন। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘সুলায়মান দাঊদের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। বলেছিলেন, হে লোকসকল! আমাকে উড়ন্ত পক্ষীকূলের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং সবকিছু দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব।’
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাযিল করেছি আরবি ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝতে পার।’ আল্লাহ আরো বলেন, ‘আমি যদি আরবি ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় কুরআন পাঠাতাম তাহলে তারা বলত: এর বাক্যগুলো ভাল করে বুঝিয়ে বলা হল না কেন? সেকি! কিতাব আরবিতে নয়- অথচ পয়ম্বর আরব।’ উল্লেখ্য যে, প্রাক-ইসলামী যুগে আরব ভূখ-ের ভাষা ছিল আরবি। তৎকালীন আরববাসীর জীবনযাপন প্রণালী, ধর্মবিশ্বাস, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সুস্থ মানবীয় জীবনের বিপরীত থাকায় ওই যুগকে প্রাক-ইসলামী বা জাহেলি যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। আর সে যুগেই (৫৭০ খ্রিস্টাব্দে) মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। সংগত কারণেই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মাতৃভাষাও ছিল আরবি। তাঁর ওপর অবতীর্ণ আসমানি কিতাব আল-কুরআন আরবি ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়। মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের (বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য) জনগণের মাতৃভাষা ছিল আরবি। মহানবী (সা.) যাতে তাঁর জন্মভূমির অধিবাসীদের কাছে মাতৃভাষায় অতি সহজভাবে আল্লাহ তা‘আলার বাণী প্রচার-প্রসার করতে পারেন, সে জন্যই কুরআন আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়।
অষ্টম-নবম শতাব্দীতে পারস্যে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। সেখানকার অধিবাসীরা ইসলমি গ্রহণ করে তার মৌল ভাবধারা নিজস্ব করে নিয়ে আপন মাতৃভাষায় সকল কিছু অনুবাদ করে নেয়। তাদের জাতীয় জীবনে নবপ্রেরণা দিয়ে যে সাড়া জাগানো আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি হয়েছি, তারই ফলে নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামী সংস্কৃতি প্রভাবিত ভাবধারায় তাদের কাব্য-সাহিত্য তথা জীবনভাষ্য প্রণীত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মানুষের মাতৃভাষার মর্যাদা সমান। তবে অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমে ভাষা উচ্চ মর্যাদার স্থান অধিকার করতে পারে। আর এদিক থেকেই আমরা নিজস্ব ভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করি।
মৌলিক অধিকার
ইসলাম ভাষাগত জাতীয়তার উর্ধ্বে। বিশ্বজনীন ধর্ম হিসেবে সব ভাষাই তার নিজস্ব। মাতৃভাষা চর্চা ও সমৃদ্ধি সাধনের অধিকার সবার রয়েছে। এতে কোন রকম হস্তক্ষেপ করার অধিকার ইসলাম অনুমোদন করে না। মানুষের মানবিক মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে মাতৃভাষা অন্যতম। মাতৃভাষা ছাড়া মনের ভাব প্রকাশ করা দুরূহ ব্যাপার। পৃথিবীতে কোন কবি বা লেখকই তার মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় অমর সাহিত্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হননি। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায় ‘সাহিত্য হবে আমাদের মাতৃভভাষা বাংলায়। পৃথিবীর কোন জাতি জাতীয় সাহিত্য ছেড়ে বিদেশী ভাষায় সাহিত্য রচনা করে ফলবতী হতে পারেনি।’ মহাকবি মাইকেল মধূসুদন দত্তের ন্যায় বিরাট প্রতিভা আজন্ম ইংরেজি ভাষা চর্চা করা সত্ত্বেও ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করে খ্যাতি অর্জন করতে পারেন নি। অবশেষে মাতৃভাষাতেই ফিরে আসতে হয়েছে। বঙ্গভাষা কবিতায় তাইত কবি লিখেছেন, ‘ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি, এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি? যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যা রে ফিরি ঘরে!’ তিনি মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্য চর্চা করেই বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারও অর্জন করেন। স্বকীয় প্রতিভা বিকাশের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম মাতৃভাষা। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘সব মানুষেরই তিনটি করে মা থাকে, জন্মধাত্রী মাতা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি।’ অতুল প্রসাদ সেন লিখেছেন, ‘মোদের গরব, মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা।’ সিকান্দর আবু জাফর-এর ভাষায়,
‘বাংলা ভাষা, আমাদের বাংলা ভাষা
গভীর প্রাণে জড়িয়ে আছে
এই ভাষারই ভালোবাসা।
(চলবে)