মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে নতুন কর্মপরিকল্পনা কার্যকর হবেতো?

আপডেট: জুন ১৮, ২০২২, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


বর্তমান সরকার কর্তৃক ২০১৯ সালে ঘোষিত ‘মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’- এই শ্লোগান নিয়ে মাঠে নেমেছিল মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সাথে ছিল প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা। এই শ্লোগান বাস্তবায়নে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল মাদক বিরোধী সমাবেশ, সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতা সৃষ্টি। মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করতে গিয়ে হয়েছিল বন্দুকযুদ্ধ, নিহত হয়েছিল মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত শতাধিক ব্যক্তি, আটক করা হয়েছিল অনেককে, জব্দ করা হয়েছিল বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, সাংবাদিকদের ডেকে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল।

কয়েক মাসের জন্য মাদক ব্যবসা স্থবির ছিল। কিন্তু তারপরে পুনরায় মাদক ব্যবসা পূর্ণোদ্যমে চালু হয়েছে। যা প্রতিরোধ বা নির্মূল করা তো দূরের কথা নিয়ন্ত্রণ করাই সম্ভব হয়নি। এ যেন মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বড় পরাজয়। মাদকের বিরুদ্ধে জিরোটলারেন্স বাস্তবায়নে নোডাল এজেন্সি হিসেবে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখনো প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু মাদক সৃষ্ট বহুমুখি সমস্যার সমাধান করা অধিদপ্তরের একার পক্ষে সম্ভব নয় বলে স্বীকার করেছে।

অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ফজলুর রহমান সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কর্মশালায় তার বক্তব্যে বলেছেন শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ফলে মাদকের বিষবাস্পে অতিদ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের যুব সমাজ। মাদকের এই করাল গ্রাস থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরোটলারেন্স কর্মসূচির ৩ বছরের মাথায় এমন দায় স্বীকার কোনোভাবেই প্রার্থিত ছিলনা।

শুধু তাই নয়, এ অবস্থার প্রেক্ষিতে ১৭ আগস্ট ২০২১ আন্তঃমন্ত্রণালয় /বিভাগ /দপ্তর /সংস্থার অংশগ্রহণে এক সভায় সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে, মাদক ব্যবহার বন্ধে সমন্বিতভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও এতদসংক্রান্ত অংশিজনদের সমন্বয়ে মাদক নির্মূলে ৩ টি সমন্বিত খসড়া কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এরমধ্যে রয়েছে *মাদকদ্রব্যের চাহিদা হ্রাস *সরবরাহ হ্রাস *মাদকদ্রব্য ব্যবহারজনিত ক্ষতি হ্রাস।

এ কর্মপরিকল্পনার উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে * সীমান্তপথে সকল প্রকার মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ ও পাচার বন্ধ করা *দেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধে এনফোর্সমেন্ট ও আইনি কার্যক্রম জোরদার করা *সমাজের সকল স্তরে মাদক বিরোধী গণসচেতনতা সৃষ্টি করে মাদকদ্রব্যের চোরাচালান ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা *দেশের চিকিৎসা ব্যাবস্থাকে কাজে লাগিয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা *মাদক দ্রব্যের চাহিদা, সরবরাহ ও ক্ষতিহ্রাস সংক্রান্ত কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি সংস্থার সাথে সমন্বয় গড়ে তোলার মাধ্যমে মাদকাসক্তিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া।

গৃহিত এ সকল কর্মপরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য নতুন কিছু নয়। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স পর্যন্ত প্রায় অর্ধ শতাব্দি ধরে একই লক্ষে সকল কর্মপরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নে কাজ করেছে। শুধু মাঝে মাঝে নতুন মোড়কে কিছু পরিবর্তন করে উপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র। আর সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের সমন্বিত সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের যে কথা বলা হয়েছে সেই সহযোগিতা ও সমন্বয়ের অভাব কখনোই দেখা যায়নি।

তা শুধু মাদকদ্রব্য পাচার বা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেই নয়, চোরাচালান, নারী শিশু পাচার, অপরাধীদের আইনের হাতে তুলে দেওয়া, স্বাস্থ্য , পরিবারপরিকল্পনা, মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই সহ প্রতিটি সরকারি কাজে জনসাধারণের সম্পৃক্ততা অংশগ্রহণ ছিলনা এমন ইতিহাস নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে জনসাধারণ সহযোগিতা করতে গিয়ে অপরাধীদের নিপীড়নের শিকার হয়েছে- অথচ আইনি সহায়তা পায়নি।

কর্মশালায় শোনা গেল মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে বিভাগীয় কর্মশালা শেষ করেছে এবং জেলা পর্যায়ের কর্মশালা শুরু হয়েছে। তারপরে উপজেলা পর্যায়ের কর্মশালা শুরু হবে। এই কর্মশালার জন্যই অন্ততপক্ষে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এছাড়াও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় সমাবেশ, প্রশিক্ষণ, গণসচেতনতা, প্রদর্শনী, সম্মানী প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।

সেখানেও অর্থ ব্যয় কম হবেনা। ফলাফল জিরোটলারেন্সের মত বিশাল অভিযান সাথে বন্দুক যুদ্ধ নিহত গ্রেপ্তারের পরেও যা হয়েছে তার চেয়ে বেশি কিছু প্রাপ্তি হবে বলে মনে হয়না। তাই প্রশ্ন থেকে যায় যে ২০১৯ এর জিরোটলারেন্সে মাদক ব্যবসায়ীদের বিপর্যস্ত করার পরেও মাদকদ্রব্যের ব্যবসা ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলোনা কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও বিশেষজনরা যা বলেন তা হলো- *মাদক ব্যবসায় বিনিয়োগকারী বা গডফাদার ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।

তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বরং তারা নতুন নতুন এজেন্ট ও বাহক নিয়োগ দিয়ে নতুন নতুন রুটের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। *সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সকল মাদকদ্রব্য সীমান্তপথে পাচার হয়ে আসে যা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি *বিভিন্ন সময়ে মাদকদ্রব্য আটক হলেও অধিকংশ ক্ষেত্রে আসামী আটক না হওয়া *আটককৃত আসামীদের তাৎক্ষণিক বিচার না হওয়া *মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা না থাকা *সংস্থাটির নামকরণে গলদ থাকা।

অর্থাৎ মাদকদ্রব্য নির্মূল অধিদপ্তর না হয়ে নিয়ন্ত্রণ হওয়ায় তাদের কর্মসূচিও নিয়ন্ত্রণের মত। নির্মূলের মত নয়। গৃহিত এ কর্মসূচি মূলত সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত মাদকদ্রব্যের ক্ষত্রে প্রযোজ্য । সেগুলো হচ্ছে, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, আফিম আইস ইত্যাদি।

এবার দেখা যাক সরকার অনুমোদিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কী ঘটছে। এসকল মাদকদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, তামাক, গুল, তাড়ি, মদসহ বিভিন্ন ইনজেকশন। ইনজেকশনগুলোকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কারণ সেগুলো জরুরি প্রয়োজনে এমনকি রোগিকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন হয়।

কিন্তু সরকার বিড়ি, সিগারেট, তথা তামাক জাতীয় মাদক প্রকাশ্যে সেবন করলে রীতিমত শাস্তির বিধান রয়েছে বহুদিন থেকে। প্রথমদিকে এই বিধান প্রয়োগ হলেও এখন তার প্রয়োগ দেখা যায়না। ফলে প্রকাশ্যে ধুমপান অব্যাহত আছে। বরং সরকার ধুমপায়ীদের জন্য ধুমপান জোন তৈরি করার কথা ভেবেছে।.২০১৯ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা হয়েছিল, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশে তামাক চাষ শূন্যের কোঠায় আনা হবে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তামাক ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে।

এই আইন বস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি হয়েছে কী না জানা যায়নি। তবে এই আইন প্রণয়নের এক বছর আগে তথা ২০১৮ সালে সরকার জাপানের একটি টোবাকো কোম্পানির সাথে ১৫০ কোটি ডলার বা প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার একটি ব্যবসায়িক চুক্তি করে। সেটা নিশ্চয়ই বাতিল হয়নি। জানা গেছে, বিড়ি সিগারেটের অষ্টম বৃহত্তম বাজার বাংলাদেশ। ফলে তামাকের ব্যবসা বন্ধ হয়নি। অথচ তামাক ব্যবহারের ফলে ক্যান্সার রোগ বৃদ্ধি সহ মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে আশঙ্কাজনকভাবে।

এদিকে তালগাছের রস থেকে প্রস্তুত তাড়ি সাঁওতালদের জন্য বৈধ করা আছে বহুকাল থেকে। তেমনি দেশি বিদেশি মদ সমাজের এলিট শ্রেণির জন্য বৈধ করা আছে। এসব মাদকদ্রব্য থেকে যে রাজস্ব আসে তা বাজেটে গণনার মধ্যেই আসেনা, তথাপি মাদক ব্যবসা ও ব্যবহার বন্ধে সরকারের বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই । সুতরাং মাদককে ‘না’ বলুন এই শ্লোগানকে অর্থবহ করতে হলে সরকারি পক্ষ থেকেই প্রথমে কার্যকর করতে হবে ।
লেখক: সাংবাদিক