মাদকের করাল থাবায় আক্রান্ত যুবকরা ফিরে পেতে চায় নতুন জীবন

আপডেট: মে ১১, ২০১৭, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

এমআর রকি, নওগাঁ


প্রতিদিন রুটিন করে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে মাদকের কুফল নিয়ে ক্লাস চলে

জীবনের শুরুতেই ভুল পথের যাত্রী হয়েছিল তারা। আর সে ভুল বুঝতে পেরে নতুন জীবনের আশায় বুক বেঁধেছে এসব যুবক। বর্তমান সমাজে একটি অসাধু চক্রের মাদকের থাবায় আটকে যায় তাদের সুন্দর জীবনের পথ চলা।  যে হাত সমাজ সভ্যতা গড়ে তোলার জন্য কাজ করবে সে হাত আজ নেশার জন্য ব্যবহার হচ্ছে। যে যুবক তার মেধা শক্তি প্রয়োগ করে আগামীর সুন্দর পৃথিবী তৈরির জন্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে সেখানে নেশায় আড়ষ্ঠ হয়ে পুরো জীবনটাই বিপন্ন করে ফেলছে। পরিবারের আদরের সন্তান যখন বাব-মায়ের প্রতিপক্ষ সে অবস্থায় সন্তানকে শোধরানোর জন্য এখন ছুটছে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের দিকে।
মাদক নিরাময় কেন্দ্র কতটা শোধরানোর কাজ করছে তা নিয়ে অনুসন্ধানে মাদকের করাল থাবায় ক্ষত একদল যুবকের কাছ থেকে উঠে এসেছে অনেক অজানা তথ্য। নওগাঁর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সুপ্রভাত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে বর্তমান ১২ জন মাদকাসক্ত যুবক রয়েছে। ১৮ জনের মধ্যে ছয় জন কিছু দিন আগে সুস্থ হয়ে বের হয়েছে।
নিরাময় কেন্দ্রে ভাষায় যারা বের হয়েছে তাদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তারা তিন মাস এ পর্যবেক্ষণে থাকার পর তাদের আবার নতুনভাবে চলার গাইড লাইন দেয়া হবে। এ কেন্দ্রের পরিচালক মামুনুর রশিদ মামুন বলছিলেন, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে কি ধরনের মেন্টাল থেরাপী দিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়। এ নিরাময় কেন্দ্রের নিজস্ব কিছু কৌশল আর নিয়মিত অনুশীলন আয়ত্ব করার মাধ্যমে নতুন জীবনের পথ দেখানো হয়। সে বিষয় পরে বলছি। তার আগে একজন সুস্থ যুবক কিভাবে এ মাদকের থাবায় আসক্ত হয় সে কথা বর্ননা দিচ্ছিলেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বোটানিতে পড়া এক যুবক।
৭০ দিন আগে এখানে ভর্তি করে দেয় ওই যুবকের অভিভাবক। অত্যন্ত মেধাবী যুবক ইসমাইল (ছদ্ধ নাম)।  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন সুন্দর জীবন গড়ার প্রত্যায় নিয়ে। ঠিকভাবে চলছিল তার পড়ালেখা। এক বছর না যেতেই তার কিছু সহপাঠি তাকে ভিন্ন ভাবে আকৃষ্ট করে। ইসমাইল বলেন বন্ধুদের অনুরোধে প্রথমে সিগারেটে গাঁজা খাই, এর পর ডাস্ট (হেরোইন) এভাবে চলতে চলতে আসক্তি বাড়তে থাকে। পরিবারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করি। তারা প্রথমে দেয়। এক পর্যায়ে নেশা আমাকে গ্রাস করে ফেলে, রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। আমি মানষিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। পরিবার আমার সব কিছু জেনে অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি এনে এ মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে দেয়। একই অবস্থা সাইফুলের। ম্যাট্রিক পাশ করার পর নওগাঁর এক উপজেলার কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ১ম বর্ষে ভর্তি হয়।
জীবনের শুরুতে বন্ধুরা তাকে প্রভাবিত করে। সাইফুল বলেন প্রথমে বন্ধুদের অনুরোধে ফেন্সিডিল খাই। একদিন খাওয়ার পর শরীরে বেশ চাঞ্চল্য অনুভব করি। এভাবে চলতে থাকে আমার নেশা। এক পর্যায়ে বন্ধুরা ডাস্ট (হেরোইন ) খেতে উৎসাহ যোগায়। ডাস্ট খেয়ে আরো বেশি রোমাঞ্চিত হয়ে অবশেষে প্রতিদিন এ নেশায় চরমভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। পরিবার বিষয়টি জানতে পেরে আমার সাথে খারাপ আচরণ করে। নেশার টাকা যোগাড় করতে বাবা মার রাখা টাকাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি করি। নেশার টাকা সংগ্রহের জন পরিবারের সদস্যদের সাথে চরম খারাপ ব্যবহার করি। অবশেষে পরিবারের  সিদ্ধান্তে এ মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে দেয়। এ নিরাময় কেন্দ্রে বেশির ভাগ যুবক যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৫। প্রত্যেকের মাদক জীবনে প্রবেশে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী।
নিরাময় কেন্দ্র থেকে সদ্য বের হওয়া এরশাদ জানান, আমার জীবনের বড় একটি ভুল ছিল মাদক জীবনে প্রবেশ। এ নিরাময় কেন্দ্র থেকে বের হয়ে এখন সুন্দর জীবন যাপন করার চেষ্টা করছি। আমার মাদক জীবনে প্রবেশের পর আমার স্ত্রী সন্তান আমাকে ছেড়ে চলে যায়। আমার পরিবারে প্রায় ১০ লাখ টাকা আমি নষ্ট করি। এ মাদক  নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হয়ে তিন মাসের একটি শৃংখলা আর মাদকের কুফল থেকে বের হওয়ার নিয়মিত রুটিন থেরাপী আমাকে বদলে দেয়। আজ আমি বুঝতে পারছি জীবনে কি ভুল করেছিলাম। তিনি অনুশোচনা করে বলেন, সুস্থ জীবনে আসার পর আমি এখন চরম লজ্জা পাই কতটা অবিচার করেছি আমার পরিবারের সাথে।
তথ্যমতে, নওগাঁয় রয়েছে ৯টি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। যেখানে একটি নির্ধারিত অর্থের মাধ্যমে মাদকসেবীদের সুস্থ করার চেষ্টা চলছে। শহরে মাদকের সহজলভ্যতা আর এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তির মাদকের পিছনে অর্থলগ্নী দিন দিন মাদকের বিস্তার বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন।
নওগাঁ জেলা মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের সহসভাপতি আতাউর রহমান খোকা বলেন, আমি মনে করি মাদক নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলার আগে সামাজিক আন্দোলনের বেশি প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সমাজের সব শ্রেণি পেশার মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি ।
অন্যদিকে, সম্প্রতি নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক (বিপিএমপিপিএম) মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বিভিন্ন সভা সমাবেশ করছেন। তিনি মাদক বিক্রেতা ও সেবীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার জন্য লিফলেট পোস্টার বিলি করছেন। তার আহ্বানে বেশ কিছু মাদক বিক্রেতা ও সেবী আত্মসমর্পণ করে সুস্থ জীবনে ফিরে গেছেন।