মাদক ব্যবসায় বাড়ছে নারীদের অংশগ্রহণ

আপডেট: অক্টোবর ২৮, ২০১৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ


বুলবুল হাবিব
রাজশাহীতে থেমে নেই মাদক ব্যবসা। ব্যবসা বন্ধ না হলেও নগর পুলিশের ‘জিরো টলারেন্সের’ কারণে এই অঞ্চলে ব্যবসার ধরণ পাল্টেছে তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে পুরুষ ব্যবসায়ীরা গা ঢাকা দিলেও ব্যবসায়ে অংশগ্রহণ বেড়েছে নারীদের। এই নারীরা আবার একই পরিবারের সদস্য। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও মা-মেয়ে মাদক ব্যবসায় যুক্ত থাকার কারণে গ্রেফতারের ঘটনাও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, রাজশাহী অঞ্চলে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বেড়েছে। অভিযানে প্রতিদিন এ অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হচ্ছে। আটক হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির কারণে পুরুষ মাদক ব্যবসায়ীরা গা ঢাকা দিলে কিংবা কারাগারে থাকলেও তাদের পরিবারের নারীদের ব্যবসায় অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারীরা ব্যবসায় যুক্ত হলে সহজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো সম্ভব ভেবে ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
সমাজবিজ্ঞানীরাও বলছেন, নারীদের মাদক ব্যবসায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে সহজে ধুলো দেয়া যায়। আর দারিদ্র্য থাকার কারণে খুব সহজে মাদক ব্যবসায় নারীদের ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।
রাজপাড়া থানা সূত্রে জানা গেছে, গত তিন মাসে রাজপাড়া থানায় ২১৫টা মাদকের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টা করেছে রাজপাড়া থানা ও বাকি ৬০টা মামলা করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এর মধ্যে ৩৫টি মামলা হয়েছে নারীদের বিরুদ্ধে।
গত ৬ অক্টোবর রাজশাহীর স্থানীয় ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শফিকুল ইসলামও মাদক ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করেন। শফিকুল ইসলাম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স থাকার কারণে নারীদের মধ্যে মাদক বিক্রির পরিমাণ একটু বেড়েছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পুলিশি অভিযানের ফলে পুরুষ মাদক ব্যবসায়ীরা গা ঢাকা দিয়েছে। যদিও ওই নারীরা মাদক ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য।
গত বুধবার রাতে রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ধূমকেতু ট্রেন থেকে আদুরী নামের এক নারী ফেনসিডিল ব্যবসায়ীকে আটক করেছে রেলওয়ে পুলিশ। তার বাড়ি রাজশাহীর ভাটাপাড়া এলাকায়।  রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসগর হোসেন বলেন, ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তার ট্রাভেলব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে ১৭০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।
এর আগে গত ১৫ অক্টোবর গোদাগাড়ীতে ২৭০ গ্রাম হেরোইনসহ মিনারা খাতুন (৩৪) নামে এক নারীকে গ্রেফতার করেছে বিজিবি। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর গোদাগাড়ীতে ৫ লাখ টাকার হেরোইনসহ নাজমা বেগম (৩৬) নামের এক নারীকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। সাত সেপ্টেম্বর কোটি টাকা মূল্যের এক কেজি হেরোইনসহ মেরিনা খাতুন (৫০) নামের এক নারীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৫ এর সদস্যরা। তাকে নগরীর রেলস্টেশন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে গত ২৪ আগস্ট গোদাগাড়ী থেকে হেরোইনসহ এক নারীকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। গ্রেফতারকৃত নারী উপজেলার মাটিকাটা রেলগেট এলাকা রাজিমুল ইসলামের স্ত্রী সাবিনা বেগম ওরফে রফিনা (২৩)।
রাজপাড়া থানার ওসি আমান উল্লাহ সরকার বলেন, অভিযানের কারণে মাদক ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। মামলা বিশ্লেষণে করলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। এইজন্য নারীদের গ্রেফতারের হারও বেড়েছে।
নগর পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম বলেন, মাদক ব্যবসায় যুক্ত থাকার কারণে ইতোমধ্যে নগরীর গুঁড়িপাড়া ও পঞ্চবটি এলাকা থেকে একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও মা-মেয়েকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেককেই আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে মাদকাসক্ত শিক্ষার্থী পেলেও মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এমন কোনো নারী শিক্ষার্থী পাওয়া যায় নি। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক লুৎফর হোসেনও বলেন, আগের চেয়ে মাদক ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণেই মাদক ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নীলুফার সুলতানা মাদক ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণের জন্য কয়েকটি কারণকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, প্রথমত হচ্ছে, দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের কারণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মধ্যে যেকোনো উপায়ে অর্থ আয়ের চেষ্টা চলছে। এতে অনৈতিক যেকোনো পথ বেছে নিতেও কেউ কোনো দ্বিধা করছে না। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, মাদক ব্যবসায় নারীদের ব্যবহার করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ধুলো দেয়া সহজ হয়। শুধু এখন নয়, যেকোনো ব্ল্যাক মার্কেটে শিশু ও নারীদের ব্যবহার করা হয়। সত্যিকার অর্থে তারা ব্যবহৃত হয়। এছাড়া মাদকের সহজলভ্যতা থাকার কারণে অর্থ আয়ের আশায় ব্যবসায় নারী ও শিশুকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ