মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চর খিদিরপুরের শেষ ভূখন্ডটি

আপডেট: অক্টোবর ১, ২০১৬, ৭:০৪ অপরাহ্ণ

 

ভাঙছে পদ্মা। সংকুচিত হচ্ছে বাংলাদেশের ভূখন্ড। ছবিটি সীমান্তবর্তী এলাকা চর খিদিরপুর থেকে তোলা।

বুলবুল হাবিব
বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চর খিদিরপুরের শেষ ভূখ-টি। আর ২০০ মিটার ভাঙলেই নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে সীমান্তবর্তী এলাকায় পদ্মার চরে গড়ে উঠা ওই ভূখন্ডটি। এর সঙ্গে হারিয়ে যাবে ভূখন্ডে বসবাসরত এক সময়ের ১২ হাজার মানুষের সুখ-দুঃখ ও স্বপ্ন বিনির্মাণের গল্পগুলো। হারিয়ে যাবে তাদের আশা নিরাশার গল্প, ব্যর্থ হয়ে যাবে বার বার ভাঙনেও শিরদাঁড়া সোজা হয়ে ঘুরে দাঁড়ানো সংগ্রামমুখর মানুষের গল্পগুলো।
যে ভাঙন তাদের উচ্ছেদ করতে পারে নি, বসবাসের জায়গাটুকু না থাকায় এবার সেই ভাঙনের কাছেই পরাজিত হয়ে বসতি স্থানান্তর করে তাদের চলে যেতে হবে দীর্ঘদিনের আবাসস্থল ওই ভূখন্ড থেকে। কারণ ২০০ মিটার পরেই ভারতীয় সীমান্ত। ভারতীয় অঞ্চল। ফলে এই অংশটুকু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে চর খিদিরপুরের শেষ চিহ্নটুকুও আর থাকবে না।
এর সত্যতা পাওয়া গেল গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে পরিদর্শনে। বর্তমানে ভূখন্ডে ৫০ ঘর লোকের বসতি থাকলেও বসবাস করছেন ১০ ঘর মানুষ। স্থানীয়রা জানান, এবছর ৪০টি বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আর ৫০টির মতো বাড়িঘর আছে। সামনে বর্ষায় এই অংশটুকুও আর থাকবে না। এই অংশটুকু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে চর খিদিরপুর বলে বাংলাদেশের মানচিত্রে আর কোনো ভূখন্ড থাকবে না। কারণ পাশেই ভারতীয় সীমান্ত।
ওই এলাকার বাসিন্দা জিয়ারুল ইসলাম বলেন, এবছর কষ্ট করে কোনোমতে বসবাস করা সম্ভব। সামনে বছর বর্ষার আগেই এখান থেকে আবাস উঠিয়ে চলে যেতে হবে। সামনে বছর চর খিদিরপুরের এই অংশটুকু আর কখনোই থাকবে না। এবছর বর্ষায় যাদের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, তাদের তো গেছেই। যাদের বাড়িঘর টিকে রয়েছে বর্ষায় ডুবে যাবার পর তারাও অনেকে ফিরে আসেন নি।’ এলাকার বাসিন্দা বাবর আলীও বলেন, চর খিদিরপুরের এই অংশটুকু আর সামনের বছর থাকবে না। এই বছর ‘৬ রশির’ মতো পদ্মার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এক রশি মানে ২০ কাঠা আর ৬ রশি মানে ১২০ কাঠা। অর্থাৎ দৈর্ঘ্যে ৬ বিঘার মতো জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের সীমান্তে ঘেঁষে পবার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড এই চর খিদিরপুর। এক সময় এখানে ভোটার ছিলো সাড়ে তিন হাজার। বসবাস করত ৫০০ ঘরের অধিক মানুষজন। ২০১১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোটার ছিল এক হাজার ৮১৬ জন। ১০ বছর ধরে পদ্মার অব্যাহত ভাঙনে এখন ভোটার আছেন মাত্র ১০ জন। এই বছরের জুন মাসের ৪ তারিখে ওই ওয়ার্ডে নির্বাচন হবার কথা থাকলেও সীমানা নির্ধারণ ও ভোটার সংখ্যার অভাবে নির্বাচন হয় নি এই ওয়ার্ডে।
২০১১ সালে নির্বাচিত ওই ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, এই বছরের জুন মাসের ৪ তারিখে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও সীমানা নির্ধারণ ও ভোটারের অভাবে নির্বাচন হয় নি। ২০১১ সালের নির্বাচনেও ভোটার ছিল দুই হাজার ৮১৬ জন, এখন ভোটার ১০ জনও নেই। ভাঙনের কারণে ওই অঞ্চল থেকে অনেক মানুষ এসে মধ্যচরে বসতি গড়ে তুলেছে, অনেকে নগরীর বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে নগরীর উপকণ্ঠের খড়খড়ি বাইপাস এলাকায় বসবাস করছে। আমি নিজেও ওই এলাকা থেকে চলে এসে মধ্যচরে বসবাস করছি।
গোলাম মোস্তফা বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় চর খিদিরপুরের যে অংশটুকু টিকে আছে সামনের বছর বর্ষায় তা সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। ওই অংশটুকু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে চর খিদিরপুর বলে বাংলাদেশের মানচিত্রে আর কোনো ভূখন্ড থাকবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১০ বছর আগেও চর খিদিরপুরে ১২ হাজার লোকের বসতি ছিলো। ছিলো দুইটি বেসরকারি ক্লিনিক, আটটা মসজিদ-মাদ্রাসা, দুইটি দোতলা স্কুল, তিনতলা বিশিষ্ট তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র ও দুইটি বিজিবি ক্যাম্প। কয়েক বছরের ব্যবধানে সব নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে শন ও টিন দিয়ে নির্মিত কয়েকটি বাড়িঘর টিকে রয়েছে।
পদ্মার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হরিয়ান ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিল কোহিনূর বেগমের আবাসস্থলও। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, কত এমপি, কমিশনার এলো কিন্তু পদ্মার ভাঙনরোধে কেউ কাজ করল না। এই অংশটুকু গেলে চরখিদিরপুর বলে আর কোনো নাম থাকবে না। কোহিনূর বেগম দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, কে কোথায় আছে, কেউ জানে না, একসঙ্গে ছিলাম আর এখন কারো সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।
ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা জানান, ২০১৪ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুর বস্তা দিয়ে ভূখন্ডটি রক্ষার চেষ্টা করেছিল। এর পর আর কোনো কাজ হয় নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুখলেসুর রহমান জানান, সত্যি, ওই অংশটুকু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে চরখিদিরপুর বলে আর কোনো ভূখ- মানচিত্রে থাকবে না। তবে আমরা আশাবাদী। ইতোমধ্যে ওই ভূখন্ড রক্ষার জন্য জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্মিলিতভাবে মন্ত্রণালয়ে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। সামনের বছর বর্ষার আগেই আমরা একটা পদক্ষেপ নিতে পারব বলে জানান তিনি।