মানবতার জয়

আপডেট: নভেম্বর ৯, ২০১৯, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

কবির কাঞ্চন


তুলি ও জুলি দুই বান্ধবী। দু’জনে একই স্কুলে পড়ে। ফলে দু’জনের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া ছিল। একজনে নতুন কিছু করলে অন্যজন তা করবার চেষ্টা করতো। তুলি তৃতীয় আর জুলি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।
তুলির বাবা যে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার, জুলির বাবা সে প্রতিষ্ঠানের একজন সিকিউরিটি গার্ড। একই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে ওরা একই কলোনীতে বসবাস করছে। তুলিরা থাকে এ টাইপের আর জুলিরা ডি টাইপের ভবনে থাকে। আবাসিক এলাকায় মনোরম পরিবেশে ওরা বড় হচ্ছে। অফিসারের মেয়ে হলেও তুলির মধ্যে কোন ধরনের অহংবোধ নেই। একটু সময় পেলেই ও বাসার বাইরে চলে আসে। সারাক্ষণ জুলির সাথে খেলায় মেতে ওঠে। জুলিকে কাছে পেলে তুলির যেনো আনন্দের সীমা থাকে না।
তুলির মা অবশ্য ওদের এতো মেলামেশা পছন্দ করেন না। মাঝে মধ্যে ওদের দুজনকে একসাথে একা পেলে জুলির সাথে না মিশতে তুলিকে রাগারাগিও করেন। তুলির কচি মন মায়ের মতো উঁচু নিচু বোঝে না। তাই সে একটু সময় পেলেই আনন্দের সারথিকে খোঁজে নেয়। জুলিও তুলির চোখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে যায়। দুই বান্ধবী কলোনির বাগানবাড়িতে বসে কত্তো রকম খেলা খেলে। খুশিতে লুটোপুটি খায়। ওদের এমন আনন্দের ভাগ নিতে এগিয়ে আসে বনের কতক পাখি। নানা রঙের প্রজাপতি এসে ওদের সেই আনন্দের শরিক হয়। একটু দূরে ঘাসফড়িংও ওদের দিকে চেয়ে চেয়ে আনন্দে ঘাসের বুকে তিড়িং বিড়িং করে নাচে। তুলির বাবা অবশ্য ওদের এই মেশামেশাকে ভালো চোখে দেখেন। জুলিকে তিনি নিজের মেয়ের মতো করে আদর করেন। মিষ্টি করে কথা বলেন।

একদিন বিকেলে তুলি আর জুলি কলোনির বাগানবাড়িতে বসে বসে খেলছে। হঠাৎ তুলির চোখে পড়ে কয়েকটি সুন্দর শালিক পাখি। পাখিগুলো একেবারে ওদের গা ঘেঁষে পায়চারি করছে। ওদের কান খাড়া করে এদিকওদিক চাহনি দেখে মনে হচ্ছে ওরা কী আলাপ করছে তা শুনতে এসেছে ওরা।
তুলি এক পা দুই পা করে পা চেপে চেপে শালিক পাখিকে ধরতে যায়। জুলি তা বুঝতে পেরে আলতো করে ওর হাতদুটো চেপে ধরে ক্ষীণ কন্ঠে বলল,
– ওদিকে যাসনে, তুলি। ওদেরকে খেলতে দে।
– না, আমি শালিক পাখিটি ধরবো। দ্যাখ জুলি, পাখিটি আমাদের কতো কাছে চলে এসেছে। মনে হয় হাত বাড়ালেই ধরতে পারবো। এই সুযোগ আমি হাতছাড়া করবো না।
জুলি আর্দ্র গলায় বলল,
– ধরে কী করবি?
– বাসায় নিয়ে যাবো। তারপর ওকে আমি সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখবো। পেট ভরে খেতে দেবো। ও তখন আমায় ছেড়ে কোথাও যাবে না।
– কিন্তু জানিস? পাখিরা খাঁচায় থাকতে চায় না।
– আমি ওকে অনেক অনেক খাবার দেবো। ওর সাথে সুখদুঃখের গল্প করবো।
– কিন্তু কোথায় রাখবি? নিশ্চয় খাঁচায়।
তুলি অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,
– মানুষ পাখি তো খাঁচায়ই পোষে। এতে আবার প্রশ্ন করার কী আছে?
জুলি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলল,
– আচ্ছা, আমার একটা কথার জবাব দিবি?
– হ্যাঁ, বল।
– তোকে যদি ইচ্ছেমতো খাবারসহ সকল সুযোগসুবিধা দিয়ে কোন বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ করে রাখা হয়। আর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে দূরে রাখা হয় তখন তোর কেমন লাগবে?
তুলি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বলল,
– না, আমি আমার আব্বু-আম্মু আর তোকে ছেড়ে থাকতে থাকতে পারবো না।
জুলি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
– শোন, তুই যেমন আমাদের ছেড়ে একাকী থাকতে কষ্ট পারবি না, তেমনি পাখিও তার স্বজনদের ছেড়ে তোর কাছে খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকতে কষ্ট পাবে।
– তুই একদম ঠিক কথা বলেছিস। আমি তোর মতো করে ভাবিনি। এই তোকে ছুঁয়ে কথা দিলাম- পাখিরা কষ্ট পাবে এমন কোন কাজ আমি আর কখনও করবো না।
তুলির কথা শুনে জুলি খুশিতে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমো খায়। তুলিও জুলির টোল পড়া গালে আলতো করে চুমো খেয়ে মিটিমিটি হেসে ওঠে।

হঠাৎ তুলির মাকে ওদের দিকে আসতে দেখে জুলি নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে। তুলিও কোনকিছু বুঝে ওঠার আগে ওর মা কাছে এসে ওকে সাথে নিয়ে জুলিকে বকতে বকতে বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।
তুলি সারাদিন মন খারাপ করে কাটিয়ে দেয়।

সন্ধ্যায় তুলির বাবা বাসায় ফিরে এসে মেয়েকে মনমরা হয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে মনে মনে ভাবেন- আজ, তুলির কি হয়েছে? ও তো কখনও এমন আচরণ করে না। আমি অফিস থেকে এলে সারা বাসা মাথায় তুলে রাখার বদলে আজ চুপচাপ গুমোট হয়ে বসে আছে। নিশ্চয় ওর কোন সমস্যা হয়েছে। এই ভেবে তিনি তুলির কাছে বসে বললেন,
– কিরে, মা? এভাবে মুখ বেজার করে আছিস কেন? তোকে কি কেউ কিছু বলেছে?
তুলি রুমের চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে কাঁদো গলায় বলল,
– জানো, বাবা! আজ বিকেলে আমি আর জুলি বাগানবাড়িতে বসে খেলছিলাম। হঠাৎ আম্মু সেখানে গিয়ে জুলিকে বকাঝকা শুরু করেন। জুলি মন খারাপ করে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। আম্মু আমায় জোর করে টেনে নিয়ে এসেছেন। আম্মু ওকে ‘ছোটলোকের বাচ্চা’ বলেও গালি দিয়েছেন। আচ্ছা আব্বু, তুমিই বলো, গরিব মানুষেরা কী ছোটলোক হয়? ওরা যদি ছোটলোকই হবে তবে ওদের সবকিছু আমাদের মতো হবে কেন, বাবা?
মেয়ের এমন প্রশ্নে আরমান সাহেব থতমত খেয়ে এদিকওদিক তাকিয়ে একটু সময় নিয়ে বললেন,
– না, মামণি, গরিব ধনী সবাই মানুষ। কোন মানুষই জন্মসূত্রে ছোটলোক হয় না। মানুষের অর্থসম্পদও মানুষকে বড়লোক ছোটলোক করে না। কিছু লোকের জঘন্য আচরণের কারণে তারা ছোটলোক হয়ে যায়। আর কিছু লোক আছেন যারা নিজেদের মহৎ কর্মের মাধ্যমে মহান মানে বড়লোক হয়ে ওঠেন।
– ধন্যবাদ, বাবা। তাহলে তোমার কথায় এ কথা স্পষ্ট যে, জুলি আর আমার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
– হ্যাঁ, মামণি। জুলির বাবা যেখানে চাকরি করেন, তোমার বাবা সেখানে চাকরি করেন। আর তুমি যে স্কুলে পড়ো, জুলিও সেই স্কুলে পড়ে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এটাই যে, তুমি পড়ছো তৃতীয় শ্রেণিতে আর জুলি পড়ছে চতুর্থ শ্রেণিতে। এ দৃষ্টিতে ও তোমার সিনিয়র।
তুলির আম্মু ভেতর আসতে আসতে বললেন,
– আমার মেয়েকে কি শেখাচ্ছো?
– মানুষ হবার মন্ত্র।
ততক্ষণে তুলি বেডরুমের দিকে চলে গেল। আরমান সাহেব আবার বললেন,
– জুলি মেয়েটাকে বকাবকি করেছো কেন?
– বকবো না? সারাক্ষণ আমার মেয়ের সাথে ঘুরঘুর করে। ওর কাছ থেকে তুলিকে দূরেও রাখতে পারি না। ওসব সিকিউরিটির ছেলেমেয়েদের সাথে মিশলে আমাদের তুলিও ওদের মতো হয়ে বড় হবে।
– জোসনা, তুমি ভুলে যেও না। সিকিউরিটির চাকরি যারা করে তারাও মানুষ।
– আমি কী ওদের অমানুষ বলেছি?
– ছোটলোক বলেছো। আর কখনও যেনো এ ধরনের কথা তোমার মুখ থেকে না বেরোয়। মনে রেখো, আজ তুমি যাকে নিয়ে গর্ব করছো সেই আমি কিন্তু একজন কৃষকের সন্তান। জন্ম পরিচয়ই মানুষের সবকিছু নয়।
স্বামীর এমন কথায় নিশ্চুপ হয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায় তুলির মা।

তুলিদের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। প্রথমদিন পরীক্ষা শেষে তুলিকে নিয়ে গাড়ির অপেক্ষায় বেশ কিছুক্ষণ স্কুল গেইটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে তারা। এরপর গাড়ি না আসাতে নিরুপায় হয়ে তারা পায়ে হেঁটেই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আবাসিকে পৌঁছতেই তুলির মা হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান। জুলি ও জুলির মা তাকে ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে আসেন। জুলির মায়ের সেবা পেয়ে অল্প সময়ের মধ্যে তার জ্ঞান ফিরে আসে। এরিমধ্যে স্ত্রীর অসুস্থতার খবর শুনে বাসায় চলে আসেন আরমান সাহেব। সবকিছু গোছগাছ করে দিয়ে জুলিকে সঙ্গে নিয়ে জুলির মা নিজের বাসার দিকে চলে গেলেন।
আরমান সাহেব অসুস্থ স্ত্রীর মুখের দিকে মায়াভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন। স্বামীর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে জোসনা বেগম লজ্জায় মুখ লুকাতে চেষ্টা করেন।