মানবিক সংকটের মুখোমুখি বিশ্ব || লাগাম টেনে ধরার এখনই সময়

আপডেট: মার্চ ১৩, ২০১৭, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব কি সত্যিকার অর্থেই সঙ্কটে পড়েছে? জাতিসংঘ তা-ই বলছে। শুক্রবার (১০ মার্চ) প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের তথ্য মতে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার পর এখন বিশ্ব সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে পড়েছে। চারটি দেশের অন্তত দুই কোটি মানুষ চরম দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আফ্রিকার দেশ ইয়েমেন, দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়া ও নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ১৯৪৫ সাল থেকে খুধা, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের সঙ্গে লড়াই করে আসছে। ৭২ বছর পর সে লড়াই এখনও অব্যাহত। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়ে জাতিসংঘ বলছে, সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের মুখোমুখি বিশ্ব।
এর আগে ইউনিসেফ-এর এক তথ্য মতে চলতি বছর খুধার কারণে ১৪ লাখ শিশুর প্রাণহানি হতে পারে।
আফ্রিকার ওই দেশগুলোতে যুদ্ধ, সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিশীলতা, সন্ত্রাসী কর্মকা-, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দারিদ্র্য ও দক্ষ নেতৃত্বের অভাবে এই করুণ পরিণতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই বিপর্যয় মোকাবেলায় আসন্ন জুলাই থেকে ৪৪০ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে বলেও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ।
আফ্রিকার দেশগুলোতে মানবিক সঙ্কটের চেহারাটি খুব মোটা দাগে দৃশ্যমান হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরেই দেশগুলোর পরিস্থিতির কোনো হেরফের হয়নি। কিন্তু কেন হয়নি এর উত্তর জানার প্রয়োজন হয়নি বিশ্ব নেতৃত্বের। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থেও দারিদ্র ও মানবিক বিপর্যয়ের ধারাকে জিইয়ে রাখাই শুধু নয়Ñ একে প্রকট আকার দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি বিশ্বের মোড়ল দেশগুলো। ঠিক একইভাবে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যও উন্নয়রকামী দেশগুলোতে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করা হচ্ছে। সামাজিক সূচকগুলোতে জাতিসংঘের নজরকাড়া সাফল্য আছে, যা নিয়ে মানবসভ্যতা গর্ব করতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাদী দেশগুলোর আগ্রাসন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের করদরাজ্যে পরিণত করতে জঘন্য কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারেনি জাতিসংঘ। দেশে দেশে যুদ্ধ ও হিংসাকে অব্যাহতভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে ওই দেশগুলো। ফলে মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা এখন সারা বিশ্ব জুড়েই দেশে দেশে বিরাজমান। এবং সঙ্কটের আশু প্রতিকার সম্ভব বলেও মনে হয় না।
বিশ্ব নেতৃত্বের দুর্বলতা ও তার অপব্যবহার বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। অসহিষ্ণুতা মানুষকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। উন্নত দেশগুলোও এ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। অর্থাৎ অন্যের ঘরে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে এখন তাবেদার দেশগুলোতেও ওই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। পৃথিবী জুড়েই জন্ম নিয়েছে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নামক দানবের। আর এই দানবের বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে দেশে দেশে অসহিষ্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা, কুপম-কতা, রক্ষণশীলতা, স্বার্থপরতা ও ভেদবুদ্ধি দ্বারা মানুষ খুব দ্রুত আচ্ছন্ন হচ্ছে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের চেয়ে যা আরো ভয়ঙ্কর। কেননা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিহত করা যাচ্ছে কিন্তু সমাজের বাই প্রোডাক্ট ইস্যুগুলো রাজনীতি ও রাষ্ট্র চরিত্রে স্থান করে নিচ্ছেÑ যা প্রতিহত করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত ও সভ্যতার দাবিদার দেশগুলোতে এর ভয়ঙ্কর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিকতাবোধ ও প্রগতিবাদী চিন্তা চর্চা ও অনুশীলন মারাত্মকভাবে ধাক্কা খাচ্ছে, ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অসহিষ্ণুতা ও সংকীর্ণতার রাজনীতির এখন খুবই রমরমা অবস্থা। যার পরিণতি দাঁড়াচ্ছে মানুষ মানুষ থেকে জাতি-বর্ণ-ধর্ম ভেদে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, এক জাতি আরেক জাতির প্রতি হরহামেশাই আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছে। এই পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরতে না পারলে সত্যিকার অর্থেই মানবজাতি ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের দিকেই এগিয়ে যাবে। এতে করে পৃথিবী মানুষ জাতির বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ