মানব সভ্যতার অগ্রদূত বিজ্ঞানী আলভা এডিসন

আপডেট: নভেম্বর ২৪, ২০১৬, ১১:৫৮ অপরাহ্ণ


হাবিবুর রহমান স্বপন
বর্তমান জ্ঞানভিত্তিক বিজ্ঞানময় পৃথিবী একদিনে গড়ে ওঠেনি। আদিম মানুষেরা আগুন আবিস্কারের মধ্য দিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সূচনা করে। আগুন ব্যবহার করে তারা বন্য পশুদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা, পশু শিকারের জন্য হাতিয়ার তৈরি এবং পশুর মাংশ পুড়িয়ে খাওয়ার কৌশল আবিস্কার করে। এরপর আবিস্কার হয় চাকা। এভাবে চলমান সময়ের সাথে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি চলতে থাকে। তবে উনিশ শতকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল উন্নয়ন এবং ১৮৮২ সালে থমাস আলভা এডিসনের বৈদ্যুতিক বাল্ব উদ্ভাবন পৃথিবীকে প্রকৃতপক্ষে আলোকিত করে। বৈদ্যুতিক শক্তির বহুবিদ ব্যবহারে পৃথিবীতে আজ দিনে-রাতে সমান তালে কাজ চলছে।
সর্বকালের সেরা এক’শ জন মানুষের মধ্যে যার নাম রয়েছে ৩৫তম স্থানে তিনি থমাস আলভা এডিসন। সর্বকালের সেরা উদ্ভাবক এডিসন শুধু বৈদ্যুতিক আলোর বাল্ব, শব্দ রেকর্ড যন্ত্র ফোনোগ্রাফ এবং চলচ্চিত্রের প্রাথমিক কাঠামোই নয় তিনি আবিস্কার করেন ফ্লুরোস্কোপ (এক ধরনের প্রতিবিম্ব তৈরির যন্ত্র)। এডিসন মোট ১০৯৩ টি উদ্ভাবনের প্যাটেন্ট লাভ করেন।
১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ছোট শহর মিলানে জন্মগ্রহণ করেন আলভা এডিসন। তাঁর বাবা স্যামুয়েল ওগডেন এডিসন ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে কানাডার ম্যাকেঞ্জি বিদ্রোহের সময় পালিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। বিয়ে করেন আমেরিকায়। মায়ের নাম ন্যান্সি ম্যাথিউস এলিয়ট। এডিসন ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। বোকা স্বভাবের এডিসন ছিলেন অস্থির প্রকৃতির। স্কুলে খাপ খাইয়ে চলতে না পারায় মাত্র তিন মাস পর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে এই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর। শিশুকালে এডিসন লাল ফুসকুরিযুক্ত স্কারলেট জ্বরে আক্রান্ত হন। দরিদ্র পিতা কাজের সন্ধানে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের পোর্ট হারনে যান। তখন এডিসনের বয়স সাত বছর। শিশু এডিসন ট্রেনে ক্যান্ডি এবং খবরের কাগজ বিক্রি করতেন। এর পাশাপাশি তিনি শাক-সবজিও বিক্রি করতেন।
বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও তাঁর জ্ঞানের ভিত্তি রচিত হয় আর জি পারকারের ঝপযড়ড়ষ ড়ভ ঘধঃঁৎধষ চযরষড়ংড়ঢ়যু এবং ঞযব ঈড়ড়ঢ়বৎ টহরড়হ বই দ্টু পড়ে। বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে মা তাকে উৎসাহ দিতেন এবং নিজেই পড়াতেন। এডিসন পরবর্তীতে বলতেন ‘আমার মা-ই আমাকে তৈরি করেছেন। তিনি আমার সম্পর্কে খুবই আশাবাদী এবং নিশ্চিত। আমি অনুভব করছিলাম যে, আমার বেঁচে থাকার কিছু একটা আছে, তিনি এমন কেহ যাকে কখনো হতাশ করা যাবে না।’ এভাবে মাতৃভক্ত এবং আত্মবিশ্বাসী এডিসিন মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রথম উদ্ভাবন করেন বৈদ্যুতিক ‘ভোল্ট রেকর্ডার’। কিন্তু কোন ক্রেতা না পাওয়ায় যন্ত্রটি তিনি বিক্রি করতে পারেননি। নিউ ইয়র্কে আসার পর, ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্টক মার্কেটের তথ্যাবলি রিলে করার মেশিন ‘স্টক টিকেট’ উদ্ভাবন করেন।
জিমি ম্যাকেঞ্জি নামের এক তিন বছরের বালককে চলন্ত ট্রেনে কাটা পড়া অবস্থা থেকে রক্ষা করেন এডিসন। স্টেশনের কর্মকর্তা জে ইউ ম্যাকেঞ্জি এতে খুশি হয়ে কৃতজ্ঞতার পুরস্কার হিসেবে তিনি বেকার এডিসনকে টেলিগ্রাফ পরিচালনার কাজ শেখান এবং চাকরির ব্যবস্থা করেন। ১৮৬৬ খিস্টাব্দে ১৯ বছর বয়সে এডিসন কেনটাকি অঙ্গরাজ্যের লুইসভিলে ওয়েস্টার্ণ ইউনিয়নে চাকরিতে যোগদান করেন। সেখানে তিনি আমেরিকার সংবাদ সংস্থা অংংড়পরধঃবফ চৎবংং এর ব্যুরো নিউজ ওয়্যারে কাজ করেন। এডিসন রাতের পালায় কাজ করেন এবং অবসর সময়ে বই পড়ে ও নিজের শখের গবেষণায় ব্যয় করেন। আর এই গবেষণাই তাঁর চাকরি হারানোর উপলক্ষ হয়ে যায়। এক রাতে তিনি সীসা ও অ্যাসিড দিয়ে ব্যাটারি তৈরির বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। এ সময় অসাবধনাতাবশত অফিস কক্ষের মেঝেতে অ্যাসিড গড়িয়ে তার বসের ডেস্কের নিচ পর্যন্ত চলে যায়। এ ঘটনায় সকালে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
চাকরিহারা হতাশ এডিসনকে বাঁচাতে তার তরুণ বন্ধু পেলিগ্রাফার ও উদ্ভাবক ফ্রাঙ্কলিন লিওনার্দো পোপ তাঁকে নিউজার্সির এক বেসমেন্টে কাজ দিয়ে সাহায্য করেন। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে এডিসন ১৬ বছরের বালিকা ম্যারি স্টিলোওয়েলকে বিয়ে করেন। মাত্র পাঁচ বছর পর স্ত্রী স্টিলাওয়েল মারা গেলে এডিসন বিয়ে করেন ২০ বছর বয়সী মিনা মিলারকে। দুই স্ত্রীর তিনজন করে মোট ছয় সন্তান এডিসনের।
১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে এডিসন এক ধরনের বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ উদ্ভাবন করেন যা ছঁধফৎঁঢ়ষবী ঃবষরমৎধঢ়য নামে পরিচিত। এটি একইসাথে একটি সিঙ্গেল তারের মধ্য দিয়ে চারটি ভিন্ন সিগন্যাল সঞ্চালন এবং গ্রহণ করতে পারতো। এটি বিক্রির জন্য আমেরিকার অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ কোম্পানি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে ক্রেতাদের আহ্বান করা হয়। মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ডলার। কিন্তু অবাক ব্যাপার সেটি বিক্রি হয় ১০ হাজার ডলারে। বিজ্ঞানী হিসাবে তার আয় ছিল বিশাল। যন্ত্র উদ্ভাবনের রয্যালিটি হিসাবে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে এডিসন পরবর্তী বছরই নিউইয়র্ক থেকে ৩৯ কিলোমিটার দূরে মেনালো পার্কে একটি ‘উদ্ভাবনী কারখানা’ স্থাপন করেন। শস্যাগার এর মতো দেখতে দুই তলা এই ভবনটিই বিশেষ উদ্দেশ্যে নির্মিত পৃথিবীর প্রথম গবেষণাগার। এটি ধারাবাহিকভাবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে কাজ করেছে। একদল  বিজ্ঞানী এডিসনকে সাহায্য করেছেন তার ধারনাগুলোর উন্নয়ন ঘটিয়ে উদ্ভাবনের জন্য এগিয়ে নেয়ার। এই গবেষণাগারে তিনি ছয় বছর কাজ করে ৪’শর বেশি উদ্ভাবনের মেধাস্বত্ব করেন। এক যুগের মধ্যে মেনলো পার্ক গবেষণাগারটি দুটি সিটি ব্লক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এডিসন বলতেন এই গবেষণাগারে থাকবে কল্পনা করা যায় এমন সব জিনিস। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে উক্ত গবেষণাগারের জিনিসপত্রের একটি তালিকা প্রকাশিত হয়। প্রায় আট হাজার রাসায়নিক পদার্থ, সব ধরনের স্ক্রু, নানা আকৃতির সুঁচ, সব ধরনের রশি ও তার, গরু, ভেড়া, ছাগল, বাঘ, সিংহ, হরিণ, উটসহ সকল প্রাণীর পশম। সর্বপ্রকার সিল্ক, বিভিন্ন পশুর সিং, হাঙ্গরের দাঁত, উটপাখি, মানুষ, বানর, কচ্ছপ ইত্যাদি প্রাণীর কঙ্কাল, খনিজ পদার্থ, বিভিন্ন প্রকার তেল, খনিজ আকরিক পদার্থ। এমনকি ময়ূরপুচ্ছও বাদ যায়নি।
১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে এডিসন কার্বন মাইক্রোফোন উদ্ভাবন করেন। গ্রাহামবেল উদ্ভাবিত টেলিফোনের রিসিভার হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয় প্রায় টানা এক’শ বছর (১৯৮০ খ্রি. পর্যন্ত)। এর মেধাস্বত্ব নিয়ে এমিলি বার্লিনালের সাথে দীর্ঘ আইনি লড়াই হয় এডিসনের। ধ্বনিবিবর্ধক যন্ত্র বা মাইক উদ্ভাবনের মেধাস্বত্ব পান এডিসন। কার্বন মাইক্রোফোন রেডিও সম্প্রচার এবং জনসভায় বক্তৃতার সময় মাইকে ব্যবহার হয়।
টেলিগ্রাফ উন্নয়নের সাফল্য পেরিয়ে এডিসন ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে ধ্বনিগ্রাহী যন্ত্র চযড়হড়মৎধঢ়য উদ্ভাবন করেন। এটি দ্বারা শব্দ রেকর্ডিং করা যায় এবং শব্দকে পুনরায় শোনা যায়। প্রথম যখন তিনি যন্ত্রটি আবিস্কার করেন তখন তার শব্দ ছিল অস্পষ্ট। অনেক গবেষণার পর যন্ত্রটি সাধারণ মানুষের কাছে যখন আনা হয়, তখন এটিকে জাদুর বাক্স বলা হলো। আর এডিসনকে বলা হলো মেনকো পার্কের জাদুকর। এই যন্ত্রটি তিনি প্রথম প্রদর্শনের জন্য আমেরিকার এক ধনাঢ্য ব্যক্তির অফিসে যান। যখন তিনি বলেন, আমার এই যন্ত্র কথা বলে, তখন সেখানে উপস্থিত সকলে এডিসনকে পাগল বলে। টেপ রেকর্ডারটি চালু করে তিনি প্রমাণ করে দেখালেন। কথা রেকর্ড করা হলো এবং তা শুনানো হলো। এরপর এডিসনকে সকলে জাদুকর বললেন।
এডিসনের ভাগ্য বদলে যায় টেলিগ্রাফির উপর গবেষণা করে। টেলিগ্রাফ অপারেটরের কাজ করে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তা দিয়ে উদ্ভাবন করেন ঝঃড়পশ ঃরশবৎ যা হলো প্রথম বিদ্যুৎনির্ভর সম্প্রচার পদ্ধতি। তারপর তিনি উদ্ভাবন করেন, কাইনেটোস্কোপ (শরহবঃড়ংপড়ঢ়ব) যা সংকীর্ণ ছিদ্রের মধ্য দিয়ে ছবি দেখার যন্ত্র। ১৮৯৪-এর ৭ অক্টোবর লন্ডনে এর প্রথম প্রদর্শনী হয়। এই যন্ত্র দ্বারাই সিনেমা দেখানো হয়। এটি আবিস্কারের পর সারা ইউরোপ ও আমেরিকায় সাড়া পড়ে যায়। আমেরিকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইরভিন টি বুশ এটি কিনে নেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে এডিসন প্রতিষ্ঠা করেন, গড়ঃরড়হ ঢ়রপঃঁৎব ঢ়ধঃবহঃং পড়সঢ়ধহু যা ছিল ৯টি বড় স্টুডিও’র একটি যৌথ উদ্যোগ।
এডিসনই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বহুমাত্রায় ঋষড়ঁৎড়ংপড়ঢ়ব ডিজাইন ও উৎপাদন করেন। এটি হলো প্রতিবিম্ব তৈরির একধারনের যন্ত্র যা সাধারণভাবে  চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় রোগির অভ্যন্তরীণ শরীরিক গঠন পর্যালোচনার কাজে। এটি ঢ-ৎধু থেকে শুরু করে আলোকচিত্র পর্যন্ত তুলতে সক্ষম। উইলহেম রঞ্জন তার গবেষণায় বেরিয়াম প্লাটিনোসায়োনাইড পর্দা ব্যবহার করেন। আর এডিসন আরও উন্নত ও কার্যকরি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন ক্যালসিয়াম স্ট্যাংস্টেইন। যা অধিকতর উজ্জ্বল আলো তৈরি করতে পারে। এডিসনের ঋষড়ঁৎড়ংপড়ঢ়ব এর মূল নক্সা আজও ব্যবহার হচ্ছে। এই গবেষণা করতে যেয়ে এডিসনের দৃষ্টিশক্তি হারানোর উপক্রম হয়। তার সহকারি ক্লারেন্স ডেলি ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে রেডিয়েশনজনিত বিষাক্ত ডোজে মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে এডিসনকে এক্স-রে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাকে এ সম্পর্কে কিছু বলো না, আমি এতে খুব ভয় পাই।’
এডিসন পূর্ববর্তী কতিপয় বিজ্ঞানীর বিদ্যুৎ সম্পর্কিত বিচ্ছিন্ন ধারণাগুলোর বাস্তব রূপ প্রদান করেন সাদা আলো (ওহপধহফবংপবহঃ ষরমযঃ) উদ্ভাবন করেন। তিনি বৈদ্যুতিক শক্তি উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করেন। এডিসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হলো বৈদ্যুতিক বাল্ব। প্লাটিনামসহ অনেক ধাতুর ফিলামেন্ট নিয়ে গবেষণা শেষে তিনি কার্বন ফিলামেন্টকে আদর্শ হিসেবে বেছে নেন। তিনি দেখলেন, উজ্জ্বল একটি সূতার বাল্ব অথবা ফিলামেন্ট অল্প বৈদ্যুতিক শক্তিতেই অনেক আলো ছড়িয়ে জ্বলে ওঠে। ফিলামেন্টের জন্য সবচেয়ে ভাল উপাদান কার্বনযুক্ত কটন থ্রেড আবিস্কারের জন্য এডিসনকে হাজার হাজার পরীক্ষা করতে হয়। সফল পরীক্ষাটি হয় ২২ অক্টোবর ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে। এটি ৪০ ঘণ্টা টিকেছিল। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি তিনি এর মেধাসত্ব লাভের জন্য আমেরিকা সরকারের কাছে আবেদন করেন। এর আগের বছর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জোসেফ সোয়ানকে একই ধরনের উদ্ভাবনের জন্য মেধাসত্ব দেয়া হয় ব্রিটেনে। সোয়ানের সাথে প্যাটেন্ট নিয়ে বিরোধ মেটাতে পরবর্তীতে এই দুই বিজ্ঞানী একত্রে কাজ করেন। তারা ঊফরংধিহ নামে একটি কোম্পানি গঠন করেন।
বৈদ্যুতিক বাল্ব উদ্ভাবনের প্যাটেন্ট লাভ করার পর একই বছর ১৭ ডিসেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘এডিসন ইলামিনেটিং কোম্পানি’। এডিসন লাইট বাল্ব উন্নয়নের পর কেন্দ্রীয় জেনারেটর দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে একটি পরিপূর্ণ আলোক পদ্ধতি গঠন করেন। ১৮৮২-এর ৪ সেপ্টেম্বর এডিসন তার প্রথম বৈদ্যুতিক প্লান্ট নিউ ইয়র্কের পার্ল স্ট্রিটের জেনারেটর স্টেশনের সুইচ অন করে সূচনা করেন। এই বিদ্যুৎ ছিল ১১০ ভোল্টের ডিসি (ফরৎবপঃ পঁৎৎবহঃ)। এটি শুরুতেই ৮৫ জন গ্রাহককে সেবা দিয়েছিল। এর অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সমস্ত নিউইয়র্ক শহর বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হয়। ১১৮৩-এর জানুয়ারিতে এডিসন হলবর্ন বায়াডাক্টে স্থাপিত বাষ্পচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন।
এডিসনই প্রথম সফলভাবে টাইপরাইটার এবং নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ কারার মতো ডিকটেটিং মেশিন উদ্ভাবন করেন। উন্নত টেলিফোন মাউথপিস ব্যবহারের জন্য তিনি কার্বন মাইক্রোফোন উদ্ভাবন করেন। তিনি পারমাণবিক শক্তির বিভিন্নমূখি ব্যবহার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
দরিদ্র পিতার সংসারে আয় বাড়াতে শিশুকালে যে এডিসন ট্রেনে ফেরি করে ক্যান্ডি ও খবরের কাগজ বিক্রি করতেন এবং বাজারে শাক-সবজি বিক্রি করতেন সেই এডিসন তার প্রতিভার গুণে তার জীবনে ১৪ টি কোম্পানি গঠন করেন। এরই অন্যতম বিশ্ব বিখ্যাত ‘জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি’। যা এখনও বিশ্বে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি প্রতিষ্ঠান।
এডিসনের ছিল শ্রবণ সমস্যা। তিনি কানে কম শুনতেন। ছিল ডায়াবেটিক। ১৯৩১-এর ১৮ অক্টোবর আমেরিকার নিউজার্সির ওরেঞ্জ লিওয়েলিন পার্কে অবস্থিত বাড়িতে ৮৪ বছর বয়সে মহান এই বিজ্ঞানী দেহ ত্যাগ করেন। তাকে উক্ত বাড়ির পেছনেই সমাহিত করা হয়। কথিত আছে এডিসনের শেষ নিঃশ্বাস একটি টেস্ট টিউবে ধারণ করে তা হেনরি ফোর্ড জাদুঘরে রাখা আছে।
এডিসনের নামে বিশ্বব্যাপি অনেক শহর, স্থান, সেতু ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। নিউজার্সিতে এডিসন সিটি স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে আছে এডিসন স্টেট কলেজ, থমাস আলভা এডিসন টাওয়ার এবং জাদুঘর। সঙ্গীতে রয়েছে এডিসন এওয়ার্ড। এটি তার বন্ধুরা তার নামে প্রবর্তন করেছেন।
১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে মাইকেল এইচ হার্টের বই ঞযব ১০০ -এ পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষদের অবদান বিশ্লেষণ করে তালিকা করা হয়। তাতে থমাস আলভা এডিসনের অবস্থান ৩৫তম। আমেরিকার লাইফ ম্যাগজিন ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের একটি বিশেষ সংখ্যায় দ১০০ গড়ংঃ ওসঢ়ড়ৎঃধহঃ চবড়ঢ়ষব রহ খধংঃ ১০০০ ণবধৎং’ শিরোনামে এক জরিপের ভিত্তিতে এডিসনকে প্রথম স্থান দেয়া হয়। এ বিষয়ে তাদের মন্তব্য ‘লাইট বাল্ব দ্বারা এডিসন গোটা বিশ্বে আলো জ্বালিয়েছেন’।
(তথ্য সূত্র : এৎবধঃ ওহাবহঃড়ৎ ঞযড়সধং অষাধ ঊফরংড়হ’- ডরষষরধস ঊহফবৎংড়হ ংশরঢ়; ‘ঊফরংড়হ ঞযব এৎবধঃ- গরশবষ গরষষবৎ ঝসরঃয;)
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট
যৎধযসধহ.ংধিঢ়ড়হ@মসধরষ.পড়স