মানুষের আস্থা অর্জনে সরকারকে জন-স্বার্থের কথা ভাবতে হবে

আপডেট: মার্চ ২৪, ২০২০, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


করোনা ভাইরাসের আক্রমণে সমগ্র বিশ^ তটস্থ চিন্তিত এবং শঙ্কিত। বাংলাদেশও তা থেকে দূরে নয়। চিনের পর ইতালিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ করোনার আক্রমণে মারা গেছে। চিনে প্রথম উহান প্রদেশে এই রোগ সনাক্ত হয়। সেখানের পরিস্থিতি বর্তমানে খানিকটা সুস্থ। কিন্তু ইতালিসহ ইউরোপ-আমেরিকার অবস্থা ক্রমাগত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে এই রোগের আবির্ভাব ঘটে মধ্য জানুয়ারিতে। ঢাকার একজন চিকিৎসাকর্মী জানিয়েছেন, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিমোনিয়ায় বেশ কয়েকজন রোগী মারা যায়। চিকিৎসকেরা প্রথমে কিছুতেই রোগ ধরতে পারেননি। চিনের ঘটনা পর বাংলাদেশের চিকিৎসকরা বিষয়টি বুঝতে পারেন। কোনো কোনো চিকিৎসক নাকি সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তখন মুজিববর্ষ ও রাজনীতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রোগবিরোধী ভূমিকা নিতে পারেননি বা সময় করে উঠতে পারেননি। করোনাবিরোধী কার্যক্রম দিয়েই মুজিববর্ষের সূচনা করতে সরকার পারতেন। তাতে মহাননেতার প্রতি যথাযথ সম্মানও জানানো হতো। কারণ মুজিব ছিলেন মানুষের নেতা। জনগণের বন্ধু। তাই লক্ষ লক্ষ টাকার বাজি না পুড়িয়ে করোনা প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে তাঁকে যথাযথ সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেয়া সরকারি দলের জনগণের ওপর দায়বদ্ধতা সাক্ষ্য দিতো। সেটা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বার বার সতর্ক করাা পরও তাঁর দলের হাইব্রিড নেতা-কর্মীরা সে দিকে কতোটা সচেতন ছিলেন তাদের মুজিবাদর্শ বিরোধী তৎপরতাই প্রমাণ করে। বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটও দলের হাইব্রিডদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে। অথচ চিন-ইতালি-আমেরিকা-কানাডায় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়নি। বরং পূর্বের মূল্যের তুলনায় সেই দেশের ব্যবসায়ী ও সরকার বিপন্ন মানুষদের পণ্য সরবরাহ করছে। সরকার সে সব দেশে ব্যবসায়ীদের ওপর তীক্ষè নজর রাখছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও এই বিপর্যস্ত সময়ে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চেয়ে পণ্যে মূল্য বৃদ্ধি না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক নাগরিককে তিন মাসের টাকা এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। যার সে পরিমাণ টাকা ব্যাংকে জমা নেই, তাকে ঋণ হিসেবে কানাডা সরকার টাকা দিয়েছেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সে টাকা কিস্তি অনুযায়ী পরিশোধ করার সুযোগ পাবে ঋণ গ্রহিতা। আর বাংলাদেশে যে পিঁয়াজ গতকাল ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, তার মূল্য আজকে ৬৫ টাকা। চাল কেজি প্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল যে ডালের মূল্য ১১০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে, আজ তার মূল্য ১২০ থেকে ১২৫ টাকা কেজি। সাবান, ডেটল ভিনিগারসহ আলুর মূল্যও বেড়েছে। আমাদের দেশে কোনো সংকট এবং উৎসব শুরু হলে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কেনো? সরবরাহের স্বল্পতা নাকি সব ব্যবসায়ী আর সরকারের ভেতরে অবস্থানকারী, যাদের দায়িত্ব বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিদর্শনের তারা? কারা এই মূল্য বৃদ্ধিকারী। সরকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের জন্যে স্বতন্ত্র বাজার করে দিয়ে সেখানে তাদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও তারা কোন্ খুঁটির জোরে যায়নি, সেটা সরকারই জানে। তবে সরকারি নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সরকারও কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু সেখানে দুর্ঘটনায় প্রাণ দিলো কয়েকজন মানুষ। এ ভাবে কি দেশ চলতে পারে? সরকার কাউকে খাদ্য কিংবা অর্থ না-ই বা দিলো, কিন্তু বাজার দরটা তো পূর্ববৎ রাখার জন্যে জনগণের সহযোগিতা নিতে পারতো? তারা সভা-সমাবেশে সব কাজ করেন জনগণের পক্ষে বলে দাবি করেন আর বাজারে আগুন লাগলে তার প্রতিক্রিয়া মূল্যবৃদ্ধিকারীদের পক্ষে ব্যক্ত করেন। এ দেশবাসীর সঙ্গে প্রহসন বলে অনেকেই মনে করেন। এ ভাবে একটা দেশ উন্নয়নের শিখরে পৌঁছুতে পারে না। যেখানে জনগণকে ট্রাম কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতেই নেতা-নেত্রী এবং মন্ত্রী-আমলারা বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন, সেখানে উন্নয়নের আনন্দ ও সুখটা ছিনিয়ে নেয়া হয় যখন জনসাধারণ ক্রমাগত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
এই যে বিভিন্ন আসনে উপ-নির্বাচনসহ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের তোড়জোর শুরু হয়েছিলো, তার ফলে কি জনসমাবেশ বন্ধ রয়েছে? আওয়ামী লীগের যদি দুটো আসনে পরাজিত হয়, তাতে কি সংসদে তাদের সংখ্যা গরিষ্ঠতা হারানোর ভয় আছে? বিএনপি তো নির্বাচন স্থগিতের দাবি করেছে। তাদের দাবির সঙ্গে সরকারের পদক্ষেপ মিললে কি জনসমর্থন থেকে সরকারি দল পিছিয়ে থাকবে। বরং নির্বাচন স্থগিত করলে সরকার জনআকাক্সক্ষার পক্ষে আছেন বলে প্রমাণিত হবে। কৌশলী হলে সরকার বিএনপির আগেই নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করতেন। জানি না সরকারের উপদেষ্টারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ডুবানোর লক্ষ্যে কী বলেছেন। ভোটারবিহীন কেন্দ্রে ভোট দিয়ে এই সংকটাপূর্ণ সময়ে ভি চিহ্ন প্রদর্শনের মধ্যেও কোনো বাহাদুরি নেই। বরং নিঃশব্দে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসাটাই উত্তম ছিলো। নির্বাচন কমিশন তো সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভোট করলেন। যেগুলোয় নির্বাচন হলো না, জনস্বার্থে স্থগিত ঘোষণা করলেন, তার ক্ষেত্রে সংবিধান কি রক্ষিত হলো? আসলে কে যে এদের সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করার কার্যক্রমে পরামর্শ দেন, তা যারা পরামর্শ শোনেন তারাই ভালো জানেন। আগে মানুষ পরে সংবিধান। কারণ সংবিধান মানুষের জন্য।
দেশের বাইরে অবস্থানকারীরা প্রতিদিন বিমান বন্দরে আসছে। তারা সরকারি নির্দেশ অমান্য করে পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করছে। দেশবাসী অভিযোগের আঙুল উঁচিয়ে বলছে, সরকার কেনো ফ্লাইট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না? বিদেশ ফেরতদের কারণেই করোনায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ধনি দেশগুলো নাগরিকদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, আমাদের সে সক্ষমতা পর্যাপ্ত নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যদিও বলেছেন, প্রয়োজনীয় খাদ্য মজুত আছে। সবাইকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সবাই নিরাপত্তা চায়। ঘরে থেকে যদি জীবন রক্ষা পায়, কে না তা চায়? কিন্তু যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের কি হবে? কে দেবে তাদের প্রতিদিনের চাল-ডাল? তাহলে তাদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কার কাছ পাবে? ভোট দাও, দিয়ে বেশি মূল্যে ভেজাল পণ্য খাও আর অসুখ-বিসুখে উচ্ছন্নে যাও, এমন মানসিকতা গ্রহণযোগ্য নয়। বিএনপি তো সরকারের ব্যর্থতা আর অযোগ্যতা দেখতেই বেশি সজাগ। তারা কি কখনো বিপন্ন বা কোনো রোগাক্রান্ত মানুষের কাছে গেছেন? যাননি। যারা নিজেরা মানুষের দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ান না, তাদের তো সমালোচনা সাজে না। জনসমাগম হয় এমন সরকারি আয়োজন, যেমন নির্বাচন, গানের আসর বসিয়ে করোনা বিরোধী প্রচারণা, ওয়াজ-নামযজ্ঞ রোধ করতে হবে। সৌদি আরবে কেবল কাবা শরিফে নয়, স্থানীয় অধিকাংশ মসজিদেও নামাজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের দেশে বলা হচ্ছে, ‘নামাজ আমরা পড়বো, নাম কীত্তন করবো’। এ সব করে স্রষ্টার সন্তুষ্টি আদায়ের মধ্যে দিয়ে করোনা মোকাবেলা করবো। তাহলে চিনের দেড়শো কোটি নাগরিক একযোগে স্রষ্টার বন্দনা করা শুরু করলে সেখানে করোনা কেনো মারণাস্ত্রও অকেজো হয়ে যেতো। ধর্মবোধ থাকা অশোভন নয়। অন্যায়ও নয়। ব্যক্তিগত বিশ^াস আর শ্রদ্ধাবোধ থাকলে কারো তো ক্ষতি হয় না। এতো যাদের ধর্মবোধ, স্রষ্টা ভীতি, তারাই তো শিক্ষিত এবং অধিকাংশই ঘুসখোর-দুর্নীতিবাজ। মূল্যবৃদ্ধিকারী আর ভেজালদাতার পৃষ্ঠপোষক। তারাই তো ৬৫ হাজার টাকায় বালিশ কেনে। পর্দা কেনে সত্তর লক্ষ টাকায়। দুর্বৃত্তায়ন করে এবং ঘুস খেয়ে কী করোনা ঠেকানো যায় কিংবা পণ্যে ভেজাল ও মূল্য বৃদ্ধি করে নামাজ পড়ে কিংবা দু¹া পূজা করে রোগ-বালাই প্রতিরোধ করা যায় না। জনগণের পক্ষে কাজ করতে হলে খানিকটা বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে। বিজ্ঞানই প্রতিরোধ করছে করোনাকে। সেটার প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা বিজ্ঞানিরা করছেন। কারণ এই আক্রমণ তো নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠির ওপর হচ্ছে না? বিশ^ময় তার তাণ্ডব চলছে। আমরা ঘরে ঘরে খাদ্য না দিতে পারি, তাদের সচেতন করে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা তো করতে পারি।
সমগ্র বিশ^ আজ করোনায় কাতর হয়ে উঠেছে। এ যেনো তৃতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বিশ^যুদ্ধের ফলে সারা দুনিয়ায় বেকারত্ব খাদ্যাভাব দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি শুরু হয়। কারা এই সংকটের হোতা? বিশে^র বিত্তশালীরা। যাদের নিয়ত মতলব কোন্ দেশের বাজার দখল করবে। কার ঘাড় মটকে সে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সুকৌশলে হাতিয়ে নিয়ে নিজেরা বিত্তশালী আর প্রভূত্বের পদে অধিষ্ঠিত হবে। আফ্রিকা-এশিয়ায় ধনি দেশগুলোর দৌরাত্ম এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে, তারা নিজেদের মধ্যেই মারামারি শুরু করে। তৈরি করে মানুষ হত্যার জন্যে নানা ধরনের মারণাস্ত্র। আণবিক বোমা, রাসায়নিক বোমা ইত্যাদি ভয়াবহ অস্ত্র তৈরি করে আমেরিকা জাপানের সরকারের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি, তারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে নিরস্ত্র সাধারণ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতাকে। ইশ্কুলে গেছে যে শিশুটি সে আর মায়ের কোলে ফিরে আসেনি। অথচ সে জানে না, তার কী অপরাধ! সেই অস্ত্রের ভাণ্ডার থেকে নিসৃত কোনো রাসায়নিক পদার্থের বিষক্রিয়া তো করোনা ভাইরাসের জীবাণু সৃষ্টি হতে পারে? চিনে প্রথম সনাক্ত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা ইতালিতে সেটা ধরা পড়ে অনেক পরে। আজকে গয়া-কাশি-বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণ ও রাধাও করোনা থেকে ভারতকে নিস্কৃতি দেয়নি। মক্কা-মদিনাকেও না। বিশে^র কোনো অবতারই অদৃশ্যে বসে তার ভক্তদের রক্ষার জন্যে এখন কোনো কার্যকর দায়িত্ব পালন করে কি? করছে না ভেজালদাতা-মূল্যবৃদ্ধিকারীর বিরুদ্ধে বিচার। বিজ্ঞানের মূল্যটা এখানেই দিতে হবে। এটাও মানুষের আবিষ্কার। শেষ পর্যন্ত মানুষ তার কীর্তির কাছে আশ্রয় নেয়। স্রষ্টা বিশ^াস থাকবে অন্তরে, একান্ত নিজের ভেতরে। আমরা যদি নিজেদের জিজ্ঞেস করি প্রতিদিনের কার্যক্রম সম্পর্কে, তাহলে ভালো-মন্দ উভয় উত্তরের মুখোমুখি হবো। সরকারকেও সে জবাব দিতে হবে। সেটাই গণতন্ত্রের বিধান বলে মনে হয়। অর্থাৎ জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি। এখন জানি না, সরকার এবং তার নেতা-কর্মীরা এ লেখার অর্থ বিকৃতভাবে নেবেন কি না। না নিলে তাদেরই ভালো। আমরা সাধারণ ভোটার, আমরা বোধ হয় সরকারকে পরামর্শ দিতেই পারি। কারণ বঙ্গবন্ধুর গড়া দল মুক্তিযুদ্ধের পরিচালনা করে এই দেশ সৃষ্টি করেছেন। আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে চাই। সে সুযোগ পেতে চাই। দল ও সরকার দায়িত্বশীল হোক, হোক জনঘনিষ্ট এটার জন্যে আজকের এ লেখা। তার বেশি কিছু নয়।