মানুষের কাঁধে কুরআন

আপডেট: মে ৪, ২০২১, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ:


দেখতে দেখতে রমজানের দুই দশক – রহমত ও মাগফিরাত – চলে গেল। আজ ২১ রমজান। শুরু হলো শেষ দশক। এই দশকের নাম রাখা হয়েছে নাজাতের দশক। অর্থাৎ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির দশক। নাছোড়বান্দা হয়ে আল্লাহর কাছ থেকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার দশক হচ্ছে এটা। এ শেষ দশকে আছে লাইলাতুল কদর নামে একটি মহিমান্বিত রাত। যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নাজিল করেন মহাগ্রন্থ আল কুরআন।
কুরআনকে আমানত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই আমানত বিশাল আকাশকে পেশ করেছিলেন। বিশালতার প্রতীক আকাশ, যা স্তম্ভ ছাড়াই পৃথিবীর ছাদ হয়ে বিস্তৃত। সেই আকাশ এটা বহন ও ধারণ করার অক্ষমতা প্রকাশ করল। সে বলল এটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। এরপর এ আমানত পৃথিবীর সামনে পেশ করা হলো। সে যেন এটা গ্রহণ করে। কিন্তু পৃথিবীও আনুগত্যের সাথে অক্ষমতা প্রকাশ করল। পৃথিবীর বুকে অটল ও স্থায়ীত্বের প্রতীক পর্বতকে এই আমানত পেশ করা হল। পর্বতও এ বিশাল আমানত বহন ও ধারণে অক্ষমতা প্রকাশ করল। অতঃপর এই আমানতের দায়ভার কাঁধে নিল মানুষ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হলো; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয় সে জালেম-অজ্ঞ। (সূরা আল আহজাব-৭২)
এখানে আমানত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তাফসীরে আমানত শব্দের অনেক অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে। তন্মধ্যে কুরআনও একটি আমানত। কেননা লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে আয়াতে বলা হয়েছে, আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালা আমানত বহনে অস্বীকার জানিয়েছে। মূলত দায়িত্ব পালন করতে পারবে কিনা এই ব্যাপারে তারা ভীত সন্ত্রস্ত ছিল। সমস্ত মাখলুক আল্লাহর ভয়ে ভীত। এই ভয়ের কারণেই মূলত তারা এই দায়িত্ব নিতে রাজী হয়নি। এ বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা অপর এক আয়াতের দিকে লক্ষ্য করি। আল্লাহ তায়ালা বলছেন, যদি আমি এই কুরআন পর্বতমালার উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে আপনি দেখতেন যে, পর্বতমালা বিনীত হয়ে আল্লাহ তায়ালার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। (সূরা আল হাশর-২১)
এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পর্বতের কাছে কুরআন নাজিলের ব্যাপারটা উল্লেখ করা হয়েছে। যদি কুরআন পর্বতমালার উপর অবতীর্ণ হতো তাহলে সে ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে যেত। তাহলে ভয়ে দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করা আমানতের অর্থ কুরআন হওয়াটা যুক্তিযুক্ত।
কাগজে কলমে আমরা যাকে কুরআন বলে জানি, মূলত তা কুরআনের কপি। এ কুরআনের মধ্যে যে বাণী (শব্দের উচ্চারণ ও অন্তর্নিহিত বিধানাবলী) লুকিয়ে রয়েছে তাই হচ্ছে আসল কুরআন। যা আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। এই কুরআনের কারণেই আজ পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় প্রাণী মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রাণী। শক্তিশালীও। হাদীস শরীফে আছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর যখন কুরআনের আয়াত (অহী) অবতীর্ণ হতো সে সময় তিনি যদি উটের পিঠে সওয়ার থাকতেন, উট সে ভার সইতে না পেরে বসে পড়ত। উটকে বলা হয় মরুভূমির জাহাজ। বিশাল শক্তিশালী প্রাণী। মরু ঝড় মোকাবেলা করে চলতে সক্ষম এই প্রাণী কয়েকদিন কোন কিছু পানাহার না করেই বেঁচে থাকতে পারে এবং বোঝা বহন করতে পারে। সেই শক্তিশালী প্রাণী যখন কুরআন অবতীর্ণ হতো তখন দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না। বসে পড়ত। তাহলে কুরআন কত ভারী জিনিস! অথচ এই কুরআনের বোঝা বহনের দায়িত্ব নিয়েছে মানুষ। এই হিসেবে বিশে¬ষণ করলে দেখা যায় মানুষ কত বড় শক্তিশালী প্রাণী।
আল্ল¬াহ তায়ালা বলছেন, মানুষ জালেম-অজ্ঞ। জালেম এ অর্থে যে, সে দায়িত্ব যথাযথ পালন করে না। অর্থাৎ কুরআনের মাধ্যমে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সে দায়িত্ব পালন না করে জুলুম করেছে। আর অজ্ঞ এ কারণে যে, যে বোঝা বহন করতে তাকে দেয়া হলো সে কখনও দেখল না, কিসের বোঝা তাকে বহন করতে দেয়া হয়েছে। গাধার মত সারাজীবন বোঝা বহন করেই গেল, কী বোঝা বহন করল তা কোনদিন জানতে চেষ্টা করল না। কুরআন শুধু বোঝারূপে বহন করার জন্য আসেনি। কুরআন এসেছে আমাদের জীবন তৈরী করার জন্য। আমাদের হেদায়েতের জন্য, আমাদের মুত্তাকী হওয়ার জন্য কুরআনের আগমন। যদি আমরা কুরআন থেকে হেদায়েত গ্রহণ করি এবং মুত্তাকী হই তাহলে সফলকাম। আর যদি তা না করি, তাহলে আমরা জালেম এবং অজ্ঞ ব্যক্তিতে পরিণত হব।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে কুরআন থেকে হেদায়েত নসীব করে মুত্তাকী হওয়ার তাওফীক দান করুন।
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী