মানুষ কি মানুষের জন্য নয়?

আপডেট: September 5, 2020, 12:06 am

ফিকসন ইসলাম


মঙ্গলবার আমার মোবাইল ফোনে একটা ক্ষুদে বার্তা বা ঝগঝ পেলাম। যিনি এই এস,এম,এস টি পাঠিয়েছেন সেটা পড়ে মনে হলো তিনি এখন খুবই অসহায় অবস্থায় আছেন, কতটা অসহায় তা তার পাঠানো ঝগঝ এর শেষ অংশ টুকু পড়লেই বোঝা যায়। তার অসহায়ত্ব এতোটাই বেশি যে তিনি উপায়ন্তর না পেয়ে যাকাত-এর টাকা থেকে এক বা দুই হাজার টাকা বিকাশ এর মাধ্যমে তাকে দেবার জন্য চরম আকুতি জানিয়েছেন। বিকাশ নং ০১৭৫২২৪৪৯২৩।
এসএমএস প্রেরণকারীর নাম মো. আবদুল মান্নান। তার সাথে আমার কখনো আলাপ পরিচয় হয়েছে কিনা জানি না বা মনেও করতে পারছি না কিংবা তিনি আমাকে চেনেন বা জানেন সেটাও মনে হলো না তারপরও তিনি কীভাবে আমার মোবাইল ফোন নং যোগাড় করেছেন তা আমি জানি না। তবে যেকোনো ভাবেই হোক না কেন তিনি কিছু সাহায্য চেয়ে আমার কাছে এই ক্ষুদে বার্তাটি পাঠিয়েছেন।
জনাব আবদুল মান্নান এর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, তিনি ঢাকায় বসবাস করেন। তার পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন ‘ঢাকাস্থ চাঁপাইনবাবগন্জ জেলা সমিতির তিনি ৪ নম্বর পৃষ্ঠপোষক সদস্য। বর্তমানে তিনি খুবই অসহায় এবং সর্বহারা। বারডেমে ৫ মাস ১৩দিন আইসিইউ তে চিকিৎসা সেবা নিয়ে সুস্থ হবার পর পিজি হাসপাতালে তিন মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর তার স্ত্রী মারা যান। মোট ৮ মাসের চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়ে যাওয়াতে এখন তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই তিনি আকুল আবেদন জানিয়ে জানতে চেয়েছেন যে, এই অবস্থায় কোনো সাহায্যে ও সহযোগিতা পাবার কি তিনি যোগ্য নন?
ভদ্রলোকের এই করুণ অবস্থা দেখে ভীষণ খারাপ লাগলো আর কস্ট পেলাম। তার উল্লেখ করা মোবাইল ফোন ০১৭১২২৬৬২১৬ নং-এ যোগাযোগ করে তার সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন, ঢাকার এলিফেন্ট রোডে তার একটা দোকান ছিলো কিন্তু অভাবের কারণে তা বিক্রি করে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তার কাছে জানতে চাইলাম, তিনি যেহেতু ঢাকাস্থ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সমিতির পৃষ্ঠপোষক সদস্য- তাই সেই সমিতি এই অবস্থায় সাংগঠনিকভাবে কোনো সাহায্য বা সহযোগিতা করেছে কিনা? কারণ তিনি সমিতির যে পর্যায়ের সদস্য তাতে করে এটা ঠিকÑ এই সমিতিতে তার অবদান অনেক বেশি। আমার প্রশ্ন শুনে তিনি স্পষ্টভাবে জানালেন, এখন পর্যন্ত জেলা সমিতির পক্ষ থেকে কোনো প্রকার সাহায্য তাকে দেয়া হয়নি। কথাটা শুনে খুব বিস্মিত হলাম এই ভেবে তাহলে এইসব জেলা সমিতির কাজ কী?
ভূপেন হাজারিকার ‘মানুষ মানুষের জন্য’Ñগানটি কি তাহলে মিথ্যে হয়ে গেলো? সমিতির যে গঠতন্ত্র বিদ্যমান তাতে তো স্পষ্টভাবে আদর্শ আর উদ্দেশ্য লেখা আছে। অসহায় সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলা আছে, বলা আছে যেকোনো সদস্যের সাথে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি…। এই ভদ্রলোক কিন্তু একজন সাধারণ সদস্য ননÑ তিনি এই সমিতির প্রথম ধাপের সদস্য যারা আজীবন সদস্যের উপরের গ্রেডের। আমার জানা মতে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে লাখ লাখ টাকা খরচ করে এই সমিতি ‘চাঁপাই উৎসব’ করেÑ যাকে কেউ কেউ ‘কালাই রুটি’ উৎসব বলে থাকেন। এছাড়াও প্রতি রমজান মাসে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেই সমিতির পক্ষ থেকে একজন অসহায় পৃষ্ঠপোষক সদস্যকে কোনো ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করা হয়নি সেটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তাহলে কি এই জেলা সমিতি শুধুমাত্র কালাই রুটি খাওয়া আর বনভোজন করার মধ্যেই এর কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ রয়েছে? আমার জানা মতে এই জেলার অনেক ধন্যাঢ্য ব্যক্তি এই ঢাকাতে বসবাস করেন। এদের কেউ কেউ আবার নিজের পরিচয় প্রচারণার জন্য পুরো জেলার সকল লাইট পোস্ট বা বিদ্যুৎ এর খাম্বাতে নিজের নাম ঠিকানাসহ রঙিন পোস্টার লাগিয়ে জনগণের কিংবা ইলেকশনের জন্য নিজ নিজ দলের হাই কমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যর্থ প্রয়াস করেন। কেউ বা আবার রিক্সা, অটোর পিছনে নিজের ছবিসহ পোস্টার লাগাচ্ছে। এতে লাখ লাখ টাকা অপব্যয় হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, এ জেলার অনেকেই সরকার বা বেসরকারি চাকরিতে শীর্ষ পদে আসীন হয়ে আছেন। তার পরেও কেন এই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সমিতির একজন শীর্ষ পর্যায়ের সদস্যকে অপরিচিত কোনো ব্যক্তির কাছে নিজের অসহায় অবস্থার কথা বর্ণনা করে ক্ষুদে সংবাদ পাঠাতে হচ্ছে! এই লজ্জা কেবল ঢাকাস্থ জেলা সমিতির নয়Ñ এ লজ্জা কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাবাসীর। আজকে যে উদাহরণটা সৃষ্টি হলো- সেটা যদি অন্য কোনো জেলার ক্ষেত্রে হতো বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বা চাঁদপুর কুমিল্লা জেলার, তাহলে নিশ্চিত করে বলতে পারি এভাবে কোনো ভদ্রলোক যাকাতের টাকা পাবার জন্য কোনো অপরিচিত কারো কাছে এভাবে ক্ষুদে সংবাদ পাঠাতে হতো না। কারণ অনেকগুলো জেলা সমিতি এমনকি উপজেলা সমিতির মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানার সুযোগ আমার হয়েছে।
আশা করি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সমিতির বোধোদয় হবে এবং মান্নান সাহেবের প্রতি মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিবেন।
লেখক: প্রকৌশলী