মান্দায় ফসলি জমিতে নির্বিচারে পুকুর খনন, খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা

আপডেট: মে ৯, ২০২১, ১:৩৯ অপরাহ্ণ

মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি :


কৃষক তনজেব আলী মাঠের তিন বিঘা বোরো ধানের জমিতে পুকুর খননের জন্য লিজ প্রদান করেছেন। বাৎসরিক ২০ হাজার টাকা চুক্তিতে তিন বিঘা জমি থেকে তার আয় হবে ৬০ হাজার টাকা। শুধু কৃষক তনজেব আলীই নন, এভাবে আরও ৪৪ জন কৃষকের নিকট থেকে একইভাবে অন্তত ২০০ বিঘা ধানি জমি লিজ নিয়েছেন একটি অসাধু সিন্ডিকেট। ইতোমধ্যে সেখানে খনন করা হয়েছে বিশাল আকৃতির পুকুর। ফলে চলতি মৌসুমে ওই মাঠের ২০০ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়নি। এতে করে প্রত্যেক বছর অন্তত ৬ হাজার মণ ধানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে চিরতরে।
এ চিত্র নওগাঁর মান্দা উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের মাউল মাঠের। শুধু মাউল মাঠেই নয় উপজেলার যত্রতত্র আবাদি জমিতে চলছে পুকুর খননের মহোৎসব। বর্তমানে মান্দা, পরানপুর, ভারশোঁ, গনেশপুর, কাঁশোপাড়া ইউনিয়নসহ বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের নহলা কালুপাড়া গ্রামের মাঠে বোরো ধানের জমিতে এস্কেভেটর দিয়ে পুকুর খনন করা হচ্ছে। এভাবে আবাদি জমিতে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করায় প্রতিনিয়ত কমছে কৃষি জমির পরিমাণ। একই সঙ্গে কমছে ফসলের উৎপাদন। এভাবে পুকুর খনন চলতে থাকলে আগামিতে ‘শস্যভান্ডা’র নামের পরিচিতি হারাবে নওগাঁর মান্দা উপজেলা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, বসতবাড়িসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কারণে প্রতিনিয়তই কমছে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ। বর্তমানে মাছ চাষের জন্য নিচু ফসলি জমি নির্বিচারে পুকুরে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষার পানি জমা হয় এমন বিলগুলোর বুক চিরে খনন হচ্ছে পুকুর। পুকুরগুলোর উঁচুপাড় বর্ষার পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে বর্ষাকালসহ শুষ্ক মৌসুমেও পুকুরগুলোর আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে তিন ফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। বোরো ধানের চাষ বিলম্বিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, উত্তরাঞ্চল খরাপ্রবণ এলাকা। ক্রমেই এ অঞ্চলের তাপমাত্রা বাড়ছে। ফসল উৎপাদনে কাঙ্খিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। এ কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার করতে হচ্ছে। এরই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করা হলে পরিবেশের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশে বর্তমানে খাদ্য ঘাটতি না থাকলেও ভবিষ্যতে বিশাল খাদ্য ঘাটতির সম্মুখীন হবে জাতি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মান্দা উপজেলায় মোট জমির পরিমাণ ৩৭ হাজার ৭১৯ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ ২৭ হাজার ৮৫১ হেক্টর। জনসংখ্যার অনুপাতে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ শতক। এছাড়া ৮০৫ হেক্টর জমিতে রয়েছে বনাঞ্চল। অবশিষ্ট জমি বিল, জলাশয় ও সরকারি পুকুর। তবে কত হেক্টর জমিতে ব্যক্তিমালিকানার পুকুর রয়েছে এর পরিসংখ্যান উপজেলা মৎস্য অফিস, কৃষি অফিসসহ কোন দপ্তরেই পাওয়া যায়নি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চলতি খরা মৌসুমের শুরু থেকেই মান্দা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমিতে পুকুর খননের মহোৎসব শুরু হয়। লোকাল প্রশাসন কিছুকিছু এলাকায় ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চালিয়ে দণ্ড-জরিমানাও করে। এরপরও থেমে থাকেনি পুকুর খনন। ইতোমধ্যে ফসলি জমিতে দুই শতাধিক পুকুর খনন করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও অব্যাহত রয়েছে খননকাজ। এ কাজের সঙ্গে জড়িত একশ্রেণির অসাধু সিন্ডিকেট বিভিন্ন কৌশলে এসব কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
পুকুর খননের জন্য জমির লিজদাতা কৃষকরা জানান, একবিঘা জমিতে ধান চাষ করে পাওয়া যায় ২০ থেকে ২৫ মণ ধান। ধান উৎপাদনে সার-কীটনাশক, হালচাষসহ অন্যান্য খরচ করতে হয়। একই সঙ্গে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অনেক সময় উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজার মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় লোকসান গুনতে হয়। কিন্তু মাছ চাষের জন্য একবিঘা জমি লিজ দিয়ে ২০ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এখানে কোনো টেনশন নেই।
মাউল গ্রামের কৃষক সামসুল আলম, আব্দুল কাদেরসহ আরও অনেকে জানান, চলতি বোরো মৌসুম শুরুর আগেই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের মাউল বিলে প্রায় ২০০ বিঘা জমির চারিদিকে পাড় দিয়ে ধানি জমি পুকুরে পরিণত করা হয়েছে। এতে করে প্রত্যেক মৌসুমে ওই বিল থেকে অন্তত ৬ হাজার মণ বোরো ধানের উৎপাদন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার কৃষকরা জানান, ‘আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। সেই মাছ উৎপাদনের অজুহাতে ফসলি জমিতে পুকুর খননের হিড়িক চলছে এটা ঠিক নয়। এভাবে পুকুর খননের সুযোগ দেয়া হলে একসময় ফসলি জমি মাত্রাতিরিক্তভাবে কমে যাবে। ধান উৎপাদনের জন্য যদি ফসলি জমি না থাকে তাহলে মাছ দিয়ে তখন কি হবে।’
এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২৫ শতক। বর্তমানে তা কমে ১০ শতকে এসে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় অনুমতি ছাড়াই শ্রেণি পরিবর্তন করে খনন করা হচ্ছে পুকুর। এতে করে দেশে ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। ফসলি জমিতে পুকুর খনন বন্ধ করতে আইনি পদক্ষেপ জরুরি বলেও মনে করেন এই কৃষিবিদ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোনমি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আব্দুল আলিম বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বসতবাড়ি নির্মাণ, নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা স্থাপনসহ বিভিন্ন কারণে দিনদিন কমছে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ। এর মধ্যে চলছে অপরিকল্পিত পুকুর খনন, যা কখনোই কাম্য নয়। তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রা বাড়ছে, তেমন বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। এ অবস্থায় অপরিকল্পিত পুকুর খনন করা হলে জলবায়ুর ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আগামিতে খাদ্য ঘাটতির সম্মুথীন হবে জাতি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ধান ও মাছের দামের পার্থক্য, মাছচাষ সহজ ও তুলনামুলক লাভবান বেশি হওয়ার সম্ভাবনায় মাছচাষে লোকজন ঝুঁকে পড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র কৃষি জমিতে খনন করা হচ্ছে পুকুর। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পরিবেশের ওপর। তিনি আরও বলেন, মাছচাষের ফলে মাটির গুণাগুন পরিবর্তন হয়। এছাড়া মাছচাষে ব্যবহৃত বিভিন্ন ফিডও কোয়ালিটি সম্পন্ন নয়। এ কারণে পুকুরের আশপাশের জমিগুলোতে ভাল ফসল উৎপন্ন হয় না। যত্রতত্র অপরিকল্পিত পুকুর খনন বন্ধ করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে মান্দা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ইমরানুল হক বলেন, সরকারি জমিতে কেউ পুকুর খনন করলে সেক্ষেত্রে অত্র দপ্তরের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। ব্যক্তিমালিকানার জমিতে পুকুর খনন হলে এ দপ্তরের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে পারেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ