মান রক্ষায় বিশ্ব মান দিবস

আপডেট: অক্টোবর ২৬, ২০১৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ
‘মান’ হচ্ছে যে কোন কিছুর গুনাগুণের একটি পরিমাপ। ‘মান’ বলতে কোন দ্রব্যের বাহ্যিক বা নৈসর্গিক মানকে বুঝায়।  প্রকৃতপক্ষে ‘মান’ হচ্ছে কতগুলো নির্ণয়ক যার সাথে পণ্যদ্রব্যের হুবহু মিল থাকে। আর বাহ্যিক মানই হচ্ছে নির্ণয়ক। কোন পণ্যের বা  দ্রব্যের ওজন, আকার, স্থায়িত্ব, রং বা বর্ণ, অবয়ব বা অন্যান্য বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য ‘মান’-এর আওতাভুক্ত।
এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “ঝঃধহফধৎফং নঁরষফ ঃৎঁংঃ” অর্থাৎ ‘মান’ আস্থা সৃষ্টি করে। পণ্য উৎপাদন ও সেবার মান নিশ্চিত করে ভোক্তার সন্তুষ্টি বিধানের মধ্য দিয়ে সহজেই ভোক্তার আস্থা অর্জন করা যায়। ভোক্তার আস্থা বা বিশ্বাস পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়ায়।
তথ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার কছে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পণ্যের ‘মান’ নিশ্চিত করা অপরিহার্য্য।
স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা না হলে উৎপাদক, বাজারজাতকারী এবং ভোক্তা উভয়পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ ভোক্তা চায় ন্যায্যমূল্যে স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও গুণমানসম্পন্ন পণ্য কিনে ভোগ করতে। সেক্ষেত্রে উৎপাদক যদি ক্রেতা/ ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয় অথবা ভোক্তার চাহিদার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণ করে পণ্যের গুণগত মানের বিষয়টি উপেক্ষা করে শুধুমাত্র লাভের বিষয়ে বেশি মনোযোগী হয় তাহলে সুনিশ্চিতভাবে ক্রেতা হারাবে। কারণ ক্রেতা যখন নির্দিষ্ট কোন পণ্য থেকে তার চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হবে তখন সে অনিবার্যভাবেই বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকবে। উৎপাদক বা বিক্রেতারাও প্রস্তুত থাকে, সজাগ ও সতর্ক থাকে ওইসব অসন্তুষ্ট ক্রেতা সাধারণকে আকৃষ্ট করবার জন্য। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক সময় বিক্রেতারা আপাত ক্ষতি স্বীকার করেও ক্রেতাদের ধরে রাখতে চায়। কারণ “ঈড়হংঁসবৎ রং ঃযব শরহম”- ভোক্তাই হচ্ছে রাজা। সুতরাং রাজাকে গুরুত্ব না দিলে তার প্রয়োজনকে বিবেচনা না করলে টিকে থাকা অসম্ভব।
বর্তমান বিশ্বে সেবার গুরুত্ব অপরিসীম। সেবার মান যত বাড়বে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়বে। সেবার মান বৃদ্ধির সাথে সাথে পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে পরিবেশের সুরক্ষা এবং ভোক্তাদের নিরাপত্তা বিধান করাও সুযোগ্য ‘মান’ রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের কাজ। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্যও মান নিয়ন্ত্রণের কোন বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সুষম আর্থিক নীতির সফল বাস্তবায়ন প্রশংসার দাবি রাখে। শুধুমাত্র তাই নয়, বাংলাদেশের জনগণের সচেতনতাও বেড়েছে। তাদের ভেতরে মানসম্পন্ন পণ্য ও সেবা ভোগের প্রবণতা তৈরি হয়েছে এবং উত্তরোত্তর এ প্রবণতা বাড়ছে। পণ্যের গুণগত মান নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে ব্যাপক প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় তারাই টিকে থাকতে সক্ষম হবে যারা যত বেশি গুণগত ‘মান’ বজায় রাখবে এবং শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে। ব্যবসা জগতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত ও মজবুত করতে উন্নত, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল নির্বিশেষে সব দেশকে পণ্য ও সেবার ‘মান’ সুরক্ষা ও উন্নত করতে কৌশলী ও যতœবান হতে হবে।
আমাদের দেশে পণ্যের ওজন, মান, ভেজাল নিরোধ, স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করাসহ সুস্থ-সুন্দর জীনব যাপনের জন্য যেসব আইন আছে তার যথাযথ বাস্তবায়ন হয় না। আইনের ফাঁক গলিয়ে অপরাধীর শাস্তি হয় না এবং শাস্তির ব্যবস্থা অপরাধের তুলনায় অপ্রতুল বলে অপরাধীরা আইনের তোয়াক্কা করে না। সুতরাং, এসব আইনের সংশোধন করে যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ। সেটা সম্ভব হলে সেবার মান আপনাআপনিই ভালো হবে। শ্রমিক আইনের যদি যথাযথ বাস্তবায়ন হয় তাহলেও সেবার মান বাড়বে। শ্রমিক যদি সুস্থ-সুন্দর পরিবেশে কাজ করতে পারে, ন্যায্য মজুরি পায়, চিত্ত বিনোদনের সুযোগ পায় তাহলে তাদের সেবার মান সুনিশ্চিতভাবে বাড়বে। বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই দেশিয় পর্যায়ে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
শিল্পায়ন ছাড়া একটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে পারে না। সুতরাং শিল্পপতিদের বিশ্বের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে দেশিয় সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে নতুন নতুন ধারণার উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে যোগাযোগ ও তথ্য ব্যবস্থার উন্নতি সাধনের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চুক্তির ফলে দেশিয় স্বার্থ যাতে কোনভাবে ক্ষুণœ না হয় সেদিকে সূতীক্ষè দৃষ্টি দিতে হবে। এসব চুক্তির সুদূরপ্রসারী ফলাফল চলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমঝোতায় আসা উচিৎ। নতুবা দেশ তথা দেশের জনগণের স্বার্থ ক্ষুণœ হতে পারে।
সুতরাং, বিশ্বমানের সেবা প্রদানে সংশ্লিষ্ট সকলের সচেতনতা, আন্তরিকতা, সততা, নিষ্ঠা, পারস্পরিক সদ্বিশ্বাস একান্ত প্রয়োজন। পরস্পরের স্বার্থে এ বিষয়গুলোকে সকলের সহযোগিতামূলক আচরণ পরস্পরকে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে সাহায্য করবে। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মানুষে মানুষে দূরত্ব অনেক কমেছে সত্যি কিন্তু প্রকৃত অর্থে পারস্পরিক সহাবস্থান ও নৈকট্যলাভের জন্য মানসিক দূরত্ব কমানো সম্ভব সর্বস্তরে কাজের “মান” বজায় রাখার মধ্য দিয়ে। সুতরাং, শুধু আইন বা ঘোষণা নয়- আমাদের সততা ও সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটুক সেবার “মান” উন্নয়নের মধ্য দিয়ে।