মাশরাফির জন্য কেন এত আকুলতা!

আপডেট: এপ্রিল ১৭, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক



তার নামের সঙ্গে ভালোবাসা, আবেগ, অনুপ্রেরণা সব মিলেমিশে একাকার। তিনি একাই যেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের দিনবদলের নায়ক। বাংলাদেশ দলে তারকার অভাব হয়তো নেই, কিন্তু সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে, সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ক্রিকেটারের অভাব ছিল। সেই অভাব দূর করে মাশরাফি মুর্তজা আজ ‘ক্রিকেটের মহানায়ক’। যার টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের সিদ্ধান্তে সতীর্থ থেকে শুরু করে সারা দেশের মানুষ ব্যাকুল। ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মাশরাফি বল হাতে যেমন সফল, তেমনি সফল নেতৃত্বেও। আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে টাইগারদের চমকপ্রদ উত্তরণেই তা প্রমাণিত। তার অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ নবম স্থান থেকে উঠে এসেছে সপ্তম স্থানে, মর্যাদার চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ‘নেতা’ মাশরাফি যেন পাল্টে দিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের চিত্র। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন প্রতিপক্ষের কাছে ভীতি ছড়ানো, সমীহ জাগানো দল!
সব কিছুর যেমন শুরু আছে, তেমনি শেষও আছে। এটাই জীবনের চিরন্তন সত্য। একজন ক্রিকেটারকেও ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, একদিন ব্যাট-প্যাড-বল তুলে রাখতেই হয়। মাশরাফিও বিদায় নিলেন টি-টোয়েন্টি থেকে। শ্রীলঙ্কা সফরে প্রথম টি-টোয়েন্টি শুরু হওয়ার ঠিক আগে, টসের সময় হুট করে ঘোষণা দিলেন অবসরের। সঙ্গে-সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গন স্তব্ধ, বিমূঢ়। আবার বহু ক্রিকেটপ্রেমী প্রতিবাদে সোচ্চার। মাশরাফির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি বলেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাজশাহীতে ভক্তরা রাস্তায় নেমেছেন ব্যানার হাতে। তাদের দাবি, ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’কে দেশের মাটিতেই বিদায় নিতে হবে টি-টোয়েন্টি থেকে। আর ক্রিকেট বোর্ডকেও সন্মানের সঙ্গে বিদায় জানাতে হবে দেশের সফলতম অধিনায়ককে।
মাশরাফির দুই হাঁটুতে ছয়-ছয়টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। একটি বা দুটি অস্ত্রোপচারেই কাবু হয়ে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার উদাহরণ অনেক আছে। অথচ মাশরাফি খেলে চলেছেন এখনও। শুধু খেলছেনই না, বাংলাদেশ  ক্রিকেটের ঘোর দুঃসময়ে নেতৃত্বের ভার কাঁধে নিয়ে দলকে পৌঁছে দিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়।
তাই শুধু সাধারণ ক্রিকেটভক্ত নয়, সতীর্থদের কাছেও আবেগ আর অনুপ্রেরণার প্রতিশব্দ মাশরাফি। বহু ক্রিকেটপ্রেমীর মতো সাকিব আল হাসানেরও বিশ্বাস, মাশরাফির উপস্থিতির অনুপ্রেরণাই জয় এনে দিতে পারে বাংলাদেশকে। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার প্রায়ই বলেন, ‘মাশরাফি ভাই প্রথম ওভারে কিংবা প্রতিপক্ষের প্রথম উইকেট তুলে নিলে, ওই ম্যাচগুলোর বেশিরভাগই আমরা জিতি।’
শুধু বাংলাদেশ নয়, যে কোনও দলের জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারেন মাশরাফি। ২০১৫ সালে বিপিএলের তৃতীয় আসরে তেমন শক্তিশালী দল গড়তে পারেনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানেস। মাশরাফির তখন ফিটনেস সমস্যা ছিল। তবু ‘আনফিট’ মাশরাফিকে দলটির কর্মকর্তারা অনুরোধ করেছিলেন, শুধু অধিনায়ক হিসেবে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে! তারপরের কথা তো সবারই জানা। অনুরোধে সাড়া দিয়ে প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন তিনি, দলকে এনে দিয়েছিলেন শিরোপার মধুর স্বাদ। গত মৌসুমে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে তার নেতৃত্বে দুর্বল দল নিয়েও দারুণ লড়াই করেছিল কলাবাগান ক্রীড়া চক্র। শ্রীলঙ্কায় বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন জানান, ‘মাশরাফিকে টি-টোয়েন্টির অধিনায়কত্ব ছাড়ার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু টি-টোয়েন্টি নয়।’ কিন্তু ‘বুদ্ধিমান’ মাশরাফি শুধু অধিনায়কত্ব নয়, টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে আর টি-টোয়েন্টি দলে দেখতে চাচ্ছেন না মাশরাফিকে। হাথুরুসিংহে কী জানতেন, মাশরাফির সিদ্ধান্তে এমন আবেগের ঢেউ উঠবে দেশজুড়ে! দলের জুনিয়র ক্রিকেটাররা কেঁদে-কেটে একাকার হবেন, ক্ষত-বিক্ষত হবেন তাসকিন-মোসাদ্দেক-মিরাজরা।
তার টি-টোয়েন্টি থেকে বিদায়ের ঘোষণা শুনে দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল নিজের ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘আপনি যত বেশিই বলুন না কেন, সেটা কম হয়ে যাবে; মানুষটা যখন আমার ক্যাপ্টেন মাশরাফি ভাই! তার ঝুলিতে হয়তো কোনও বিশ্বরেকর্ড নেই। তিনি হয়তো অন্য কোনও দেশের কিংবদন্তির মতো ৪০০ বা ৫০০ উইকেট নেননি। কিন্তু একটা ব্যাপারে তিনি অনন্য। মাশরাফি বিন মুর্তজা আমার কাছে একজন জীবন্ত কিংবদন্তি।’
টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমও আবেগাক্রান্ত। ফেসবুকে তার মন্তব্য, ‘সব ভালো জিনিসই শেষ হয়, এটা সম্ভবত তাদের মধ্যে একটা। ম্যাশকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ দল চিন্তা করা কঠিন, আপনি সত্যিই একজন চ্যাম্পিয়ন। আমি নিশ্চিত, প্রত্যেকে গর্ববোধ করে আপনার মতো একজনের নেতৃত্বে খেলে। এটা সত্যি সম্মানের।’
মানুষ হিসেবেও মাশরাফি নিজের মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন অনেকবার। এ প্রসঙ্গে একটা উদাহরণ দেওয়াই যায়। গত অক্টোবরে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে চলছিল বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ওয়ানডে ম্যাচ। নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ এড়িয়ে হঠাৎ মাঠের মধ্যে ঢুকে পড়েন এক দর্শক। এরপর এক দৌড়ে চলে যান মাশরাফির কাছে। বাংলাদেশ অধিনায়কও কোনও দ্বিধা না করে তাকে টেনে নেন বুকে।
মাশরাফি আসলে এমনই। সাফল্যের শীর্ষাসনে বসেও তার মধ্যে নেই কোনও তারকাসুলভ অহমিকা। এমন একজনকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ তো আবেগে ভাসবেই। তার টি-টোয়েন্টি থেকে বিদায়ের ঘোষণায় আকুল হবেই ক্রিকেটভক্তরা!-বাংলা ট্রিবিউন