মাহসা আমিনি: ইরানে বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে দুষছেন খামেনি

আপডেট: অক্টোবর ৪, ২০২২, ১২:৩২ অপরাহ্ণ

মাশা আমিনিন মৃত্যুর পর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছেন ইরানের নারীরা।

সোনার দেশ ডেস্ক :


ইরানে পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় এক নারীর মৃত্যুর জেরে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ চলছে সেজন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ।
চলমান অস্থিরতার বিষয়ে তার প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্যে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন এই “দাঙ্গা” ইরানের চিরশত্রæ এবং তাদের মিত্রদের দ্বারা প্ররোচিত।

তার শাসনের সময়কালে এরকম বিক্ষোভ গত এক দশকের মধ্যে তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও প্রস্তুত থাকার আহŸান জানিয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে এই বিক্ষোভের প্রতি সহিংস প্রতিক্রিয়ায় তারা “শঙ্কিত”।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক বিবৃতিতে বলেছেন যে “শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর তীব্র সহিংস দমনপীড়নের” খবরে তিনি “গভীরভাবে উদ্বিগ্ন”।
তিনি বলেন, এই বিক্ষোভকারীরা “ন্যায়বিচারের” জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র “ইরানি নারীদের পাশে রয়েছে” যারা “তাদের সাহসিকতা দিয়ে বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করছে”।

যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়ায় এই একই মনোভাব প্রতিধ্বনিতে হয়েছে। সোমবার লন্ডনে ইরানের সবচেয়ে সিনিয়র ক‚টনীতিককে তলব করেছে দেশটি, তেহরানে তাদের নেতাদের এই বলতে যে “অস্থিরতার জন্য দেশের বাইরের লোকজনকে দোষারোপ করার পরিবর্তে, কৃতকর্মের জন্য তাদের দায়িত্ব নেওয়া উচিত এবং তাদের জনগণের উদ্বেগের কথা শোনা উচিত”।

দেশটি নারীদের হিজাব পরার কঠোর আইন ভঙ্গ করার অভিযোগে ১৩ই সেপ্টেম্বর ইরানের নৈতিকতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনী দ্বারা আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাইশ বছর বয়সী মাহসা আমিনি নামে এক নারী কোমায় চলে যান এবং এর তিনদিন পর তার মৃত্যু হয়। এরপর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছেন ইরানের নারীরা।

তার পরিবার অভিযোগ করে যে পুলিশ তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে এবং তাদের একটি গাড়ির সাথে তার মাথা ধাক্কা দেয়া হয়েছে। পুলিশ বলেছে যে তার প্রতি কোন খারাপ আচরণের প্রমাণ নেই এবং তিনি “হঠাৎ হৃদযন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হন”।

মাহসা আমিনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা। “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” এবং আয়াতুল্লাহ খামেনির দিকে ইঙ্গিত করে “স্বৈরশাসকের মৃত্যু” এরকম স্লোগানের সাথে সাথে তারা তাদের মাথার স্কার্ফ বাতাসে নেড়েছেন, তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন।

সোমবার পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাডেটদের একটি গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন মিজ আমিনির মৃত্যুতে “আমরা মর্মাহত”।

“কিন্তু যেটা স্বাভাবিক নয় তা হল কিছু লোক কোনরকম প্রমাণ ও তদন্ত ছাড়াই রাস্তাঘাটকে বিপজ্জনক করে তুলেছে, কুরআন পুড়িয়েছেন, পর্দানশীন নারীদের হিজাব খুলে দিয়েছেন এবং মসজিদ ও যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন,” যোগ করেছেন খামেনি।

ইরানের সমস্ত রাষ্ট্রীয় বিষয়ে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী আয়াতুল্লাহ খামেনি জোর দিয়ে বলেছেন যে ইরানের “সকল ক্ষেত্রে শক্তি অর্জনকে” সহ্য করতে না পেরে বিদেশী শক্তিগুলি “দাঙ্গার” পরিকল্পনা করেছে।

“আমি স্পষ্টভাবে বলছি যে এই দাঙ্গা এবং নিরাপত্তাহীনতার নীলনকশা এঁকেছে আমেরিকা ও তার দখলদার মিথ্যা ইহুদিবাদী শাসক (ইসরায়েল) এবং সেইসাথে ছিল তাদের অর্থ প্রদানকারী দালালেরা, আর বিদেশে থাকা কিছু বিশ্বাসঘাতক ইরানীদের সহায়তা।”

তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে তার পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন এই বলে যে তারা এই অস্থিরতার সময় “অবিচারের” মুখোমুখি হয়েছেন।
নরওয়ে ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান, ইরান হিউম্যান রাইটস রবিবার বলেছে যে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৩৩ জন নিহত হয়েছে। জাতিগত বেলুচ অ্যাক্টিভিস্টরা জানিয়েছেন যে তাদের মধ্যে ৪১ জন বিক্ষোভকারী শুক্রবার জাহেদানে এক সংঘর্ষে মারা গেছেন।

তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে নিরাপত্তা কর্মীসহ ৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরানের নৈতিকতা পুলিশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
তার সর্বশেষ বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকারীদের উপর আমেরিকা এই সপ্তাহে “আরও অবরোধ আরোপ করবে”।

ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সহিংসভাবে দমন করার একদিন পর আয়াতুল্লাহ খামেনির মন্তব্য এসেছে।
সেখানে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইরান হিউম্যান রাইটস রবিবার বলেছে যে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৩৩ জন নিহত হয়েছে।
বিবিসির কাসরা নাজি বলেছেন যে রবিবার রাতে তেহরানের শরীফ ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির ক্যাম্পাসের চারপাশে গুলির শব্দে অনেক ইরানির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যে কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনী ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করলেও শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিহত করে এবং সব প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু আমাদের সংবাদদাতা যোগ করেছেন যে সেখানে ঘেরাও করে রাখা হয়। যে সমস্ত শিক্ষার্থীরা পাশের একটি গাড়ি পার্কের মধ্য দিয়ে বের হয় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল তাদের একে একে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছে, চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা একটি ভিডিওতে একটি গাড়ি পার্কের ভিতরে প্রচুর সংখ্যক লোককে দৌড়াতে দেখা যাচ্ছে এবং কিছু পুরুষ তাদের মোটরসাইকেল নিয়ে তাড়া করছে।
পরে রাতে শিক্ষক ও সরকারের একজন মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পুলিশের ঘেরাও তুলে নেওয়া হয়।

সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেছে যে তাদের সকল আটক সহপাঠীকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরে যাবে না। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ “ছাত্রদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা” উল্লেখ করে সব ক্লাস অনলাইনে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহান, শিরাজ, তাবরিজ এবং কেরমানশাহ সহ দেশের অন্যান্য শহরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
কারাজ এবং শিরাজে তোলা এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে স্কুলছাত্রীরা তাদের মাথার স্কার্ফ বাতাসে নেড়ে “স্বৈরশাসকের মৃত্যু” বলে স্লোগান দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ