মায়ানমারের বর্বরতা ও মিথ্যাচার || অপরাধ আড়ালের কৌশল সফল হবে না

আপডেট: অক্টোবর ১, ২০১৭, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

রাখাইন রাজ্যের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের দেখতে কূটনীতিকদের একটি সফর মিয়ানমার সরকার বাতিল করে দিয়েছেঅ এ কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ। রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের দিন ২৮ সেপ্টেম্বর বিবিসি এই তথ্য জানিয়েছে।
গত ২৫ অগাস্ট সহিংসতা শুরুর পর এটাই ছিল জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের সফরের প্রথম পরিকল্পনা, যা ভেস্তে গেল। বিবিসি বলেছে, সফর বাতিলের কোনো কারণ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দেখায়নি বলে জাতিসংঘের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে বলে জাতিসংঘের দাবি। তবে মিয়ানমার সরকার তা অস্বীকার করে আসছে।
অভিযানের মুখে রাজ্যটি থেকে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই শরণার্থীরা বলছেন, সেনাবাহিনী নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে, জ্বালিয়ে দিচ্ছে বাড়ি, ধর্ষণ করছে নারীদের।
মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সহিংসতায় নতুন মাত্রা পেয়েছে হিন্দু গণকবরে ৪৫টি মরদেহ পাওয়ার পর। মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর দাবি, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এই হিন্দুদের হত্যা করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে দেখছে মরদেহের রাজনীতি হিসেবে। তারা বলছে, এ ঘটনায় আরসার ওপর দোষ চাপানো রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত মানবতাবিরোধীবিরোধী অপরাধের সুষ্ঠু তদন্তে অনীহার বহিঃপ্রকাশ।
ভারতের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের এক প্রতিবেদনে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ভারতে নিযুক্ত মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত মং ওয়াই। তিনি বলেছেন, কোনও কোনও প্রতিবেশী দেশের উসকানিতেই রোহিঙ্গা জঙ্গিদের হাতে মৃত্যু হচ্ছে হিন্দুদের। বক্তব্যে মং ওয়াই প্রতিবেশী বলতে মূলত বাংলাদেশকেই বুঝাতে চেয়েছে। কিন্তু তার বক্তব্য অন্তঃসারশুন্য, মিথ্যাচার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গণতান্ত্রিক কোনো দেশ এ কথা বিশ্বাস করবে না। কেননা বাংলাদেশের সরকারের যে নীতি তাতে মং ওয়াই-এর মিথ্যাচারের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং তার বক্তব্যে হিউমান রাইটস ওয়াচের বিবৃতির সত্যতাই প্রকট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ তার দেশের অভ্যন্তরের ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে। দেশের জঙ্গিদের কঠোর হাতে দমন করছে এবং বাংলাদেশ সাফল্য লাভ করেছে। এর জন্য বাংলাদেশ সারা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশকে জঙ্গি-সন্ত্রাসের সাথে অভিযুক্ত করে লাভ হবে না। বরং মিয়ানমার মিথ্যাচার করে বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে হিন্দু-মুসলাম বৈরিতায় উস্কানি দিয়ে নিজেদের মানবতাবিরাধী অপরাধ আড়াল করতে চাইছে। মিয়ানমারের এই অপচেষ্টার স্বীকারোক্তি আমরা জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ থেকেও প্রমাণ পাই।
২৮ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, আরসার ওপর হিন্দুদের হত্যার দায় চাপিয়ে সরকার বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা নিধন সংক্রান্ত ঘটনার যথাযথ তদন্তে নিজেদের অনাগ্রহকেই প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পোড়া কিংবা ছুরি-বন্দুক কিংবা অন্য কিছু দিয়ে ভয়ংকর জখম করা দেহ, তাদের ওপর যৌন সহিংসতার আলামত বিশ্লেষণ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এরইমধ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের মানবতোবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ এনেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর দাবি, মিয়ানমারের মরদেহ নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করা উচিত। সামরিক নৃশংসতার অবসান ঘটিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত দলকে রাখাইনে প্রবেশ করতে দেয়া উচিত যেন সব ধরনের অপরাধের যথাযথ তদন্ত করা যায়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের সব ধরনের নৃশংতাই মায়ানমার রোগিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত করেছে। এটাকে মিথ্যাচার দিয়ে আড়াল করা যাবে না। বরং তাদের মিথ্যাচারগুওেলাই গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ ও লুটপাটের সত্যতাকেই প্রকট করে তুলেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দেশ মায়ানমারকে চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক মর্যাদা দিয়ে ফেরৎ নিতে, তাদের পুনর্বাসনে বাধ্য করতে। অন্যথায় দেশটিকে বয়কট-অবরোধ করার সময় এসেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ