মা : অনেক তৃপ্তির আভা

আপডেট: মে ২৫, ২০১৭, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম


১৫ মে রোববার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে ‘মা দিবস’। বাংলাদেশে প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালন করা হয় মা দিবস। সতেরো শতকে ব্রিটেনেই প্রথম শুরু হয় মা দিবস পালনের রেওয়াজ। সেখানে প্রতিবছর মে মাসের চতুর্থ রোববারকে ‘মাদারিং সান ডে’ হিসেবে পালন করা হতো। এরপর ১৮৫৮ সালের ২ জুন আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় প্রথম মা দিবস পালন করা হয়। মা দিবসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার লক্ষ্যে ১৮৭২ সালে জুলিয়া ওয়ার্ড ব্যাপক লেখালেখি শুরু করেন। এরপর ১৮৭২ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রোববার নিজের মায়ের মৃত্যু বার্ষিকীতে ‘মা দিবস’ পালন করেন।
বর্তমানে প্রচলিত মা দিবসের সূচনা হয় ১৯০৮ সালে। গত শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার এক স্কুল শিক্ষিকা অ্যানা জারভিস সেখানকার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা দেখে মর্মাহত হয়ে মায়ের জন্য বিশেষ দিন পালনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির কথা ভাবেন। তার সে ভাবনা বাস্তবায়নের আগে ১৯০৫ সালের ৯ মে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেন। বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে ১৯০৮ সালে তার মা ফিলাডেলফিয়ার যে গির্জায় উপাসনা করতেন, সেখানে সব মাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা দিবসের সূচনা করা হয়। ১৯১১ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আমেরিকা জুড়ে মায়েদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি বিশেষ দিন উদযাপন করা হয়। ১৯১৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন আনুষ্ঠানিকভাবে মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে মায়েদের জন্য উৎসর্গ করে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেন। এখন বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মা দিবস পালন করা হয়।
মা শব্দের সাথে ¯েœহ, মায়া, মমতা, আদর, সোহাগ, ভালোবাসা, আবদার, কপট রাগ-বিরাগ, শাসন-অনুশাসন, অভিযোগ-অনুযোগ ইত্যাদি সবই জড়িয়ে আছে। এ পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর এবং মধুর ডাক হলো মা। মা-মমতা এবং ভালবাসার প্রতীক। মা মা-ই। পৃথিবীতে যার কোন তুলনা হয় না। মা অনেক বিশাল এক শব্দ। ব্যাপক তার পরিধি। মা তার সহজাত মমত্ব দিয়ে সন্তানদের আগলে রাখেন। অসামান্য দরদে মা-ই একমাত্র সবচেয়ে কাছের বন্ধু। এমন কোন কথা নেই যা মাকে বলে শেয়ার করা যাবে না। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে হাসি-কান্নায় মা সারাক্ষণ সন্তানের পাশে থাকেন। মা এমন একজন মানুষ যাকে নিয়ে যত কথা বলা বা লেখা হোক তবু কমতি থেকে যায়।
প্রতিটি সন্তানের কাছে মা অনেক কিছু। তাই প্রত্যেক সন্তানের কাছে তার মা পৃথিবীর সেরা। পৃথিবীতে এমন কোন সন্তান নেই যারা মায়ের ¯েœহভরা মমতার স্পর্শ পায়নি। মায়ের ভালবাসার মাঝেই সন্তান বেঁচে থাকে। মায়ের ঋণ কোনদিন শোধ হবার নয়। যারা মা হারিয়েছে তারাই জানে মায়ের কি শূন্য। যে মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত, সে অবশ্যই হতভাগ্য। মহানবী (স.) বলেছেন, “সন্তানের উত্তম আচরণ ও শ্রদ্ধা পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকারী হলেন, মা!” প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) আরও বলেছেন, “সেই মায়ের সাথে উচ্চস্বরে-কথা বলিও না, যেই মা তোমাকে কথা বলা শিখিয়েছে”।
নেপোলিয়ন এর মতে, ‘একটি দেশের পুনরুজ্জীবনের জন্য বিশেষ কিছুরই দরকার হয় না, কেবল মাত্র দরকার হয় না, কেবল মাত্র দরকার হয় কিছু সংখ্যক সু-মাতার।’ তাইতো লেডি বার্নার্ড বলেছেন, ‘মা সকল ক্ষেত্রে সকল পরিবেশেই মা।’ পৃথিবীতে এমন কোন মহামূল্যবান জিনিস নেই যার সাথে মায়ের তুলনা করা যায়। মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি নাম। মায়ের চেয়ে সহজ আর গভীর কোন অনুভূতি নেই। পৃথিবীতে সবার ভালবাসা শেষ হতে পারে। কিন্তু মায়ের ভালবাসা কখনো শেষ হয় না। পৃথিবীর সকল সন্তানের হৃদয়পূর্ণ থাকে মাতৃভক্তিতে।
মায়ের মিষ্টি মধুর কথাগুলো সব সময় মনে পড়ে। মা-তুমি না থাকলে কে বলতো, ঠা-া লেগে যাবে, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস কিন্তু , ফোনটা রেখে এখন ঘুমিয়ে পড়, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়, সকালে উঠতে হবে, পুরোটাই খেয়ে উঠবি কিন্তু, সারাদিন মোবাইল চালাবি পড়তে বসবি না, সাবধানে বাড়ি ফিরিস ইত্যাদি ইত্যাদি। তাইতো মা মানে নিজের কান্না চেপে রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানো। কষ্ট পেয়েও সুখে থাকার অভিনয় করা, শত কষ্টের মাঝেও সন্তানের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা। মিথ্যে কথা বলার চেষ্টা করলে বুঝে ফেলা, তুই ভালো থাকলে আমি ভালো। মায়ের আঁচলই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয়। মা আল্লাহর দেয়া পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার ও সুখ। মা পাশে থাকলে সন্তানেরা দুঃখ ভুলে যায়।
মা দিবস উপলক্ষে আমার মায়ের কিছু স্মৃতি এখানে তুলে ধরলাম। যা আমার ব্যথাতুর হৃদয়কে সবসময় নাড়া দেয়। মা ছিলেন খুবই কড়া এবং মেজাজী। নীতিতে সবসময় অটল এবং অবিচল। ঘড়ি দেখে দুপুরের খাবার দিতেন একটার সময়। এর আগেও না পরেও না। ছেলে বেলায় আমি মায়ের অজান্তে বারোটার সময় ঘড়ির কাটা এক ঘণ্টা বাড়িয়ে একটা বাজিয়ে মাকে বলতাম, সময় হয়েছে খেতে দাও। মা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে খেতে দিতেন। খাওয়ার পর আমি পুনরায় গোপনে ঘড়ির কাটা পিছিয়ে সাড়ে বারোটা বাজাতাম। মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মা বলতেন, একটু আগেও দেখলাম ঘড়িতে একটা বাজে আর এখন সাড়ে বারোটা। মাকে বলি, তুমি ভুল দেখেছো। মায়ের সহজ সরল স্বীকারোক্তি, তাই হবে বাবা, বয়স হয়েছে না। কি দেখতে কি দেখি। এরপরে প্রায়ই ঘড়ির কাটা বাড়িয়ে খাবার খেতাম। অবশেষে একদিন চেয়ারে দাঁড়িয়ে দেয়াল ঘড়ির কাটা বাড়ানোর সময় মা আমাকে হাতে নাতে ধরে ফেলেন। ভয়ে আমি আতংকিত হলে মা চুপিসারে হেসে বলেন, ভয় পাসনে খোকা, তোর বাবাও মাঝে মাঝে রাত্রিতে ঘড়ির কাটা এগিয়ে এনে রাতের খাবার খেয়ে থাকে। তুই তার যোগ্য- বাপ কা বেটা, তাই না? এ কথা বলে মা খুব জোরে হেসে উঠেন। মাকে এর আগে কখনো এতো জোরে হাসতে দেখিনি।
আরেকবার ছুটির দিন। সকাল থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছেই। তাই বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছি। এমন দিনে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। মায়ের অনেক স্মৃতির মাঝে তার মিষ্টি মধুর  পিটুনি এবং আদরের কথা সর্বাগ্রে স্মৃতিপটে ভেসে আসে। ছেলেবেলায় মমতাময়ী মায়ের হাতের পিটুনি কমবেশি সবাই খেয়েছে। তখন পিটুনি খেতে খারাপ লাগলেও বড় হয়ে তার অবর্তমানে সে সব মধুর স্মৃতির কথা মনে পড়লে ভীষণ ভাল লাগে। মা বেঁচে থাকলে স্বতঃস্ফুূর্ত আবেগ আর উৎসাহ নিয়ে স্বেচ্ছায় তার হাতের আরও পিটুনি অবশ্যই খেতাম। মায়ের হাতের পিটুনি মানেই কোমল পরশ আর নরম সতেজ ছোয়া। শাসনের পর মুহুর্তেই মা সোহাগের হাত বাড়িয়ে অসম্ভব আদর যতœ করতেন। তার হৃদয় জুড়ে ছিল শুধুই সারল্য। অবশ্য রেগে গেলে ভয়ে কাছেই যেতাম না।
পাশাপাশি মায়ের আদর ছিল অসম্ভব সুন্দর। যেন কাশফুলের নরম ছোয়া। তার ¯েœহ জড়ানো সোহাগে হৃদয় কানায় কানায় ভরে যেত। নতুন আশার প্রাণোচ্ছ্বাসে বাধনহারা হয়ে অফুরন্ত শান্তির পরশ পেতাম। হৃদয়ে ও মননে মাকে সবসময় অনুভব করি। মা ছিলেন আমার জীবনের, সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তার আবেগি কন্ঠের ডাক শুনে পুলকিত হয়ে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতাম। মায়ের স্পর্শে দেহ মনে আনন্দের শিহরণ জেগে চরম সহানুভূতির সৃষ্টি হতো। মায়ের মুখের সহজ সরল প্রান্তবন্ত হাসি ছিল সকালের সদ্য ফোটা ফুলের মতো। যা দেখে মনের কালো মেঘ নিমেষেই উধাও হয়ে যেত।
মায়ের ন¤্রতা হৃদয়ে সদা জাগ্রত। তার অম্লমধুর অনুযোগ ছিল দিগন্ত ছোয়া নীলাকাশের মতো। মায়ের সাবলীল কথা হৃদয়ে অনেক তৃপ্তির আভা এবং আলো ছড়িয়ে দেয়। মায়ের কোলে শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে থাকা সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। তাই তো মায়ের অভাব হৃদয়ে বেদনা জাগিয়ে দু’চোখ পানিতে ভরে যায়। অশ্রুসজল চোখে বিষন্ন হয়ে ভাবি, মায়ের কোন বিকল্প নেই। অথচ প্রায়ই শুনি ছেলের হাতে মায়ের অমানুষিক নির্যাতন। এমন কি মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ পর্যন্ত।
১৯৭৬ সাল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সামনে সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা, বিষয় ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। মোটামুটি প্রস্তুতি নিয়েছি। কার্জন হলে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। নিচে পরীক্ষা হল। উপরে চারিদিক থেকে স্যারদের কঠোর তদারকি আর অনুশাসন। হলে কথা বলা তো দূরের কথা, ঘাড় ঘুরানোর সুযোগ নেই। স্যারদের বক্তব্য পারলে লিখবে, না পারলে খাতা জমা দিয়ে চলে যাবে।
আমার মা শুধু স্বাক্ষর করা ছাড়া লেখাপড়া জানতেন না। তার একই কথা পরীক্ষা দিলেই পাশ করতে হবে। পাশ ছাড়া কোন বিকল্প নেই। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় তার কাছে দোওয়া নিতে গেলে গুরু গম্ভীর হয়ে বলতেন, পারিস না পারিস খাতা ভরে লিখে আসবি। দেখবি পাশ করে গেছিস।
নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা হলে গিয়ে দেখি যা পড়ে গেছি তা কমন পড়েনি। ভাবলাম পরীক্ষা ড্রপ দিবো। সহপাঠীরা অনেকেই পরীক্ষা না দিয়ে হল থেকে বের হয়ে যায়। মায়ের কথা ভেবে ভয় পেয়ে আমি পরীক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। মা লেখাপড়া না জানলেও একটি পরামর্শ দিয়েছিলেন, যার সম্পর্কে পড়ে যাচ্ছিস পরীক্ষায় তার সম্পর্কে প্রশ্ন না আসলে নাম পরিবর্তন করে লিখে আসবি। তাই করলাম। পড়ে গেছি হবস, লক কিন্তু পরীক্ষায় এসেছে প্লেটো ও রুশো সম্পর্কে। নাম পরিবর্তন করে প্লেটো ও রুশোর কথা লিখে দেই। এভাবে প্রশ্ন কমন না পড়লেও মায়ের পরামর্শ মতো নাম পরিবর্তন করে দেদারছে খাতা ভর্তি করে লিখেছিলাম।
অবশেষে পরীক্ষার ফল বের হয়। সেবার আমি প্রতিটি বিষয়ে ভাল মতো পাশ করি। রেজাল্ট হাতে মায়ের সামনে যেতেই মা গম্ভীর হয়ে বলেন, কিরে পাশ করেছিস? কৃতজ্ঞতার সাথে বিনীতভাবে মুখে একরাশ হাসি নিয়ে বলি, জ্বি মা পাশ করেছি। মা মুখে তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন, লেখাপড়া জানি না। কিন্তু আমার বুদ্ধিতে তুই সফল হয়েছিস। আমি শ্রদ্ধা ভরে বলি অবশ্যই মা। মা এখন আর বেঁচে নেই কিন্তু মায়ের এই বুদ্ধির কথা চিরদিন স্মরণ থাকবে।
আমার মা ১৯৯১ সালের ১৪ই আগস্ট মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। মায়ের কথা মনে পড়লে দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। হৃদয়ে বয়ে যায় বেদনার অফুরন্ত আবাহন। তখন মাকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা মনে পড়ে যায়, …” মায়ের কথা মনে পড়ে জো¯œা রাতের বেলা, মাগো তুমি আমায় ফেলে কোথায় একা গেলা…”।
লেখক: পুলিশ কর্মকর্তা (অব.), (আই.জি ব্যাজ, জাতিসংঘ ও রাষ্ট্রপতি পদক প্রাপ্ত)