মা-ছেলে একইসঙ্গে এইচএসসি পাস করায় পরিবারে আনন্দের বন্যা

আপডেট: জুলাই ২৪, ২০১৭, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সুফি সান্টু, নাটোর


মা শাহনাজ পারভিন এবং ছেলে রাকিব আমিন সবুজ-সোনার দেশ

পড়ালেখার যে কোন বয়স নেই তা আবারো প্রমাণ করেছেন নাটোরের শাহনাজ পারভিন (৪০) এবং তার ছেলে রাকিব আমিন সবুজ (২০)। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে একসঙ্গে পাস করেছেন শাহনাজ পারভিন ও ছেলে রাকিব আমিন সবুজ। শাহনাজ পারভিন নাটোর মহিলা কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে চার দশমিক ৮৩ এবং ছেলে রাকিব নাটোর টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে তিন দশমিক ৬৭ পেয়েছেন।
ছেলের চেয়ে মায়ের ফলাফল ভালো হওয়ায় আনন্দের বন্যা বইছে শাহনাজ পারভিনের পরিবারে। মা ছেলে পাস করার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শাহনাজ পারভিনের বাড়িতে ভিড় করছেন এলাকাবাসী। তবে উচ্চশিক্ষার জন্য তারা সরকারের প্রতি সকল সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন।
শাহনাজ পারভিনের পরিবার জানায়, ১৯৯২ সালে তেলকুপি এলাকার রুহুল আমীনের সঙ্গে বিয়ে হয় শাহনাজ পারভিনের। এরপর পরিবার নিয়ে শহরের নাটোর শহরের মল্লিকহাটি মধ্যপাড়ায় বসবাস করে আসছেন তিনি। বিয়ের পর ১৯৯৫ সালে স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করেন তিনি। এরপর অভাবের সংসারের কারণে আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেন নি শাহনাজ পারভিন। এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জননী শাহনাজ পারভিন স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নার্সের চাকরি করে সংসার পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু লেখাপড়ার গুরুত্ব বিবেচনা করে চল্লিশ বছর বয়সেই শাহনাজ পারভিন ২০১৫ সালে নাটোর মহিলা কলেজে কম্পিউটার বিষয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে চার দশমিক ৮৩ পয়েন্ট নিয়ে উত্তীর্ণ হন।
মা শাহনাজ পারভিন বলেন, ১৯৯৫ সালে এসএসসিতে সেকেন্ড ডিভিশন নিয়ে পাস করি। এরপর আর লেখাপড়া করার সুযোগ হয় নি। কিন্তু যখন বুঝলাম লেখাপাড়ার কোন বয়স নাই। তখন কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দেই।
তিনি আরো বলেন, ভবিষতে উচ্চশিক্ষার জন্য ভালো কোন কলেজে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু অভাবের সংসারে সাংসারিক কাজ করে লেখাপড়া চালিয়ে নেয়া খুব কঠিনই। তাই সরকারি কোন সহযোগিতা পেলে লেখাপাড়া আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
এদিকে, শাহনাজ পারভিনের ছেলে রাকিব আমিন সবুজ শহরের নাটোর টেকনিক্যাল অ্যান্ড কলেজ থেকে ইলেকট্রিক্যাল বিষয় নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এবারের পরীক্ষার ফলাফলে মায়ের চেয়ে কম পয়েন্টে তিন দশমিক ৬৭ নিয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি।
ছেলে রাকিব আমিন সবুজ বলেন, আমার থেকে মায়ের ফলাফল ভালো হওয়ায় খুব খুশি হয়েছি। তাছাড়া মায়ের ফলাফল ভালো হওয়ার কারণে পরিবারের সবাই আনন্দিত।
শাহনাজ পারভিনের ভাই সাংবাদিক কাউছার আহম্মেদ বলেন, বাবার অভাবের সংসারে অনেক আগেই বোনকে বিয়ে দিয়ে দিই। একদিন হঠাৎ করেই বোন বলেন, পুনারায় লেখাপড়া শুরু করবেন তিনি। এতে আমরাও সাপোর্ট দিই। পরে নাটোর মহিলা কলেজে কম্পিউটার বিষয়ে ভর্তি হয় সে। তিনি আরো বলেন, বোন শাহনাজ স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চাকরি করে সংসার পরিচালনা করেন। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশিই লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। কলেজের অধ্যক্ষকে বলে ফরম পূরণের টাকাসহ অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। তার অদম্য এই ইচ্ছাশক্তিকে আরো দূরে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের সহযোগিতা চাই।
শাহনাজ পারভিনের স্বামী রুহুল আমীন এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তার স্ত্রী ও ছেলে এক সঙ্গে পাস করায় পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। অভাবের সংসারেও যে তারা পাস করেছে এজন্য ভালো লাগছে।
তিনি আরো বলেন, তার স্ত্রী একটি ক্লিনিকে চাকরি করার পর অবসর সময়ে পড়ালেখা করতেন। তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য আমার প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। তবে অভাবের সংসারে যদি সরকারি কোন সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া গেলে তারা আরো ভালো ফলাফল করবে।
এ বিষয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, পড়াশোনার কোন বয়স নেই। তার উদাহরণ শাহনাজ বেগম ও সবুজ। তাদের যে অদম্য মনোবল তারা আরো এগিয়ে যাবে এই প্রত্যাশা করি। সরকারি কোন সহযোগিতার প্রয়োজন মনে করলে তাদের সকল সহযোগিতা করা হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে গত এসএসসি পরীক্ষায় বাগাতিপাড়ার গালিমপুর এলাকার মা মলি রানী কুন্ডু ও ছেলে মৃন্ময় কুমার কুন্ডু একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। সে সময় নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন, স্থানীয় সাংসদ আবুল কালাম আজাদসহ অন্যান্যরা অভিনন্দন জানিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তাদের পাসে এসে দাঁড়ান।