মা বাবার ঋণ শোধ হয় না

আপডেট: July 26, 2020, 12:07 am

সামসুল ইসলাম টুকু


আমার ৩৯ বছর বয়সে তুমি চলে গেলে মা। তোমার মৃত্যু আমি দেখতে পাইনি। বড় ছেলে হিসেবে তোমাকে কবরেও নিয়ে যেতে পারিনি। তখন আমি ঢাকায় ছিলাম ব্যবসার কাজে। তোমার মৃত্যুর খবর দেওয়া সম্ভব ছিলো না। আমি জানি মা তুমি বড় অভিমান করে চলে গেছো। আমার উপর তোমার ভীষণ অভিমান। আমিসহ আমার ছেলেমেয়েদের প্রায় ১৪ মাস তুমি দেখতে পাওনি। আমিও তোমাকে দেখতে পাইনি। ভাড়া বাড়িতে চলে যেতে হয়েছিলো আমাকে। সেই অভিমানে শেষ দেখাটার সুযোগও তুমি আমাকে দাওনি। আমি বাড়িতে থাকলে এতো দ্রুত তোমাকে যেতে দিতাম না। আমার অবর্তমানে তোমার ওষুধপথ্য এবং দেখভালের অভাব ছিলো। আমি ছিলাম তোমার সবচেয়ে ভরসার ছেলে। আমি তা বুঝতে পারি। আমি এক হতভাগ্য বলে তোমার শেষ সেবাটুকু করতে পারিনি। এ জন্য যে শাস্তি আমাকে দেবে তা মাথা পেতে নিবো। তবে তুমি তো মা আমাকে শাস্তি দাওনি তোমার অপার স্নেহের কারণে। বরং তোমার পরিপূর্ণ আর্শীবাদ ছিলো আমার উপর। আমি দৃঢ়ভাবে সেটা বিশ^াস করি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। তাই তো আমার ছেলে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষা পেয়েছে, বড় চাকরি করে। ছোটবেলা থেকেই তোমার সর্বোচ্চ ভালোবাসা পেয়েছি আমি। তুমি ছিলে সর্বংসহা সহ্যশীলা মানুষ। সহ্য করা ও ধৈর্য ধারণ করার যেটুকু সবক পেয়েছি তা তোমার কাছ থেকেই। সংসারের করুণ অবস্থায় তুমি তো আমাকে সাথে নিয়ে প্রতিটি কাজ করতে সংসারের উন্নতি করতে। তোমার নির্দেশনার জন্যই সংসারটা ভেঙ্গে যায়নি। কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে সংসারকে গুছিয়ে রেখেছিলে। আমি ছিলাম তোমার অবয়বের অবিকল প্রতিকৃতি। তাই বোধ হয় আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে। আজ তুমি নেই। তোমার অনুপস্থিতি খুব কষ্ট দেয়। দীর্ঘশ^াস ফেলা বই আর তো কিছু করার নেই। আমার পরিবারের আজকের যে সুখ তা তুমি দেখে যেতে পারোনি বলে আমার মনে খুব কষ্ট হয়। কারণ এর পেছনে সব অবদান তোমারই। তোমার প্রাণখোলা আর্শীবাদ। তুমি আমাকে কতো স্নেহ করতে তা মর্মে মর্মে বুঝতে পারি। আমার কি পছন্দ অপছন্দ আমার শরীর রক্ষার জন্য কী কী প্রয়োজন সব পরামর্শ দিতে তোমার বউ মাকে- সেও তোমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে আজও। সেও তোমার মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
মা আজও মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। আমার ভীষণ জ¦র হয়েছে। তুমি জ¦র কমানোর জন্য তোমার হাতের তালু দিয়ে আমার হাত পায়ের তালু ঘঁষে দিয়েছো, মাথায় পানি ঢেলেছো। আমাকে সুস্থ করে তুলেছো। ছোটবেলায় আমি খুব দুর্বল ছিলাম। তুমি আমাকে কোনো কষ্ট পেতে দাওনি। তোমার ডানা দিয়ে আড়াল করে রেখেছো। আরবি পড়া যেটুকু শিখেছিলাম তোমার কাছ থেকেই। যতো সৎ পরামর্শ সব সময় তুমি আমাকে দিয়েছো। আজ সেই পরামর্শ দেওয়ার কেউ নেই। তোমার অভাব বোধ মনে বড় বাজে। মাতৃস্নেহ যা পেয়েছি তাতে মনে হয় আমার চেয়ে বেশি অন্য কোনো ভাইবোন পায়নি। সব মায়া কাটিয়ে তুমি চলে গেছো দূরে, বহু দূরে, সবার নাগালের বাইরে। দূর থেকে হয়তো দেখছো তোমার আর্শীবাদপুষ্ট এই সন্তানকে। কিন্তু আমি তো তোমাকে দেখতে পাই না। এ বেদনা কাকে জানাবো।
মা এর মৃত্যুর ২০ বছর পরে আমার ৫৯ বছর বয়সে বাবা তুমিও আমাদের ছেড়ে চলে গেলে পরপারে। এ কুড়ি বছর তুমি অনেক কষ্ট নিয়ে বেঁচে ছিলে। আমাকে আর আমার ছেলেমেয়েদের প্রতিষ্ঠা দেখার জন্য এবং উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার জন্যই। আমি তা পেয়েছি বাবা। আমার বিপদে আপদে ঢাল হয়ে রক্ষা করেছো। তুমি মারা যাওয়ার পরই বুঝতে পেরেছিলাম কতো বড় বটবৃক্ষের ছায়ায় এতোদিন অবস্থান করছিলাম। যে কোনো বিপদ আপদকে এতোদিন তুচ্ছজ্ঞান করেছি। জানতাম বাবা আছে সব সামলে নেবে। দীর্ঘ ৫৯ বছর সেভাবেই আগলে রেখেছিলে নিঃস্বার্থভাবে। যেমন কঠোর শাসন করতে তেমনি মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহ করতে। এখন বুঝি বাবার মতো বন্ধু কেউই হতে পারে না। এখন ৭০ বছর অতিক্রম করেছি। কিন্তু সব সময়ই তোমার প্রয়োজন অনুভব করি। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ভাবি তুমি বেঁচে থাকলে সুপরামর্শ পেতাম।
মনে পড়ে তুমি সকালে উঠে আমাকে হরিমোহন মাঠে নিয়ে যেতে। যাওয়ার পথে বিভিন্ন সামাজিক উপদেশ দিতে, বিভিন্ন শিক্ষামূলক গল্প বলতে। মাঠে গিয়ে ব্যায়াম করাতে, মাঠের চারপাশে দৌড়াতে বলতে। আমাকে উৎসাহিত করার জন্য নিজেও দৌড়াতে। ব্যায়াম শেষ হলে নিয়ে যেতে মহানন্দা নদীতে সাবান মাখিয়ে গোসল করাতে। এনাজুদ্দিনের মিষ্টির দোকানে গিয়ে লুচি হালুয়া খাওয়াতে। এ কথাগুলো মনে হলে মনটা হাহাকার করে উঠে। একদিন জুল্লু চাচার সাথে নদীতে গোসল করতে গিয়ে ডুবতে বসেছিলাম। এ কথাগুলো তুমি আমাকে সাঁতার শিখিয়েছিলে। পারছিলাম না তখন নিষ্ঠুরভাবে গভীর পানিতে ছুঁড়ে ফেলতে। এভাবেই সাঁতার শিখেছি। অষ্টম শ্রেণিতে উঠে বলেছিলাম, বাবা বীজগণিত পারি না। তোমার শিক্ষা জীবনে বীজগণিত ছিলো না। তদুপরি তুমি বই পড়ে সেটা আয়ত্ব করেছিলে এবং এতো সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলে যে আজও তা ভুলিনি। তোমার ঞবহংব পড়ানোর কায়দা ছিলে অপূর্ব, যা হৃদয়ে গেঁথে আছে। আমার ছেলেমেয়েদেরও তুমিই ঞবহংব শিখিয়েছিলে। ভূগোলের দিনরাত্রি ও ঋতু পরিবর্তন শেখানোর জন্য রাতের বেলায় প্রদীপের সামনে এলুমিনিয়ামের গোল পাতিল ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দিনরাত্রি বুঝিয়ে দিয়েছো। এগুলো ভুলতে পারি না। তোমার বংশের আত্মীয় স্বজন আমাদের বাড়িতে এলে তোমার পাগলাটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ার কথা ও বিশেষ করে তোমার পঠন পদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা করতো। এ সব কথা মনে হলে চোখ ছলছল করে। কম কথা বলার উপদেশ বার বার মনে পড়ে। আমিও ছেলেমেয়েদের ওই উপদেশ দেই। ব্যক্তিত্ব গড়ে তোমার পরামর্শ আমাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। আপনজন কারো আক্রমণের শিকার হলে পাল্টা আক্রমণ করে তাকে ধরাশয়ী করতে বলেছো। আপনজনকে ধরে কাঁদতে বলোনি। প্রতিপক্ষের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে শেখাওনি। বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে শিখিয়েছো, হতাশ হতে নিষেধ করেছো। কোনোদিন কোনো কাজে বাধা দিতে না। শুধু বলতে কাজ করার আগে ভেবে দেখবি, ঠিক করছিস না ভুল করছিস। বাম রাজনীতিতে যখন ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়লাম তখন বলেছিলে, তুই যাদের জন্য লড়াই করছিস তারা যদি সেটা বুঝতে পারে যে, তাদের জন্য লড়াই করছিস তাহলেই তোর সার্থকতা। অন্যথায় তোর লড়াই হবে বৃথা। তোমার দেওয়া এ সব শিক্ষা আমার জীবন চলার পুঁজি ও পাথেয়।
তোমার ধৈর্যের যে ইতিহাস আমি জানি ও স্বশরীরে প্রত্যক্ষ করেছি তা ভাবলে বিস্মিত হই। তুমি একটাই মানুষ, ভারতের জমির মামলায় হাজিরা দিয়েছো ভারতের মালদহতে। তারপর সীমান্ত পেরিয়ে এসে ঠিক পরের দিনই পূর্ব পাকিস্তান হালে বাংলাদেশের জমির মামলায় হাজিরা দিয়েছো নাটোরে। শুধু হাজিরাই দাওনি। নিজ মামলা পরিচালনার জন্য কোনো উকিল নিয়োগ করোনি। বিচারকের অনুমতি নিয়ে নিজেই মামলা লড়েছো। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মামলায় জেলার সবচেয়ে বড়ো উকিল শাহজাহান বিশ^াস ও নাটোরের বিখ্যাত উকিল প্রদ্যুত লাহিড়ীকে হারিয়েছো। এমন যোগ্য পিতা ক’জনের আছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছুদিন আগে থেকেই আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় এবং জমি থেকে ফসল পাচ্ছিলাম না। এমন করুণ অবস্থায় তুমি হতাশ হওনি। তুমি কিভাবে রেডিও পাকিস্তান রাজশাহী কেন্দ্রে কপিস্ট সেকশনে চাকরি যোগাড় করে নিলে তা ভাবতে আজও অবাক লাগে। প্রতিদিন সকালের ট্রেনে রাজশাহী যেতে এবং রাত্রে বাড়ি ফিরতে আর ওই কপিস্ট হিসেবে কাজ করে যে সামান্য রোজগার করতে তা দিয়েই সংসার চালিয়েছোÑ সেটা আজও আমার কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে আছে। সংগ্রাম কমিটি যখন তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছেড়ে ভারত পালিয়ে গেলো তখন পাক বাহিনী চঁপাইনবাবগঞ্জে সবেমাত্র অবস্থা নিলো। সে সময় আমি নবাবগঞ্জ কলেজে বিএসসির ছাত্র এবং বাম রাজনীতির একজন সমর্থক। বাবা তুমি আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে একদিন সকালে উঠে আমাকে সাথে নিয়ে গলিপথ দিয়ে শহরের বাইরে এসে মহাডাঙ্গা ব্রিজ পেরিয়ে লোকালয় ত্যাগ করে ও মানুষের চলার পথ পরিহার করে মাঠে মাঠে এলোপাথাড়ি হেঁটে, না খেয়ে সন্ধ্যার পর সীমান্ত অতিক্রম করলে এবং পরদিন সকালে ফারাক্কায় ট্রেনে চড়ে পরদিন প্রায় ৪০০ মাইল দূরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রামে জনৈক বিভাবতী হাঁসদার কাছে আমাকে সোপর্দ করে এলে। এটাই ছিলো আমার প্রথম ভারত দর্শন। যুদ্ধের ৯ মাস সেখানেই অবস্থান করেছি। তোমার এই ছেলের নিরাপত্তার জন্য তুমি এতোটা করেছো। মাঝে মাঝে ভাবি আর আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। আমার চার ছেলেমেয়েকে পিঠে আর ঘাড়ে চড়িয়ে বৃদ্ধ বয়সেও নিয়ে বেড়িয়েছো। তাদের পরোটা খাইয়েছো, তাদের জেদ আবদার পূরণ করেছো এসব কথা মনে হলে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে যায়, বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৯ সালে রাজশাহী মেক্যিাল কলেজ হাসপাতালে ডা. বড়ুয়াকে দিয়ে আমার হাইড্রোসিল অপারেশন করিয়ে দিয়েছিলে। পরদিন নিজে না খেয়ে আমার জন্য কিসমিস কিনে দিয়েছিলে। তুমি আমাকে কোনোদিন চাকরি করতে বলোনি, নিরুৎসাহিত করেছো। স্বাস্থ্য বিভাগে সরকারি চাকরি পেয়েও এক মাস চাকরি করার পর ছেড়ে চলে এসেছি। তোমার ইচ্ছা ছিল আমি যেন উৎপাদনমুখি কোনো ব্যবসা করি। যেখানে স্বাধীনতা থাকবে এবং থাকবে আমার উৎপাদন করার কৃতিত্ব। কিন্তু তোমার সে ইচ্ছে পূরণ করতে পারিনি বাবা। ছেলেমেয়েদেরও ওই পথে নিয়ে যেতে পারিনি। তবে তারা চারজনই প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। তাদের উঠে দাঁড়ানোর দ্বারপ্রান্তে আসার পূর্বেই তুমি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলে। এ সময় তুমি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই তুমি গর্ববোধ করতে তোমার চক্ষের পুত্তলিদের নিয়ে। ১৯৯২ সালে আমি সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ডিসি আশরাফ আলীর রোষের শিকার হই। ফলে সংসারের ও অর্থের ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও তুমি আমাকে একবারও দুর্বল করোনি। বলেছিলে তুই কি ডোম চামারের সাথে লড়াই করছিস। লড়াই করছিস জেলার বড় আমলার বিরুদ্ধে, বাঘের সাথে। লড়াই চালিয়ে যা তাতে যতো ক্ষতিই হোক না কেন। শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবি। আমি সব সময়ই তোর সাথে থাকবো। এমন বাবার জন্য ভীষণ গর্ব হয়, হৃদয়টা উথলে ওঠে। বাবা তোমার এই ছেলে দু’খানা বই লিখেছে। ‘সাংবাদিকতার ত্রিশ বছর’ ও ‘কলম কথা কয়’। সেটাও দেখে যেতে পারোনি। তুমি চলে গেছো বাবা কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে তোমার নির্দেশ শুনতে পাই। প্রায় প্রতিদিন স্বপ্নে তোমাকে দেখি। তোমার সাথে কোথায় যাচ্ছি, কোথায় কাজ করছি। মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি আমাকে ডাকছো তোমার কাছে। দ্রুতই যেন তোমার কাছে চলে যেতে পারি সেই প্রর্থনাই করি।
লেখক : সাংবাদিক