মিরপুরে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ‘জঙ্গি’রা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৭, ১:১৩ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ঢাকার মিরপুরে ঘিরে রাখা বাড়িতে মঙ্গলবার রাতে কয়েক দফা বিস্ফোরণে আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা-সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের মাজার রোডের বাঁধন সড়কের বর্ধনবাড়ি এলাকার ভাঙ্গাওয়াল গলির ছয়তলা বিশিষ্ট বাড়িতে ‘জঙ্গি’রা আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।
ওই বাড়িতে পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। এছাড়া আকাশে কালো ধোঁয়া উড়তেও দেখা যায়। এ সময় বাতাসে বারুদের গন্ধ পাওয়া যায়।
বুধবার রাত ১০টা ৪০ মিনিটে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের প্রধান মুফতি মাহমুদ খান বলেন, আমরা বেশ কয়েকবার তাদেরকে আত্মসমর্পণের কথা বলেছিলাম। এরপর তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে আত্মসমর্পণের কথা জানিয়েছিল। এই সময় পার হয়ে গেলেও এরপর যখন তারা আত্মসমর্পণ করছিল না তখন আমাদের পক্ষ থেকে আবারও যোগাযোগ করা হয়। এ সময় তারা আরও ৩০ মিনিট সময় চায়। এর পরপরই শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটায় তারা। এতে কেমিক্যাল এক্সপ্লোশন হয়ে ওই বাড়ির পাঁচতলায় আগুন ধরে যায়।
মুফতি মাহমুদ খান বলেন, বিস্ফোরণের ফলে স্পিল্টারে চার র‌্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
জঙ্গিরা বেঁচে আছে কি না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং প্রধান বলেন, এখন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করবেন ওখানে। এরপর আইনের ধারা মোতাবেক তল্লাশি চালিয়ে সব খতিয়ে দেখা হবে।
এর আগে র‌্যাব (র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) সদস্যরা ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ’সহ তার সহযোগীদের আত্মসমর্পণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ওই বাড়িটি থেকে সাংবাদিকদের ১০০ গজ দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। উৎসুক জনতাকে আরও দূরে অর্থাৎ দেড় থেকে ২০০ গজ দূরে অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়।
র‌্যাব সদস্যরা বাড়িটির চারপাশে অবস্থান নেন। আশেপাশের বাড়ির ছাদেও তাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে ঘিরে রাখা বাড়িটির সামনে লাইট লাগানো হয়। যদিও এর আগে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।
কিন্তু নির্ধারিত সময় রাত ৮টা পেরিয়ে গেলেও আত্মসমর্পণ করেননি ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ। এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের প্রধান মুফতি মাহমুদ খান জানান, তারা এখনও আত্মসমর্পণ করেননি। আমরা অপেক্ষায় আছি। আত্মসমর্পণ করলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে। টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যানদের ফুটেজ নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে।
রাত ৯টা ১৩ মিনিটে র্যা বের বোমা নিষ্ক্রিয়করণের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।
রাত ৯টা ৪৭ মিনিটের দিকে চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। এছাড়া দুই গুলির শব্দ এবং আকাশে কালো ধোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বারুদের গন্ধ।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মুফতি মাহমুদ খান ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ তার সহযোগীদের নিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, তারা ধ্বংসাত্মক কিছু করতে পারে কি না- সেই বিষয়ে র‌্যাবের কড়া নজরদারি রয়েছে। র‌্যাবও সতর্কাবস্থায় আছে।
প্রসঙ্গত, জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে সোমবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে ঘিরে ফেলা হয় রাজধানীর মিরপুরের মাজার রোডে বাঁধন সড়কের বর্ধনবাড়ি এলাকার ভাঙ্গাওয়াল গলির ছয়তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ি।
র‌্যাব জানায়, বাড়িটিতে দুই স্ত্রী, সন্তান ও সহযোগীসহ দুর্র্ধষ জঙ্গি আব্দুল্লাহ অবস্থান করছেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকও মজুদ করে রাখা হয়েছে।
পরবর্তীতে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় র‌্যাব। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহর বোন সোমবার গভীর রাতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তার মাধ্যমে আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়। বাড়ি ঘেরাও করার দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা পর র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের প্রধান মুফতি মাহমুদ খান ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ তার সহযোগীদের নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, সার্বিক নিরাপত্তায় ইতোমধ্যে আমরা বাড়িটির আশপাশে বসবাসকারী সবাইকে সরিয়ে নিয়েছি। ষষ্ঠ তলার ওই বাড়িটির পঞ্চম তলায় অবস্থান নেয়া ‘জঙ্গি’ আব্দুল্লাহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমাদের ১০ মিনিট আগে কথা হয়েছে। তারা আমাদের ইশারায় জানিয়েছেন, তারা আত্মসমর্পণ করবেন। র‌্যাবের দাবি, ওই ‘আস্তানায়’ দুর্র্ধষ জঙ্গি আব্দুল্লাহ, তার দুই সহযোগী, দুই স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ মোট সাতজন অবস্থান করছেন।
এর আগে বাড়িটির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এছাড়া টেলিফোন, ডিস ও ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। মানসিকভাবে চাপে ফেলতে এবং তারা (জঙ্গিরা) যাতে বাধ্য হয় আত্মসমর্পণ করতে- এ কারণে এসব করা হয়েছে বলেও র্যা বের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এরও আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেন, আব্দুল্লাহ দুর্র্ধষ জঙ্গি। তার সঙ্গে আমাদের রাত ৪টা থেকে যোগাযোগ হচ্ছে। তাকে আমরা বিভিন্নভাবে আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান জানাই। তিনি আহ্বানে সাড়া দিয়ে কিছুটা সময় চেয়েছেন।
বেনজীর বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছি। এরপরও তিনি যদি আত্মসমর্পণ না করেন এবং র‌্যাবের ওপর হামলার চেষ্টা করেন তাহলে আমরা আইনি পদ্ধতিতে অভিযানে যাব।
বাড়িটিতে মোট ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। তবে এরই মধ্যে নারী ও শিশুসহ সব বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
ভেতরে কী পরিমাণ বিস্ফোরক রয়েছে জানতে চাইলে র‌্যাব প্রধান বলেন, আমাদের তথ্যমতে ভেতরে ৫০টিরও বেশি দেশীয় তৈরি ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি বোমা) রয়েছে। এছাড়া অ্যাসিডসহ বিস্ফোরক তৈরির বিভিন্ন দ্রব্যাদি তার কাছে মজুদ আছে। ছোট একটা পিস্তল আছে বলেও আমরা ধারণা করছি।
জঙ্গি আব্দুল্লাহর পরিচয় জানতে চাইলে র‌্যাবের ডিজি বলেন, আমরা জানতে পেরেছি আব্দুল্লাহ ১৫ বছর ধরে এই ভবনের পঞ্চম তলায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি কবুতর পালন এবং আইপিএসের ব্যবসার আড়ালে দুর্ধর্ষ জঙ্গি হয়ে উঠেছেন।
১০-১৫ মিনিটের মধ্যে অপারেশন শেষ করার সক্ষমতা র‌্যাবের রয়েছে। কিন্তু অভিযানে দুই নিষ্পাপ শিশুর জীবন বিপন্ন হতে পারে, তাই আমরা সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছি বলে জানান বেনজীর আহমেদ।
এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টাঙ্গাইলের একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। ওই আস্তানা থেকে জেএমবির দুই জঙ্গিকে আটক করা হয়। পরে তাদের তথ্য অনুযায়ী রাত ১টায় অভিযান চালিয়ে মাজার রোডের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দক্ষিণে বর্ধনবাড়ি এলাকার ভাঙ্গাওয়াল গলির ২/৩/বি নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলায় জঙ্গি আস্তানাটি খুঁজে পায় র‌্যাব। আস্তানাটি রাতভর ঘিরে রাখা হয়। রাতে ভেতর থেকে পরপর কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যায়।
তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ