মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে রাজশাহীতে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহারের জন্য কামারুজ্জামানের বিবৃতি ও শেষ জনসভা

আপডেট: নভেম্বর ৩, ২০১৯, ১২:২৭ অপরাহ্ণ

আনারুল হক আনা


শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান একজন প্রসিদ্ধ বাঙালির নাম। বংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বিশেষ অবদান রাখায় ইতিহাস তাঁকে বিশেষ জায়গা দিয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক ভূমিকা, স্বাধীন দেশ নির্মাণে কার্যক্রম ও আত্মত্যাগ তাঁকে দেশের অন্যতম জাতীয় নেতাতে পরিণত করে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে শহিদ এএইচএম কামারুজ্জামান রাজশাহী জেলার তানোর, গোদাগাড়ি, পবা, বোয়ালিয়া আসন থেকে এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল আসেম্বলি) নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এটি ছিল জাতীয় ৩৫ ও রাজশাহী ৬ নং আসন (আনারুল হক আনা, রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ- ২০১৯)। সে সময় তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের দিবাগত রাতে বা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বারা বন্দি হবার পর স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ ক্ষেত্রে কামারুজ্জামানের ভূমিকা শীর্ষ পর্যায়ে চলে আসে। সে সময় কামারুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সাথী হওয়ায় মার্চের উত্তাল দিনগুলোই ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন। ৯ মার্চ তিনি রাজশাহীতে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহারের জন্য ঢাকাতেই বিবৃতি প্রদান করেন। ১০ মার্চ ১৯৭১ তারিখে ১ম পৃষ্ঠায় ৩ এর কলামে পূর্বদেশ (দৈনিক) পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করুন ঃ কামরুজ্জামান’ শিরোনামে বিবৃতিটি ছিল নিম্নরূপ:

 

 

সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করুন : কামরুজ্জামান
ঢাকা, ৯ই মার্চ (এপিপি/পিপিআাই)।-রাজশাহীতে সান্ধ্য আইন জারি করার কথা শুনে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ জেনারেল সেক্রেটারী জনাব এ,এইচ,এম কামরুজ্জামান গভীর উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, সৈন্যদের ছাউনিতে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে প্রচার করার পরেও রাজশাহীতে কেন ও কিভাবে সান্ধ্য আইন অব্যাহত রাখা হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না।

এখানে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ জেনারেল সেক্রেটারী জনাব এ,এইচ,এম কামরুজ্জামান বলেন, সামরিক বাহিনী বিক্ষুব্ধ জনতার বিরুদ্ধে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং সান্ধ্য আইন তাদের প্রতি উস্কানী স্বরূপ। আর এভাবে সান্ধ্য আইনের মাধ্যমে সমগ্র বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর বেপরোয়া গুলী বর্ষণ করা হচ্ছে। সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার ভার সম্পূর্ণ রূপে পুলিশের হাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য তিনি আবেদন জানিয়েছেন। প্রয়োজন হলে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী শান্তি রক্ষার জন্য পুলিশ বহিনীকে সাহায্য দান করবেন বলে তিনি জানান।

সরকারী কর্মকর্তারা ও সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের স্বাধিকার আন্দোলনের কর্ম তৎপরতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালে বাংলাদেশের বীর জনতার সংগ্রাম নব পর্যায়ে উপনীত হয়।
আমাদের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরগুলোতে যে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন তাতে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। সামরিক বাহিনী বাংলা দেশের নিরস্ত্র জনগণের উপর যেভাবে বেপরোয়া অস্ত্র ব্যবহার করছে তা’ উল্লেখ করে বিদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানী নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের উপর ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টায় বিশ্বের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে সঙ্কিত করেছে।
পশ্চিম পাকিস্তানের সুষ্ঠু চিন্তাশীল জনগণ যারা বাংলা দেশের সংগ্রামী জনতার আন্দোলনের প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন দান করেছেন জনাব কামরুজ্জামান তাদের প্রতিও অভিনন্দন জানান।

জনগণের উপর যারা বেপরোয়া হামলা চালাচ্ছে দেয়ালের লিখন পাঠ করার জন্য তিনি তাদের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, শেখ মুজিবর রহমানের কণ্ঠে বাংলার সাড়ে সাত কোটি জনগণের দাবী-দাওয়া প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে।
এ দাবী পূরণ বিলম্বের ফলে ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে আর ইতিহাস এ জন্য দায়ী ব্যাক্তিদের কোনদিন ক্ষমা করবে না।


মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত লড়বে – কামরুজ্জামান

১২ মার্চ ১৯৭১ তারিখে ৪র্থ পৃষ্ঠায় দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ‘মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত লড়বে Ñ কামরুজ্জামান ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ১০ মার্চ কামারুজ্জামান ঢাকা থেকে রাজশাহী আসেন। তিনি ১১ মার্চ সকালে সাহেববাজার ভুবনমোহন পার্কে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। সেদিনই ঢাকা রওনা দেন এবং সন্ধ্যায় ঢাকা পৌঁছান। দৈনিক পূর্বদেশে সভাটির ছবি প্রকাশ হয় ১৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে ৩য় পৃষ্ঠায়। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় এ সংবাদটি প্রকাশ হয় ১৩ মার্চ ১৯৭১ তারিখে ৩য় পৃষ্ঠায় ২ এর কলামে। শিরোনাম ছিল ‘শেখ মুজিবের ৪ দফা মানার প্রশ্নে আর বিলম্ব করিলে হয়ত আলোচনারও সুযোগ থাকিবে নাÑ কামরুজ্জামান’। এখানে ১৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত জনসভার ছবি ও ১৩ মার্চ ১৯৭১ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদটি উপস্থাপন হলো:
রাজশাহী ১১ই মার্চÑনিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এ,এইচ,এম কামরুজ্জামান অদ্য সকালে রাজশাহীর ভুবনমোহন পার্কে এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতাকালে বলেন, এখনও ভাই ভাই হিসাবে বাস করার সময় রহিয়াছে। তবে ঘটনা প্রবাহের দ্রুত পরিবর্তন ঘটিতেছে। ইহার পর হয়ত আলোচনারও সুযোগ থাকিবে না।
তিনি অবিলম্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সকলে ভাই ভাই হিসাবে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি গত সপ্তাহের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের তদন্ত দাবী করেন। তিনি বলেন, শেখ মুজিব ও তাঁহার দল ক্ষমতাসীন চক্রের সহিত কখনও আপোষ করিবে না। আওয়ামী লীগ লক্ষ্য অর্জনের জন্য অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালাইয়া যাইতে বদ্ধপরিকর। জনাব জামান বলেন, সশস্ত্র বাহিনী জনগণের অর্থে চলিতেছে। কাজেই জনগণের বিরুদ্ধে তাহাদের বুলেট ব্যবহারের কোন অধিকার নাই।
ঢাকা বেতারের প্রতি অভিনন্দন
রাজশাহী বেতার কেন্দ্র সম্পর্কে তিনি বলেন, এই কেন্দ্র হইতে বর্তমান আন্দোলন সংক্রান্ত খবর ও সঙ্গীত পরিবেশন করা উচিত। তিনি রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের অফিসার ও শিল্পীদের সাহসিকতাপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য তাহাদের অভিনন্দন জানান।
পূর্বাহ্নে স্থানীয় সাংবাদিক, শিল্পী ও লেখকগণ কালো পতাকাসহ একটি শোক মিছিল বাহির করেন এবং শহরের রাস্তাগুলি প্রদক্ষিণ করেন।
পরে তাহারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, রাজশাহী বেতার কেন্দ্র বর্তমান আন্দোলন সম্পর্কিত কর্মসূচী প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হইলে তাহারা উক্ত বেতার কেন্দ্রের সহিত সহযোগিতা এবং উহার কর্মসূচীতে অংশ গ্রহণ করিবেন না।
লেখক: গবেষক