মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্ব হারানো জাহানারার ভাগ্য জুটে নি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি || পায় নি কোন সরকারি সুবিধা

আপডেট: মার্চ ৩০, ২০১৭, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

শাহাবুদ্দিন, জয়পুরহাট



স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হলেও সর্বস্ব হারানো জয়পুরহাটের সেই জাহানারার (৬২) ভাগ্যে জুটে নি বীরাঙ্গনার খেতাব। বয়স্ক ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা বা দুঃস্থ ভাতা, বসবাস করার একটা ঘর কিংবা কোন সরকারি কোন সুবিধাই পান নি জাহানারা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করায় ছিল তার বড় অপরাধ। হানাদাররা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে এই বীরাঙ্গনার সতীত্বহরণসহ দিনের পর দিন তার উপর চালিয়েছে পাশবিক নির্যাতন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে স্বামী পরিত্যক্তা ও নিঃসন্তান এই বৃদ্ধার এখন জীবন চলছে অন্যের দয়া-দক্ষিণায়। জয়পুরহাট জেলা শহরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত খঞ্জনপুর এলাকা। এখান থেকে ঐতিহাসিক পাহাড়পুর যাওয়ার পথে মাত্র ৫০-৬০ গজ দক্ষিণ দিকেই পূর্ব খঞ্জনপুর মহল্লা। স্থানীয়রা এই এলাকাকে পুবা পাড়াও বলে থাকেন। এই এলাকায় জাহানারা বেগমকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীরাঙ্গনা হিসাবে জনে জনে চিনলেও আজও সরকারি স্বীকৃতি মিলে নি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকার একটি পরিত্যক্ত স্থানে ছনের বেড়া আর ৬-৭টি টিনের ছাউনি দিয়ে একটা ছোট অন্ধকার ঘরে থাকেন জাহানারা। এলাকার কয়েকজন যুবক চাঁদা তুলে এই ছোট্ট ঘরটি তৈরি করে দিয়েছেন বলে জাহানারা জানান। ষাটোর্দ্ধ বয়সী সাবেক পৌর কাউন্সিলর আবদুস সোবহান, প্রতিবেশী নজরুল ইসলাম, জাহানারার বোন সখিনাসহ এলাকাবাসীরা জানান, ১৯৭১ সালের ষোড়শী জাহানার খাতুনের ওই সময় স্বামী-সংসার সবই ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধ আর অপরুপ সৌন্দর্যই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গতিবিধির সব খবরাখবর জাহানারা গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের জানাতেন। বিষয়টি রাজাকারদের মাধ্যমে খবর পৌঁছে যায় পার্শ্ববর্তী খঞ্জনপুর মিশন স্কুলে অবস্থিত পাক বাহিনীর ক্যাম্পে।
জাহানারা জানান, ৭১’র মে মাসের কোন এক দিন দুপুরে হানাদাররা তাকে তুলে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে পালাক্রমে কেড়ে নেয় তার সম্ভ্রম। এছাড়া দীর্ঘদিন পাক সেনা ক্যাম্পে তার উপর চলে পাশবিক নির্যাতন।
জয়পুরহাট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন মন্টু জানান, তার উপর পাশবিক নির্যাতন চললেও মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ব্যাপারে কোন তথ্যই হানাদারদের কাছে জানান নি জাহানারা। জানালে অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে নেমে আসতো অবর্ননীয় নির্যাতন। যুদ্ধের শেষ দিকে জয়পুরহাটে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান বাঘা বাবলু, তার ভাই প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার ওলিউজ্জামান আলমসহ মুক্তিযোদ্ধারা পাকহানাদের উৎখাত করে এই বীরাঙ্গনাকে উদ্ধার করেন বলে জানান জাহানারা।
এলাকাবাসীরা জানান, যুদ্ধের পর জাহানারা স্বামী মজনু মিয়ার কাছে ফিরে গেলে লোকলজ্জার ভয়ে স্বামী তাকে ফেলে নওগাঁর ধামইরহাটে পালিয়ে পরে সেখানে বিয়ে করেন। এ কারণে স্বামী পরিত্যক্তা জাহানারা আর বিয়ে বা সংসার করেন নি। এরপর শিকার হন নানা সামজিক প্রতিকূলতার, এই অবস্থায় স্বামী, মা-বাবা আর সামাজিক বঞ্চনার শিকার জাহানারা দিশেহারা হয়ে এক সময় হারিয়ে ফেলেন মানসিক ভারসাম্য। কখনও হাসি, কখনও কান্না আবার কখনও বা গান, এভাবেই উদ্দেশ্যহীন চলাফেরা করতে করতে আজকের পরন্ত বেলায় সেই জাহানারা এখনো পান নি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি। ১৯৭১-এ  সাহসী যোদ্ধা ও মহিয়সী বীরাঙ্গনা জাহানারার সর্বস্ব কেড়ে নিলেও স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও তার খোঁজ রাখে নি অনেকেই। মাথা গোজার একটু ঠাঁই তো দূরের কথা এখন দুই বেলা খাবারও জোটে না বৃদ্ধা জাহানারার। শুধু তাই নয়, বয়স্ক ভাতার কার্ড বা কোন সরকারি সুবিধাই পান নি তিনি। জাহানারাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ওেয়া না হলেও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ হাতে গোনা মাত্র দুইএক জন তাকে সহযোগিতা করেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জাহানারা বলেন, ‘জয়পুরহাটের মেয়র মোস্তাক ভাই (মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক), কানাাই চিয়ারমিনের বউ (কালাই উপজেলা চেয়ারম্যানের স্ত্রী, লিখন আম্মা (মেফতাহুল জান্নাত লিখন, যিনি ছিন্নমূল শিশু-নারীদের উন্নয়নে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন) আমাকে ভালোবাসে, শাড়ি দেয়, ট্যাকা দেয়, আর আমার পাড়ার ছেলেরা খুব ভালোবাসে।’
কেবল দুইএক জনের সাহায্য-সহনাভূতিই যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ করে এলাকাবাসীরা তার বীরাঙ্গনার স্বীকৃতিসহ সরকারি সহযোগিতার দাবি জানান। মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনা জাহানারার অবদানসহ এলাকাবাসীদের অভিযোগ অকপটে স্বীকার করেন জয়পুরহাট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আমজাদ হোসেনসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। তারা জানান, জয়পুরহাট মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে জাহানারার বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি ও মর্যাদাসহ তার সহায়তার ব্যাপারে বার বার সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে দাবি জানানো হলেও এ ব্যাপারে এখনো তেমন কোন অগ্রগতি হয় নি। ৭১’ এ পাক হানাদারদের হাতে সম্ভ্রম হারানোসহ পৈশাচিক নির্যাতন, আর স্বাধীনতা পরবর্তীতে একই কারণে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে জীবনের মহামূল্যবান ৪৬টি বছর হারিয়ে গেছে জাহানারার জীবন থেকে। স্বাধীনতার স্বাদ লাভ না করলেও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি এখনো এই পাগল জাহানারার মনে আছে অবিচল আস্থা, এখনো জাতীয় সঙ্গীতের মূর্ছনায় আপ্লুত হয়ে পড়েন এই মহান বীরাঙ্গনা। দেশ যখন এগিয়ে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আলবদর পাচ্ছে তাদের কর্মের শাস্তি, কিন্ত এমন একটি সময়ে এসে জয়পুরহাটের জাহানারার চোখের জলে কেন ভাসবে? দেশের বীর সেনা মুক্তিযোদ্ধাসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য অনেকের কম বেশি ভাগ্যের চাকা ঘুরলেও জয়পুরহাটের বীরাঙ্গনা জাহানারা রয়েছেন আজো উপেক্ষিত। জীবনের পড়ন্ত বেলায় হলেও তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেখে যেতে চান স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ জয়পুরহাটের আপামর জনতা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ