মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাই এবং নানা প্রশ্ন

আপডেট: জানুয়ারি ৪, ২০১৭, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


জাতির সুর্য সন্তান হলো মুক্তিযোদ্ধারা। এই বীর সন্তানের লড়াকু ফসল বাংলাদেশ। বিশ্বের ওই সময়ের সেরা সেনা বাহিনী খ্যাত পাকিস্তান আর্মি বাংলা মায়ের এই সূর্য সন্তানদের কাছে নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। বর্তমান সরকারের প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দিয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান যা বিগত কোন সরকারের আমলে দেয়া হয়নি। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের শুধু সম্মানই দেন নি, নানা ধরনের আর্থিক সুযোগ সুবিধা রাষ্টীয় কোষাগার থেকে প্রদান করছেন । গত ৪৫ বছর ধরে নানা প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত তা নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বলেছেন বিএনপি আমলে ৪৪ হাজার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সময়ে ১১ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ না করেও নাকি অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সরকারের এই সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। এ কারণে বর্তমান প্রজন্মের  কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেয়ার বিষয়টিতে সৃষ্টি হয়েছে নানা দ্বন্দ্বের। অমুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সর্ম্পকে অনেক মানুষকে বিরূপ মন্তব্য করতে শুনা যায়। ২০১৬ সালের বিজয়ের মাসে চুয়াডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা গেজেটভুক্ত অমুক্তিযোদ্ধাদের বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, দেশে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার। মহান মুক্তিযুদ্ধে সঠিক অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নির্ণয় করতে এ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ণয় করা হয়েছে দশ বার, তারপরও সঠিক তালিকা প্রস্তুত হয়নি। ১৯৭২ সালে বলা হয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন এক ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যে কোন সংগঠিত দলের (ফোর্সের) সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে। এখানে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সব ব্যক্তি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন। এর মধ্যে যারা সীমানা পেরিয়ে ভারতের বিভিন্ন ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যে সব বাংলাদেশি পেশাজীবী বিদেশে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশেষ অবদান এবং বিশ্ব জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ( মুজিবনগর সরকার) কর্মকর্তা, কর্মচারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন, সশ্রস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, ইপিআর, আনসার বাহিনীর যে সকল সদস্য মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সঙ্গে সম্পৃক্ত এমএনএ এবং এমপিরা (গণপরিষদের সদস্য ), পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের দ্বারা নির্যাতিত নারীরা (বীরঙ্গনা), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কলাকুশলীরা, দেশে এবং দেশের বাইরে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সাংবাদিকরা, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলায়াড়রা, এছাড়া মুক্তিযুদ্ধচকালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা প্রদানকারী চিকিৎসক, নার্স ও সহকারীরাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবেন।
এই সংজ্ঞার নিরীখে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যক্তির অবদান মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন করা হবে । তবে এখানে বয়সের কথা বলা হয়েছে এদের বয়স ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ নূন্যতম ১৩ বছর হতে হবে। বর্তমান সরকার জানুয়ারি মাসের ৭ তারিখ থেকে আবার যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুত করতে যাচ্ছেন। গত ৪৫ বছরের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে বেশ কয়েকবার। প্রতিটি তালিকাকেই নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের বিতর্ক। গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, বিভিন্ন সরকারের আমলে প্রস্তুত করা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাগত পার্থক্য রয়েছে। ১৯৮৪ সালের প্রস্তুত করা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন। এই তালিকা প্রস্তুত করতে সাহায্য নেয়া হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে গঠিত মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্টের, চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের তালিকা এবং ভারত থেকে প্রাপ্ত তালিকার সমন্বয়ে। বিএনপির সরকারের আমলে (জামাত সমন্বয়ে গঠিত চারদলীয় জোট সরকার) মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে- যার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৪৮১ জন। এই তালিকা থেকে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। দৈনিক প্রথম আলোর প্রকাশিত একটি সংবাদে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১লাখ দুই হাজার ৪৫৮ জন, ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৮৩৩ জন, ১৯৯৪ সালের এর সংখ্যা হয় ৮৬ হাজার, ২০০১ দুইটি সংখ্যা পাওয়া যায় তা হলো- ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৯০ জন, আরেকটি ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫২ জনের।  ২০০৬ সালে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের, বর্তমানে যে সংখ্যাটি উল্লেখ করেছে তা হলো ২ লাখ ১৫ হাজার। মুক্তিযোদ্ধার এই সংখ্যাগত তারতম্য নিয়ে নানা অভিযোগ এবং রাজনৈতিক দোষে দুষ্ট হিসাবে আখ্যায়িত করা হলেও বিষয়টি নিয়ে আইন আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার মত ঘটনা তেমন একটা হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদাসহ সম্মানি ও নানা সুযোগ সুবিধা প্রদান করছে। এই সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানি ভাতা ১০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের পোষ্যদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করেছেন। এই পোষ্য বলতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং নাতি নাতনিদের বলা হচ্ছে। তাছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী হিসাবে ভর্তির ক্ষেত্রে রয়েছে কোটা। অনেকের ধারণা এ ধরনের সুযোগ পাওয়ার লক্ষে কেউ কেউ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে বয়সের যে সীমা বেধে দেয়া হয়েছে তাতেও সমস্যার সৃষ্টি হবে। রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার শুভাডাঙ্গা ইউনিয়নের মচমইল গ্রামের আব্দুল মালেক প্রমাণিক তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। অনেক আগেই তার নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গেজেটভুক্ত হয়েছে কিন্তু বর্তমানে তার ভাতা বন্ধ রয়েছে বয়সের সীমা নির্ধারিত হওয়ার পর থেকে। সে জানায়, তার প্রকৃত জন্ম ১৯৫৬ সালের ৭ অক্টোবর, কিন্তু  নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করার সময় শিক্ষকরা তার জন্ম তারিখ লিখেন ১৯৬০ সালের ৭ অক্টোবর অথচ  তার বাবা ২৯-২-১৯৬০ সালে তার নামে কিছু জমি হেবা দলিলের মাধ্যমে তাকে দান করেন। বাস্তবতা হলো ওই সময়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বেলায় এরকম ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকার জন্ম নিবন্ধনভুক্ত করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক না করার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় শিক্ষার্থীরই দুইটি করেই জন্মদিন। এই জটিলতা নিরসনে আব্দুল মালেক প্রমাণিক হাইকোর্টে একটি রিটও করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আব্দুল মালেক ছিলেন রাকসুর সাবেক ভিপি এবং আওয়ামী লীগ নেতা সরদার আমজাদ হোসেনের একজন সহযোগী। মুক্তিযোদ্ধের সময়ে  সরদার আমজাদ হোসেন তাদের বাড়িতে যখন থাকতেন তিনি রাত জেগে তাকে পাহারা দিতেন। তখন তার বয়স প্রায় ১৫ বছর। মচমইল জমিদার বাড়িতে স্থাপন করা মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তিনি প্রশিক্ষণ নেন। বাগমারার ভবানীগঞ্জের যুদ্ধে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। তাছাড়া যুদ্ধকালীন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহ করতেন। মচমইল তমির প-িতের বাড়িতে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করা হতো আর এই খাবার আব্দুল মালেক প্রমাণিক মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে নিয়ে যেতেন।
আওয়ামী লীগের গত সরকারের আমলে ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ননের ৭১এর মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ গেরিলাবাহিনীকে রাষ্ট্রীয় গেজেটভুক্ত করে। সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন তারিখ ৭ শ্রাবণ/১৪২০ বাংলা ২২ জুলাই/২০১৩ ইংরেজি নং ৪৮.০০.০০০০.০০৪.৩৭.১৪৯ ২০১৩-৪৩৯ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০০২ (২০০২ সালের ৮ নং আইন) এর ৭(ঝ) ধারা অনুযায়ী ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী এবং এই বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের ২৩৬৭ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সরকার রূলস অব বিজনেস ১৯৯৬ এর সিডিউল-১ (এলোকেশান অফ বিজনেস) এর তালিকা ৪১ এর ৬ নং ক্রমিকের ক্ষমতা বলে তালিকাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করে। ২৪-০৯-২০১৪ তারিখে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় মন্ত্রী একটি ডিও লেটার প্রদান করেন। মাননীয় মন্ত্রী ডিও লেটারে উল্লেখ করেন, “আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, দলীয় নেতা /কর্মী/ সদস্য হিসাবে কাউকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে বিবেচনা করে গেজেটভুক্ত করার কোন সুযোগ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন -২০০২ এ নেই । তাই ২৪/০১/১৩ তারিখে অনুষ্ঠিত সভার জামুকার সিদ্ধান্তটি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০০২ এর পরিপন্থি। ৬/০৮/২০১৪ (২৩ তম সভা) তারিখে অনুষ্ঠিত জামুকার সভায় বিষটি নিয়ে আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে আপনাদের অবদানের প্রশংসা করা হয়েছে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তালিকাভুক্ত হওয়া বিধি সম্মতভাবে হয়নি এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ফলে গেজেটটি বাতিল বলে গণ্য হয়। এই বাতিলের আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে, এই বাহিনীর সদস্য হাইেেকার্টে একটি রিট দাখিল করেন।  এই বিষয়টি এখন বিচারাধীন রয়েছে। বিচার নিষ্পত্তি না হওয়ায় এই তালিকার ২৩৬৭ জন আসন্ন যাচাই বাছাইয়ে কি হবে তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। ২২ জুলাই/২০১৩ ইংরেজি নং ৪৮.০০.০০০০.০০৪.৩৭.১৪৯ ২০১৩-৪৩৯ নং গেজেটে প্রকাশিত তালিকাটি কি নির্ভুলভাবে প্রণীত হয়েছিল তা নিয়েও সংশয় দেখা দেয়। মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পর প্রকাশিত এই তালিকাটি কি সেই সময়ের ন্যাপ, কমউিনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনীর তালিকা অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে নাকি ৪২ বছর পর যারা মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা বাহিনীর সদস্য  হিসাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের নাম সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি করা হয়েছে তাও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন। কারণ নৈতিক আদর্শিক এই বাহিনীটির মর্যাদা অক্ষুণœ রাখার দরকার। ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গেরিলা বাহিনী যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরীসিম। তাই এই বাহিনীতে যেন ভিন্ন পন্থায় কোন অনুপ্রবেশকারী ঢুকতে না পারে।  এই ৪২ বছরের মধ্যে ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বে ঘটেছে নানা ধরনের পরির্বতন। সোভিয়েট পতনের পর মতদ্বৈততার কারণে পার্টি দুইটিতে দেখা দিয়েছিল ভাঙ্গন। এই ভাঙ্গনে একাধিক পার্টির জন্ম হয়েছে আবার কেউ কেউ অন্য দলে যোগ দিয়েছেন। নানা সময়ে ঘটেছে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। তাই প্রকাশিত গেজেটটির যথার্থতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। তাছাড়া সিপিবির কোন কোন জেলার নেতৃত্বের নৈতিকতা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। ২২ জুলাই/২০১৩ ইংরেজি নং ৪৮.০০.০০০০.০০৪.৩৭.১৪৯ ২০১৩-৪৩৯ নং গেজেটে রাজশাহীর সেই সময়ের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সদ্য প্রয়াত মোরশেদ কোরায়শী স্বপন এবং শফিকুর রহমান বাদশার নাম নেই। প্রয়াত রাকসুর সাবেক ভিপি সেই সময়কার ছাত্র ইউনিয়ন নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ননের ৭১এর মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ভারতে স্থাপিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেছিলেন, উভয়েই প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের সময় অনেক পরিবার ভারত থেকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) আবার বাংলাদেশ থেকে ভারত চলে যায়। তবে দুই দেশেই তাদের আত্মীয় স্বজন থেকে গিয়েছিল। যখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে তাদের রেখে আসা বা এদেশ থেকে যাওয়া আত্মীয় স্বজনের কাছে আশ্রয় নেয়। এ ধরনের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অনেকেই ভারতের স্থাপিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলিতে প্রশিক্ষণ নেয়া মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের সাথে মাঝে মধ্যে সাক্ষাৎ করতো। দেশ স্বাধীনের পর এরাও নাকি দেশে ফিরে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে বলে। তাদের নামও নাকি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গেজেটভুক্ত হয়েছে বলে শোনা যায়।  সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা নতুন করে যাচাই বাছাইয়ের সময় বিষয়গুলি সূক্ষ্মভাবে দেখবে যাচাই বাছাই কমিটি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যক্তির নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গড়ে উঠেছিল। তার মধ্যে কাদেরী বাহিনী, হেমায়েত  বাহিনী, আফসার ব্যাটালিয়ান অন্যতম। মেজর আফসার বাহিনী ময়মনসিংহ জেলার দক্ষিণাঞ্চল ও সেই সময়কার ঢাকা জেলার উত্তরাংশ হানাদারমুক্ত করেন। মেজর আফসার ৪৫০০ মুক্তিযোদ্ধার বিরাট বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তার পুত্র নাজিমুদ্দিন সম্মুখ সমরে শহিদ হন। কিন্তু দুর্ভাগ্য মেজর আফসারের এই বীরত্বপুর্ণ কৃতিত্বের জন্য কোন খেতাব পাননি। ময়মনসিংহের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আশা করছে এবারে যাচাই বাছাইয়ের পর মেজর আফসারের কৃতিত্বের জন্য সরকার তাকে বীরত্বপূর্ণ খেতাবে ভুষিত করবেন।
লেখক:-কলামিস্ট