মুক্তিযোদ্ধার পরে এবার শিক্ষক লাঞ্ছিত রামেকে

আপডেট: September 25, 2020, 9:54 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক:


লাঞ্ছিত ও মারধর যে সেবাদান কেন্দ্রে ঘটছেই। কখনো মরদেহ আটকে, রোগির স্বজন মারধরের পরে মামলা দেয়ার ঘটনা প্রতিনিতই ঘটছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। হাসপাতালটির চিকিৎসকদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষকরাও। হাসপাতালের এমন অবস্থায় হতবাক সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, রামেক হাসপাতালে এমন ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটে চলেছে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বঙ্গবন্ধু কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মামুন-অর-রশিদ লাঞ্ছিত হয়েছেন। বেলা ১২ টার দিকে হাসপাতালের চার নম্বর ওয়ার্ডে এই ঘটনা ঘটে।
প্রভাষক মামুন জানান, তিনি বৃহস্পতিবার রাতে ১২: ১৫ মিনিটে ইউরিন ইনফেকশন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
সকালে একজন নার্স এসে বলে আপনি এই সিরিয়ালের নয়। আপনি ওপারের। ওপারে যান আপনাকে চিকিৎসক দেখবেন। এসময় নার্সকে বলা হয়, এখানে থাকলে কী সমস্যা? নার্স বলেন, একপাশের রোগি অন্য পাশের চিকিৎসক দেখেন না। নার্সের কথা মত গিয়ে কম্বল বিছায়। পরে ট্রলি যাওয়া নিয়ে সমস্যা হবে এমন কথা বলেন। ট্রলি আসলে তিনি কম্বল তুলে নিবেন বলে জানান। এর পরে তারা চলে যান।
মামুন বলেন, কিছুক্ষণ পরে রাউন্ডে আসেন চিকিৎসক। এসময় নার্সের মধ্যে কেউ একজন এসে চিকিৎসককে বলেন, আমি নাকি বলেছি, হাসপাতালে সময় মতো চিকিৎসক আসেন না। সকালে চিল্লাচিল্লি কথা বলেছি চিকিৎসা নিয়ে। তাদের কথা শুনে চিকিৎসক আমার উপরে রেগে যায়। এসময় মামুন নিজের পরিচয় দেন। তার কিছুক্ষণ পরে চিকিৎসক চলে গেলে তাদরে মধ্যে একজন বলেন, এই পুলিশকে ডাকো।
তখন তিনজন আনসার আসে ওয়ার্ডে। এসময় রোগির স্বজনদের বাইরে বের করে দেয় আনসাররা। তার পরে কয়েকজন ইন্টার্নি চিকিৎক আসেন। তারা আমাকে অকথ্যভাষায় আমাকে ও আমার মাকে গালাগাল করে। এরপরে তারা একটি মুচলেখা নিজেরাই লেখে নিয়ে এসে স্বাক্ষর করতে বলে। আমি স্বাক্ষর করতে না চাইলে আনসাররা গায়ে হাত তোলে। পরে বাধ্য হয়েই মুচলেখায় স্বাক্ষর ও টিপ সই নেয় তারা।
তিনি আরও বলেন, আমি বর্তমানে ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছি। জানি না কী হবে। তবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছেন তিনি।
এবিষয়ে রামেক হাসপাতালের উপরিচালক সাইফুল ফেরদৌস জানায়, ‘বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি। অনেকেই ফোন করছেন।’
এর মধ্যে গত দুই সেপ্টেম্বর স্ত্রীর মরদেহ ওয়ার্ডে রেখে মারধর করে মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলীকে। এরপর মুক্তিযোদ্ধার ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে মামলা দেয়া হয়।
এই ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধারা নগরীতে বিক্ষোভ মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। ওই সময় মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। পরে ৭ সেপ্টেম্বর জলা প্রশাসন ও রামেক কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধদের সাথে মিমাংশায় বসেন। এতে মুক্তিযোদ্ধারা অভিযুক্ত ইন্টার্নিদের ক্ষমা করে দেয়। এসময় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মুক্তিযোদ্ধারা বলেছিলেন, হাসপাতালে এধরনের ঘটনা যেনো না ঘটে।
২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর রামেক হাসপাতালে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় কর্মবিরতি করে ইন্টার্নি চিকিৎসকরা। কর্মবিরতি ও জরুরি বিভাগের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে প্রতিবাদ করে। এর আগে
২২ নম্বর ওয়ার্ডে ইতি নামের এক নারী ভর্তি হয়। স্বজনরা ইতিকে দেখতে যান। ওই সময় ইন্টার্নি চিকিৎসক রোগীর কাছে স্বজনদের ভিড় দেখে তাদের গালাগালি শুরু করেন। ইন্টার্নি ও রোগীর স্বজনরা দু’পক্ষে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন তারা। পরে পুলিশ জিমি নামের একজনকে আটক করে।
একই বছরের ১৩ নভেম্বর রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক রোগী মহসিন আলীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
মহসিন আলীর দুই ছেলে নজরুল ইসলাম (৪৫) ও আনারুল ইসলাম (২৫) তার বাবার মৃত্যুর জন্য ইন্টার্ন চিকিৎসক শফিকুল ইসলামকে দায়ী করে তার সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এসময় অন্যান্য ইন্টার্ন চিকিৎসক এগিয়ে এলে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মহসিনের স্ত্রী রাহেলা বিবি (৫৫) ও দুই ছেলেকে আটক করে রাখে। পরে পুলিশ এসে তাদের থানায় নিয়ে যায়।
সেই সময়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. তৌফিক উদ্দিন মোহাম্মদ বেলাল বলেছিলেন, আমরা ইন্টার্নদের সঙ্গে আলোচনা করছি। আর রাজপাড়া থানার (ওসি) আমান উল্লাহ জানিয়েছিলেন, এব্যাপারে থানায় মামলা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।