মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান নি ভবেন সরকার

আপডেট: ডিসেম্বর ৭, ২০১৬, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

জিল্লুর রহমান, মান্দা :



নওগাঁর নিয়ামতপুর থানায় গেরিলা হামলা চালিয়ে রাজাকার হত্যা করেছেন। ছিনিয়ে নিয়েছেন থানার অস্ত্র ও গুলি। এরকম একাধিক গেরিলাযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন পাকহানাদার বাহিনীর হামলা থেকে। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪৫ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান নি গেরিলাযোদ্ধা ভবেন চন্দ্র সরকার। তার এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার) নম্বর ১৯৮৭। তিনি মান্দা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের মৃত রুহিনী কান্ত সরকারের ছেলে।
মুক্তিযোদ্ধা ভবেন সরকার জানান, তখন তার বয়স ছিল ১৫ বছর। বালুবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকহানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের হামলার ভয়ে সপরিবারে ভারত চলে যান। আশ্রয় নেন তপন থানার অন্তর্গত লস্করবাংলা এলাকায়। সেখান থেকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে পারিলা ক্যাম্পে (ইউথক্যাম্প) তৎকালিন এমপি (বর্তমানে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী) মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামানিকের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। এরপর পতিরাম ক্যাম্প হয়ে শিলিগুড়ির পানিঘাটা ক্যাম্পে ৪০ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে আবার ফিরে আসেন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কামারপাড়া ক্যাস্পে। জুলাই মাসে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার খঞ্জনপুর পাকাহানাদার ক্যাম্প আক্রমনের মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন তিনি। এ যুদ্ধে তিনিসহ ১২জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকদিন অবস্থানের পর তাদের আবারো ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তরঙ্গপুর হেডকোয়ার্টারে। প্রশিক্ষণ দেয়া হয় গেরিলাযুদ্ধের।
প্রশিক্ষণ শেষে সাপাহারের জবইবিল হয়ে নৌকাযোগে দেশে প্রবেশ করেন। এরপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মান্দা উপজেলার চককেশব গ্রামে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে কয়েকদফা স্থান পরিবর্তন করে হাটোর, কয়াস ও আমইলে অবস্থান নিয়ে রাজাকারদের দখলে থাকা নিয়ামতপুর থানা আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। ডেপুটি কমান্ডার আজিজার রহমানের নেতৃত্বে তাদের দলটি নিয়ামতপুর থানা আক্রমণ করে রাজাকার হত্যাসহ অস্ত্র-গুলি হেফাজতে নিয়ে আবার ফিরে আসেন মনোহরপুর নিজ গ্রামে।
তিনি আরো জানান, মনোহরপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করছেন রাজাকারদের দেয়া এমন সংবাদে পাকহানাদার বাহিনী ওই গ্রাম আক্রমণ করে। কিন্তু তার আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি ওই গ্রাম থেকে নৌকা নিয়ে ছাতড়া বিলে আশ্রয় নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে গ্রামের ১২ জন নিরিহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। দেলুয়াবাড়ি রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণেও সরাসরি অংশ নেন এই গেরিলাযোদ্ধা।
দেলুয়াবাড়ি এলাকা রাজাকারমুক্ত হওয়ার দুইদিন পর আশ্রয় নেন উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের হেমন্ত মাস্টারের বাড়িতে। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন আব্দুল করিম ও প্রভাষ চন্দ্র নামে দুই সহযোগী। এই বাড়িতেই একবেলা সম্মুখযুদ্ধ চলে রাজাকারদের সঙ্গে। বাড়িটির চারদিকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাদের পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। যুদ্ধ চলাকালে রাজাকারদের সঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য নওগাঁ থেকে পাকহানাদার বাহিনীর একটি ইউনিট সতীহাট পৌঁছে। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাজাকাররা গোলাগুলি বন্ধ করে পিছু হটে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিলের আঁখখেত দিয়ে পালিয়ে রক্ষা পান তারা।
মুক্তিযোদ্ধা ভবেন সরকার আরো জানান, বর্তমানে স্ত্রী বিজলী রানী সরকার ও ছেলে যুগল চন্দ্র সরকারকে নিয়ে তা অভাব-অনটনের সংসার। দুই মেয়ে কণিকা রানী ও সুমিতা নারীকে পাত্রস্থ করা হয়েছে। ছেলে যুগলের কাঁচা তরকারির ব্যবসার আয় দিয়েই কোনো রকমে সংসার পরিচালনা করছেন। আয়ের আর কোনো পথ না থাকার এই দুর্মূল্যের বাজার দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। তিনি আরো বলেন, দেশ স্বাধীনের পরও পরিবারের মাঝে ভয় ও আতঙ্ক থেকেই যায়। এ কারণে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন নি। বিশেষ করে তার মা এ কাজে ঘোর বিরোধিতা করেন। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করেছেন।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আফসার আলী মন্ডল জানান, ভবেন চন্দ্র সরকার একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘ দিনেও তার নাম তালিকাভূক্ত হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভবেন সরকারের নাম তালিকাভূক্তির দাবি করেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ