মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই প্রাসঙ্গিক ভাবনা…

আপডেট: মার্চ ৩, ২০১৭, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

মো. মাহমুদুর রহমান (বাদল)


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৭১ সনে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ পর্ব শেষ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত সোনার বাংলা গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭২ সনে জাতিকে সংবিধান উপহার দেন। ১৯৭৩ সনে জাতীয় নির্বাচন দেন। দেশকে গড়ে তোলার সকল ক্ষেত্রে হাত দিয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শেষে মু্িক্তযোদ্ধারা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে সংগঠনের পতাকাতলে থাকবে ভেবে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গড়ে দিয়েছেন নিজ হাতে। যুদ্ধশেষ হলেও প্রতিপক্ষ শেষ হয় নাই। প্রতিপক্ষের প্রথম সারির নেতারা পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। অপেক্ষাকৃত ছোট নেতারা দেশেই ঘাপটি মেরে চুপ করে রইলো/ আন্তর্জাতিক চক্রান্তের নমুনা দৃশ্যমান হতে বেশি দিন লাগলো না। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট প্রতিপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করলো। তৎপরবর্তীতে ৩ নভেম্বর জাতীয় ৪ নেতাকে জেলখানায় হত্যা করলো। প্রতিপক্ষের রাঘব বোয়ালরা দেশে ফিরে আসলো। নিজেদের রাষ্ট্র ক্ষমতার পাশাপাশি নিয়ে গেল। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করে রাখার দরকার। দেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পরপরই বন্ধুরাষ্ট্র ভারত সরকার তাদের দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সকল মুক্তিযোদ্ধার তালিকা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নিকট ১৯৭৩ সনে হস্তান্তর করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেন। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহান ২টি বাক্য উচ্চারণ করে ক্ষমতা দখল করেন। প্রথমটি হলো “মানি, ইজ নো প্রব্লেম:, দ্বিতীয়টি হলো “আই উইল মেক পলিট্রিক্স ডিফিক্যাল্ট ফর পলিটিশিয়ান”। প্রথম বাক্যটিতে/ ৭ম নৌ বহরওয়ালা দেশের গন্ধ পাওয়া যায়। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের একজন সামরিক অফিসার, টাকার কোন সমস্যা নাই এন বাক্য উচ্চারণ করে কেমনে তার বিশদ ব্যাখ্যা লিখার প্রয়োজন নাই। কারণ লিখার বিষয়বস্তু ভিন্ন।
প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহচর হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় বাংলাদেশের আপামর জনগণ খন্দকার মোস্তাককে মীরজাফর বলে জানে। বলুনতো মীর জাফর উপাধি কেমনে পাওয়া যায়। উত্তর হবে “কর্মে”। একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধ করলো। খেতাবে ভূষিত হলেন। তিনি দেশের অরাজকতা দূর করার জন্য সামরিক শাসন জারি করেই দ্বিতীয় বাক্যটি ‘আই উইল মেক ডিফিকাল্ট পলিটিক্স ফর পলিটিশিয়ান’ বলে দেশে যে প্রক্রিয়া শুরু করলেন স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়ন তো দূরের কথা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সারা দেশে ক্রমাগত ২২টি ক্যু এর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা নিধন শুরু করলো। পাঠকগণ বলেন তো এমন কর্মকা-ের জন্য খন্দকার মোস্তাকের তকমাটি জিয়াউর রহমানের জন্য প্রযোজ্য হয় না? অবশ্যই হয়। ১৯৭৩ সনে ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা আসার পরেও তালিকা প্রস্তুত করা হয়নি বরং মুক্তিযোদ্ধা হনন করে ক্ষমতা আঁকড়ে থেকেছেন। মেজর জিয়া ১৯৮১ সনে নিহত হলেন। জিয়াউর রহমান ইতোমধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের দিয়ে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে গেলেন। দ্বিতীয় দফা হোসেন মোহম্মদ এরশাদ পুনরায় সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নিজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তার কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশারও কিছু নাই। যার কাছে প্রত্যাশা ছিল না তারই শাসন আমলেই দীর্ঘ ১০ বছর পর ভারত হতে পাওয়া তালিকাতে হাত দেয়া হয়। দীর্ঘ দিন অযতেœ অবহেলায় পড়ে থেকে উইপোকা আক্রমণে তালিকার অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। কষ্ট করে পাঠোদ্ধার পূর্বক তালিকা প্রস্তুত করা হয়। নামকরণ করা হয় ইবিআরসি তালিকা। এই তালিকায় সারা দেশে ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৬৯ হাজার ৫০৯ জন। এরশাদের শাসন আমলে ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রস্তুতের জন্য প্রথম ফরম বিলি করা হয়। বিলিকৃত ফরম যাচাই বাছাই না করেই দৈনিক পত্রিকায় ফরম পূরণকারীর নাম প্রচার পূর্বক তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়। এটিই জাতীয় তালিকা বলে খ্যাতি পায়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল হলে সামরিক ছত্রছায়ায় গঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তখন্ই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম শুরু হয়। ভোটার তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩ হাজার। এই তালিকায় অধিকাংশ ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার আবির্ভাব ঘটে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না থাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কাজটি হয়নি তো বটে ততক্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নেমে যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পিতার হাতে তৈরি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেন। কমান্ড কাউন্সিল আটঘাট বেধে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাসহ সারা দেশে অভ্যন্তরীণ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রত্যেকের বিপরীতে নম্বর উল্লেখ পূর্বক প্রস্তুত করে। এতে মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা দাড়ায় ১ লাখ ৮৬ হাজার। এখানেও মুক্তিযোদ্ধার সন্নিবেশ নিয়ে তর্ক সৃষ্টি হয়। পরে আবার সংশোধনীর মাধ্যমে নাম কর্তন করা হয়। এ তালিকাটি  সংশোধনীর পর মুক্তিবার্তা লাল বই নামে খ্যাতি/স্বীকৃতি লাভ করে। এ সংখ্যা ১ লক্ষ ৫৪ হাজার। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আর্থিক অনুদান প্রবর্তন করেন। শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধা নয় সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাতা প্রবর্তন করেছেন। খেতাবপ্রাপ্ত এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা সরকারের আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা সরকারের কাছে নাই। যদিও ভারতীয় ট্রেনিংপ্রাপ্ত সহ অভ্যন্তরীণভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা লাল বই মুক্তিবার্তায় একটা সংখ্যা স্বীকৃত অবস্থায় আছে তথাপিও সরকার তালিকা চূড়ান্তকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেখানে শেষবারের মত একটা যাচাই-বাছাইয়ে সুযোগ দেয়া উচিত। তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, এ কার্যক্রম যেন ভাতাযোদ্ধা বৃদ্ধির কার্যক্রমে পরিণত না হয়। তারই ধারাবাহিকতায় সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কার্যক্রম চলছে। মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কাজটি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল গঠনের প্রাক্কালে হওয়া উচিৎ ছিল কেবলমাত্র তখনই প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু হয়নি। কেন হয়নি আলোচনায় পাঠকগণ নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন। প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কখনই সম্ভব নয়। বিষয়টি স্পর্শকাতর হয়ে গেছে, মোটামোটি স্বচ্ছতা হলেও হোক। দেশের বয়স ৪৫ বছরর। একজন মুক্তিযোদ্ধার বয়স ৬৫-৭০ বছর। অত্যন্ত সহনীয়ভাবে যাচাই-বাছাই পর্বটি শেষ হোক এটাই কামনা করি।
আমি মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়ন বিষয়ে কলম ধরেছি। বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর ডাকে আমরা বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে। পরিতাপের বিষয় ঠিক কতজন মুক্তিযোদ্ধা যার নিষ্পত্তি আজও সুরাহা হয়নি। কেন হয়নি? যার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। পাঠক, মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনায় এটাই প্রতিয়মান হয় যে, একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার আন্তর্জাতিক চক্রান্তকে সফল করতে উচ্চাভিলাসী হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে অরাজতকা দূর করার পরিবর্তে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের উন্নয়নের পরিবর্তে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছেন। ক্রমাগত সামরিক জান্তার আবির্ভাব ঘটানোর রাস্তা পরিষ্কার করেছে এবং দেশকে উপহার দিয়েছেন সামরিক জান্তা প্রজন্ম রাজনৈতিক দল। এসব দলের নেতারা ভূই ফোঁড়, স্বাধীনতা চেতনাবিরোধী। এসব নেতাদের লাগাম টেনে ধরা ছাড়া দেশের উন্নয়নের জন্য সহায়ক নয়।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, বালিয়াপুকুর, বোয়ালিয়া রাজশাহী