মুখ ও মুখোশের জহরত আরা আর নেই

আপডেট: জুলাই ২৩, ২০২১, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


মুখ ও মুখোস চলচ্চিত্রে অভিনেতা মনসুর আলীর স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেন জহরত আরা। ছবি: বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস/অনুপম হায়াত/উইকিমিডিয়া কমনস

বাংলাদেশের প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশের অভিনেত্রী জহরত আরা আর নেই।
গত ১৯ জুলাই লন্ডনের একটি কেয়ার হোমে তার মৃত্যু হয় বলে তার পারিবারিক বন্ধু ফেরদৌস রহমান জানান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, আশি বছরের বেশি বয়সী জহরত আরা দীর্ঘদিন ধরে নানা স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছিলেন।
পরিবারের বরাত দিয়ে ফেরদৌস রহমান বলেন, কেয়ার হোমে যাওয়ার আগে জহরত আরা থাকতেন নরউইচে, সেখানেই তাকে দাফন করা হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানাবে তার পরিবার।
আবদুল জব্বার খান পরিচালিত ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালের ৩ অগাস্ট। এর আগে এই ভূখণ্ডে বাংলা ভাষায় আর কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র হয়নি।
পূর্ব পাকিস্তানের তখনকার গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে এ সিনেমার উদ্বোধন করেছিলেন।
এর ঠিক চার বছর আগে ১৯৫২ সালে মায়ের ভাষার দাবিতে বাঙালির সংগ্রাম তুঙ্গে পৌঁছায়। ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তে রাঙানো পথ ধরে ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায় বাংলা।
পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ক্ষোভ তখন ধীরে ধীরে বাড়ছিলো। তখনকার পাকিস্তানি চলচ্চিত্র শিল্পে বাঙালি টেকনিশিয়ান ও কর্মীরাও হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, কারণ দেশভাগের কারণে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল কলকাতা, সিনেমা নির্মাণে তারা এগিয়ে যাচ্ছিল।
সেই প্রেক্ষাপটেই যাত্রা শুরু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের। বাংলা ভাষায় সিনেমা বানানোর জন্যই ১৯৫৩ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ডাকাতির খবরকে উপজীব্য করে ‘ডাকাত’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন আবদুল জব্বার খান। সেই কাহিনীকেই চলচ্চিত্রের রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সিনেমার চিত্রনাট্য ছিল এরকম- গ্রামের এক জোতদারের দুই ছেলে। তাদের একজন ঘটনা-পরম্পায় ডাকাতদলের খপ্পরে পড়ে। তাদের সঙ্গেই বেড়ে ওঠে। আরেক ছেলে পড়ালেখা করে, পুলিশ হয়।
কিন্তু ডাকাতদলের সঙ্গে অসৎ পুলিশের যোগাযোগ ছিল। পরিচয় না জানলেও ডাকাত-পুলিশ যোগাযোগের সূত্রে ভাই-ভাই যোগাযোগ তৈরি হয়। এক পর্যায়ে ডাকাত ভাই তার সর্দারকে খুন করে। অসৎ পুলিশ ভাই গ্রেপ্তার হয়। কাহিনী শেষ হয় জোতদার বাবার দুই ছেলেকে ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে।
তখন চলচ্চিত্র নির্মাণের মত স্টুডিও বা সুযোগ-সুবিধা ঢাকায় ছিল না। মুখ ও মুখোশের প্রযোজনায় এগিয়ে আসে ইকবাল ফিল্মস।
কিন্তু পঞ্চাশের দশকে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের জন্যও নারী শিল্পী পাওয়া ছিল কঠিন। পরিচালক আব্দুল জব্বার শুরুতে ভেবেছিলেন, কোনো পুরুষকেই নারী সাজিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবেন। তখন মঞ্চ নাটকে নারী চরিত্রে পুরুষদের অভিনয়ের চল ছিল।
পরে মুখ ও মুখোশের অভিনেত্রী খুঁজতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন আবদুল জব্বার খান। চিত্রালী ম্যাগাজিনে সেই বিজ্ঞাপন দেখেই নবাব কাটরায় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইকবাল ফিল্মসের অফিসে যান ইডেন কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী জহরত আরা আর তার বান্ধবী পিয়ারী বেগম।
পুরান ঢাকার মেয়ে জহরতের ভাই মোসলেহউদ্দীন ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক, ভাবি নাহিদ নিয়াজীও সংগীত শিল্পী।
বাংলাদেশের প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশের পোস্টারবাংলাদেশের প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশের পোস্টারচলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াত জানান, বেতারে নাটকের অভিজ্ঞতা আগে থেকেই ছিল জহরতের। একজন অ্যাথলেট হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
জহরত আর পিয়ারী দুজনেই সিনেমার জন্য নির্বাচিত হলেন। কিন্তু পরিবারের আপত্তির মুখে তারা অভিনয় করতে পারবেন কিনা, সেই শঙ্কা ছিল।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ