‘মুজাহিদ ভাই, চলেন আফগান যাই’

আপডেট: আগস্ট ১, ২০২১, ১২:২৯ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


জঙ্গির প্রতীকী

‘মুজাহিদ ভাই, চলেন আফগান যাই’, এটি দেশীয় উগ্রবাদী ও জঙ্গি সংগঠনের সাম্প্রতিক আনলাইন প্রচারণার অংশ বিশেষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদীরা এভাবে আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানে খুশি হয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে, তালেবানদের প্রশংসা করছে। মূলত তালেবানের উত্থানে দেশের জঙ্গি সংগঠন ও উগ্রাবাদীদের মধ্যে একধরনের উৎসব উৎসব ভাব দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী। জঙ্গি সংগঠন ও জঙ্গিদের অনলাইন ও অফলাইনে সাংগঠনিক আলাপে এখন আফগান প্রসঙ্গই বেশি থাকে।
তালেবানের সঙ্গে সাম্প্রতিক চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে। তালেবানরাও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের এই নীতির পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলেও মনে করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ইতিমধ্যে তালেবানরা ঘোষণা দিয়েছে, আফগানিস্তানের জমি ব্যবহার করে কেউ অন্য কোন রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে পারবে না। তালেবানদের এই নীতি অব্যাহত থাকলে, দেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোর ধ্বংসাত্মক কাজ নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলেও মনে করেন তারা। তবে বাংলাদেশ এখনই তালেবানদের সঙ্গে কোনও কূটনৈতিক সম্পর্কে যাবে না। বাংলাদেশ বর্তমান বৈধ আফগান সরকারের সঙ্গেই কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এরই মধ্যে দেশের জঙ্গিদের কেউ কেউ আফগানিস্তান যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আফগানিস্তানে যাওয়ার দাওয়াত দিতে দেখা যাচ্ছে কাউকে কাউকে। আবার কেউ কেউ আফগানিস্তানে তালেবানের দখলের ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করে প্রশংসায় ভাসাচ্ছে। তবে যুদ্ধ করতে দেশের জঙ্গিদের কেউ গত দুই-তিন মাসে আফগানিস্তানে গিয়েছে এমন তথ্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে নেই। বরং এনজিওসহ বিভিন্ন কাজে বাংলাদেশ থেকে আফগানিস্তানে যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে।
দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বাংলাদেশের পুরনো জেএমবির যেসব সদস্য ভারতে লুকিয়ে আছে সেই গ্রুপটি আফগানিস্তানে যাওয়ার চেষ্টা করে। তারা মাঝেমাঝেই এই চেষ্টা করেছে, কেউকেউ সফলও হয়েছে। তাদের সঙ্গে দেশীয় নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের কোনও কোনও সদস্য সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। তবে তারা সফল হয়েছে- এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে জঙ্গিদের মধ্যে সবসময় যেমন অনলাইনে প্রচারণা, হুমকি ও আলোচনা হয়, তা আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে।
জঙ্গি দমনে অবদান রাখা পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের একজন উচ্চ পর্যায়ের বর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের কাছাকাছি অনেকে বলে, তবে তাদের সঙ্গে আমাদের ভাষার কোনও মিল নেই, সংস্কৃতির মিল নেই, খাদ্যাভ্যাসে মিল নেই। চিন্তা চেতনাতেও মিল নেই। তাই তালেবান উত্থানে হঠাৎ করে যে তীব্র পরিবর্তন হবে দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর, তা মনে করার কোনও কারণ নেই।’
অনলাইনে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে নেট দুনিয়ায়। তারা বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে যাচাই বাছাই করছে। অ্যাপস নির্ভর যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে জঙ্গিরা নিজেদের সংগঠিত করে কাজ করার কথা বলছে। কেউ আফগানিস্তানে যাওয়ার চেয়ে নিজ দেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে নজর দেয়ার কথা বলছে। এই গোষ্ঠিটি আফগানিস্তানে তালেবানের জয় দেখতে পাচ্ছে, তাই সেখানে এই মুহূর্তে যাওয়ার দরকার নেই বলেও মনে করছে। তারা কেবল অনলাইনে তালেবানদের প্রশংসা করেই দায় সারছে।
তালেবানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে চীন, ভারত, আমেরিকাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের কূটনৈতিকদের বৈঠকের ছবি শেয়ার ও প্রকাশ করছে দেশের উগ্রবাদিরা। এসব ছবিতে বিভিন্ন ক্যাপশন দিয়ে নেট দুনিয়ায় ছেড়ে দিচ্ছে তারা।
দেশীয় জঙ্গিদের এই তৎপরতাকে বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদের প্রভাব বলেই অভিহিত করছেন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর যেখানেই জঙ্গিবাদ বা জঙ্গিসংগঠন সফল হবে, অন্য প্রান্তের জঙ্গিরা খুশি হবে। তারাও সেভাবে কাজ করার চেষ্টা করবে। তবে একই কাজ করার সক্ষমতা সকল জঙ্গি সংগঠনের থাকে না। দেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোরও নেই। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত অভিযানে সেই সক্ষমতা তারা হারিয়েছে। তবে মতাদর্শের কারণে কেউ কেউ চেষ্টা করবে, তাদের নজরদারিতে রাখতে হবে।’
এন্টি টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. কামরুল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তালেবানের উত্থানে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের তেমন কোনও তৎপরতাই নেই। তালেবান নিজেরাও এখন স্পষ্ট করেছে তাদের অবস্থান। তারপরও আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি। দেশের কোনও জঙ্গি আফগানিস্তানে গেছে আমরা এমন কোন তথ্যও পাইনি।’
সাম্প্রতিক আফগানিস্তান থেকে চুক্তি অনুযায়ী অধিকাংশ মার্কিন সেনা দেশে ফিরে গেছে। ন্যাটো বাহিনীও আর নেই। এই অবস্থায় আফগানিস্তান জুড়ে আক্রমণ জোরদার করেছে তালেবান। ইতোমধ্যেই অনেকগুলো জেলার দখল নিয়ে নিয়েছে। সদ্য দখল করা এসব অঞ্চলে ব্যাপক লুটতরাজ চালাচ্ছে জঙ্গী গোষ্ঠীটি।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব বিদেশি সেনার আফগানিস্তান ছাড়ার কথা রয়েছে। দেশটি থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার হলে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করতে পারে বলে জোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।-বাংলা ট্রিবিউন