মুজিবশতবর্ষে

আপডেট: January 16, 2020, 12:56 am

শুভ্রারাণী চন্দ


বিশ্বের মানচিত্রে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছিল তাঁর স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বাংলার ইতিহাসে যে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করা হয়েছিল তারও চির অবসান হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামটি সুপ্রতিষ্ঠিত হবার মাধ্যমে। একদিন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও অপপ্রচারের নোংরা রাজনীতির মধ্য দিয়ে ইতিহাস যে কলংকজনক অধ্যায়ের সূচনা করা হয়েছিল তারও অবসান হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কীর্তিকে বাংলার ইতিহাস ও বাঙালির মন থেকে চিরতরে মুছে ফেলার যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে।
শোষণ ও বঞ্চনার শিকার বাঙালি প্রতিবাদ করেছে, অসঙ্কোচের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। রাজনীতি সংগ্রামের ইতিহাস কম দীর্ঘ নয়। শোষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত বাঙালিকে পথের দিশার দেখান বঙ্গবন্ধু। তাঁর ঘোষিত ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি শোষক শ্রেণিকে দিশেহারা করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৬ দফার বিষয়ে বাঙালি ছিল অটল। ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্র হয়েছে। নিপীড়ন ও নির্যাতন চালানো হয়েছে, বাঙালি মাথা নোয়ায় নি।
দেশ মাতৃকার প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি ছিল বঙ্গবন্ধুর গভীর ভালোবাসা। আজন্ম তিনি স্বপ্ন দেখেছেন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, শিক্ষিত ও উন্নত এক জাতি। স্বাধীনতা যুদ্ধের ধ্বংসাবেশেষ, নিশ্চিহ্নপ্রায় শিল্প কলকারাখানা, শূন্য ফসলের মাঠ, অগ্নিদগ্ধ শ্মশানপুরী- চারিদিকে হাহাকার, খাদ্য নাই, বস্ত্র নাই, নাই চিকিৎসা ব্যবস্থা, নাই বিদ্যায়ন, স্বজনহারা দুঃখী মানুষের আর্তনাদ- এমনই একটা বাংলাদেশের দায়িত্ব পরম মমতায় গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন সাহায্যের জন্য-যাতে তিনি এদেশের নিরন্ন মানুষের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দিতে পারেন। বিশ্ব দরবারে একদিকে তিনি চেয়েছেন এ দেশের স্বীকৃতি আর অন্যদিকে সাহায্য সহযোগিতা যা দিয়ে তিনি এদেশের মানুষের দুঃখ কষ্টের লাঘব করতে পারেন। দুর্নীতি তখনো এদেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরেছিল। ফলে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন দেশ থেকে যে ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে এনেছিলেন তা অনেকক্ষেত্রেই প্রকৃতপক্ষে যাদের পাওয়া উচিৎ ছিলো তাদের হাতে পৌঁছে নি। ফলে এক শ্রেণির মানুষ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে আর এক শ্রেণির মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এতদসত্ত্বেও প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন দুঃখী মানুষের কষ্ট লাঘব করবার জন্য।
আকাশের মত উদার ছিল তাঁর হৃদয়। সবাইকে ভালোবাসতে ও আপন করে নিতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন তিনি। হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান নির্বিশেষে সকলকে তিনি ভাই বলে সম্বোধন করতেন। তাঁর মত জনদরদী মানুষ সচরাচর দেখা যায় না। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনিই পারেন নিজেদের ধানের গোলা থেকে ধান দুঃখী মানুষদের বিলিয়ে দিতে। শীত নিবারণের জন্য শীতার্ত মানুষকে গায়ের চাদর বিলিয়ে দিতে পারেন বঙ্গবন্ধু। কত শতভাবে তিনি যে মানুষকে সাহায্য করতেন তা বলে শেষ করা যাবে না।
বজ্রকন্ঠের অধিকারী ছিলেন তিনি। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তির দিশা দেখিয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাস স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মাঝে মাঝেই তাঁর ভাষণ প্রচার করে মুক্তিযোদ্ধাসহ আপামর জনগণকে উদ্দীপ্ত করা হতো। তাঁর ভাষণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতো। পাকিস্তানের কারাগারে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর কবর খোঁড়া হয়েছিল পাকিস্তানের মাটিতে। নানা কৌশলে তাঁকে নতি শিকার করবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু তিনি মাথা নত করেন নি। তাঁর একটাই দাবি ছিল তাঁকে যদি ওই দেশে হত্যা করা হয় তবে তাঁর শবদেহটি যেন বাংলাদেশের মানুষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিশ্ব জনমতের চাপে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবার দুঃসাহস দেখাতে পারে নি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ মানেই এক একটি গীতি কবিতা যা মানুষকে প্রাণিত করে নব নব ছন্দে। কী সাবলীল তার শব্দ চয়ন, ছন্দের ওঠা-নামা, তার বাণী! অন্তরের অন্তস্থলে তার মর্ম পৌঁছে যায় অবলীলায়। কি যাদু তার বর্ণনায়! তাঁর ভাষণ মর্মে এসে দোলা লাগায়, ধমনীতে শিহরণ জাগায়। সুনির্দিষ্ট দিক নিদের্শনা থাকে তাতে- যেমন ছিলো ৭ই মার্চের ভাষণে। কী ছিলো না সে ভাষণে? এমন সম্মোহনী শক্তি কয়জনের থাকে?
মানুষের প্রতি ছিলো তাঁর অগাধ বিশ্বাস। যে বিশ্বাসই কাল হয়ে দাঁড়ায় তাঁর জীবনে। একাধিক দেশ-বিদেশের গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক করলেও তিনি তা বিশ্বাস করেন নি। তাঁকে সপরিবারে প্রাণ দিয়ে তার মূল্য দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল পাকিস্তানিরা হাতের নাগালের ভেতরে পেয়ে তাঁকে হত্যা করে নি। সেখানে বাঙালিরা কখনও বেঈমানী করবে না তাঁর সাথে। বঙ্গবন্ধু ভুলে গিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন হলেও ষড়যন্ত্র থেমে থাকে নি। ক্ষমতালোভী পাকিস্তানপ্রেমীরা গোপনে ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছে, প্রতিনিয়ত বিদেশি হস্তক্ষেপও ছিলো ওই ষড়যন্ত্রে। বঙ্গবন্ধুর দু’টো স্বপ্ন ছিলো-১. দেশের স্বাধীনতা ও ২. দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। প্রথম স্বপ্নটি তিনি পূরণ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় স্বপ্ন পূরণের মাঝপথে ঘাতকের হাতে নিমর্মভাবে মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অক্টোবর মাসে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ায় ইয়াহিয়া খান সে আদেশ আর বাস্তবায়ন করতে পারে নি। পাকিস্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্থণের পর, ইয়াহিয়া খানকে অপসারণ করে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়। কিন্তু ইয়াহিয়া ভুট্টোর কাছে আবেদন করেছিল, শেখ মুজিবকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে তার অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণ করবে। কিন্তু সে সুযোগ তার মেলে না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা। ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে পাকিস্তানের সাথে একটা সম্পর্ক রাখার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখান করেন। অবশেষে ৮ই জানুয়ারি পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
পাকিস্তান থেকে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে সংক্ষিপ্ত যাত্রা বিরতি নেন। তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। একইসাথে তিনি কবে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করবেন তাও জেনে নেন। তাঁর বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে এ ঘটনার ভেতর দিয়ে।
বাংলার মানুষের প্রতি ছিলো তাঁর গভীর মমতা। দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে-এটি ছিল তাঁর কাছে দুর্লভ পাওয়া। তিনি ছিলেন আপ্লুত। ১০ই জানুয়ারি ঢাকার ভাষণে তিনি বলেছেন- ‘আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি যাবার আগে বলেছিলাম-এবার তোমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। আমি বলেছিলাম-ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমরা ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলে সংগ্রাম করেছো; আমি আমার সহকর্মীদের মোবারকবাদ জানাই। আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম, বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী। রেখছো বাঙালি করে, মানুষ করি।’ কবি গুরুর কথা আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ। আমার বাঙ্গালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে।’ তিনি তাঁর ভাষণে আরো বলেছেন-‘মুক্তিবাহিনী, ছাত্রসমাজ তোমাদের মোবারকবাদ জানাই। তোমরা গেরিলা হয়েছ, তোমরা রক্ত দিয়েছো। রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় নাই।’
এ বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ পালিত হবে মুক্তিববর্ষ হিসেবে। বছর জুড়ে থাকবে নানা আয়োজন, নানা উৎসব। অনেকের ভেতরই দেখছি অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস। উচ্ছ্বাস, উল্লাস সবই থাকা উচিৎ। কিন্তু তাতে থাকা উচিৎ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা। কিন্তু দুঃখের সাথে লক্ষ্য করি যারা বেশি মাতামাতি করে তারা অনেকেই অন্তঃসারশূন্য। আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী না হই, তাঁর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ না করি, লালন না করি, পালন না করি তাহলে লোক দেখানো, আড়ম্বর অর্থহীন। আমরা যদি তাঁকে ভালোবাসি, তাঁকে শ্রদ্ধা করি তাহলে আমাদের প্রথম কাজই হবে- তাঁর আদর্শের সৈনিক হয়ে সে আদর্শের সফল বাস্তবায়ন করা। নিশ্চয়ই তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ পরম্পরায় আগামী প্রজন্মের সঠিক পথ চলায়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে নিজেদের ভেতরে ধারণ করতে হবে এবং নতুন প্রজন্মের চেতনায় তা প্রোথিত করতে হবে। আমরা তাঁর শততম বর্ষ পালন বিশ্বব্যাপি সফল হোক এ কামনা করি। তাঁর প্রতি রইলো অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। শাশ্বত ও চিরন্তন হোক আমাদের প্রিয় মানুষটি।