মুনতাসীর মামুন স্যারের ৭০তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিবেদন

আপডেট: মে ২৪, ২০২১, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

ড. মো. মাহবুবর রহমান:


আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন আজ ২৪ শে মে সত্তরে পা দিলেন। এটি আনন্দের সংবাদ। দিনটিতে উৎসব আয়োজন করার কথা। আমরা যারা তাঁর অনুরাগী, ভক্ত ও ছাত্র, যারা তাঁর শুভানুধ্যায়ী, বন্ধু ও সুহৃদ, তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গী তারা যে এ দিনটিতে উৎসবের আয়োজন করবেন এটাইতো প্রত্যাশিত। কিন্তু কোভিড-১৯ সব ল-ভ- করে দিল। এমতাবস্থায় পত্রিকায় এ ছোট লেখাটি প্রকাশের মাধ্যমে তাঁকে আমাদের জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। প্রফেসর মুনতাসীর মামুন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জন্য এক অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের সচেতন ব্যক্তিমাত্রই প্রফেসর মামুনকে চেনেন ও জানেন। তিনি আজ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে শ্রদ্ধায় ও ভালবাসায় সিক্ত। সত্তর বছর বয়সে এরকম প্রাপ্তি কয়জনের ভাগ্যে জোটে? বাংলাদেশে আরো কীর্তিমান মানুষ আছেন। তাঁদের অধিকাংশের অর্জন বিশেষ ক্ষেত্রে। তাই তাঁদের পরিচিতিও বিশেষ পরিম-লে। কিন্তু প্রফেসর মামুনের বিচরণ ক্ষেত্র বিস্তৃত।
তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদ। কিন্তু তাঁর আরো অনেক পরিচয় দেশবাসী জানে। তিনি গবেষক, লেখক, অনুবাদক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সত্যাশ্রয়ী কলমযোদ্ধা, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, প্রগতিশীল সুশীল সমাজের প্রবক্তা, চিত্রকলার সমালোচক-বিশ্লেষক, সভা সমিতির সংগঠক, অন্যায়-জুলুম-নির্যাতন-স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, সমাজ-সেবক, সমাজ বিশ্লেষক। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশের প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আছেন। তিনি ডাকসুর নির্বাচিত ‘সম্পাদক’ ছিলেন। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ থেকেই ইতিহাস চর্চার পাশাপাশি তিনি ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি নিজেকে যুক্ত করেছেন ঢাকা নগরভবনে ঢাকা নগর জাদুঘর প্রতিষ্ঠায়, ৩২ নং ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠায়, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠায়, ঢাকার ইতিহাস চর্চার জন্য ‘সেন্টার ফর ঢাকা স্টাডিজ’ (ঢাকা চর্চা কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা ও ইন্টারন্যাশাল সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজের (আইসিএস) প্রতিষ্ঠার কাজে, খুলনায় বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর ও আরকাইভস প্রতিষ্ঠায়, সারাদেশে গণহত্যার বধ্যভূমি চিহ্নিতকরণ ও মনুমেন্ট নির্মাণের সঙ্গে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ বাস্তবায়নে তাঁর অবদান আছে। তিনি শিল্পকলা আইনের অন্যতম প্রবক্তা, জাতীয় গ্রন্থাগার নীতি প্রণয়ন, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় আরকাইভসসহ প্রভৃতি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত আছেন। বাংলাদেশে বিষয়ভিত্তিক ক্যালেন্ডার বা দিনপঞ্জি তৈরির তিনি অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর পরামর্শে ঢাকা শহরের ইতিহাস সংবলিত চিত্রকর্ম দিয়ে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টোবাকো করপোরেশন ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছিল। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমানে সহ-সভাপতি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিএনপি-জামাতের হিন্দু নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেল খেটেছেন। বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করেছেন। আবার পল্লীবাংলাকে জানার জন্য তিনি গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ইতিহাস চর্চাকে অসাম্প্রদায়িক করা ও তা তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি ‘ইতিহাস সম্মিলনী’ নামক একটি জাতীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর চেষ্টায় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে সম্মান ও পাশ কোর্সে সকল ডিসিপ্লিনে বাধ্যতামূলক করা সম্ভব হয়েছে। ইউজিসি-র অধীন সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ে সকল ডিসিপ্লিনে স্বাধীন বাংলার অভ্যুদ্বয়ের ইতিহাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষাতেও ১০০ মার্কসের স্বাধীন বাংলাদেশে অভ্যুদয় কোর্স আছে। কিশোর বয়সেই তাঁর লেখালেখি শুরু। দাদা ভাইয়ের মাসিক ‘কচি ও কাঁচায়’, কচি-কাঁচার আসরে এবং এখলাস উদ্দিন আহমেদের সম্পাদিত ‘টাপুর-টুপুরেও’ লিখতেন। ১৯৭০-এর দশকে বিচিত্রায় ঢাকা শহর নিয়ে লেখা শুরু করেন। বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রায় সাংবাদিকতা করেছেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার পর শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগৎ থেকে বিদায় নিয়ে প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক লেখা শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে পিএইচডি থিসিস লেখেন ‘উনিশ শতকের পূর্ব বাংলার সামাজিক ইতিহাস’ নিয়ে।
‘মুনতাসীর মামুনের গ্রন্থপঞ্জি’ শীর্ষক গ্রন্থে তাঁর রচিত গ্রন্থের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তা’ অনেক প্রকাশকের সামগ্রিক প্রকাশনার সংখ্যার চেয়ে অনেক দীর্ঘ। প্রফেসর মামুনের রচিত গ্রন্থ সংখ্যা তিনশ’র বেশি। তাছাড়া আছে প্রায় ৫০টি সম্পাদিত গ্রন্থ। ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় ৩০টি।’
প্রফেসর মামুনের গবেষণা বিষয়, পরিধি ও সময়কাল ব্যাপক ও বিস্তৃত। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের পূর্ববঙ্গ, বাংলাদেশ, ঢাকা শহর।
তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রকে আমরা ১২টি শ্রেণিতে বিভক্ত করতে পারি, যেমন (১) পূর্ব বঙ্গ, (২) ঢাকা শহর, (৩) মুক্তিযুদ্ধ, (৪) বঙ্গবন্ধু, (৫) উনিশ শতকের সংবাদ ও সাময়িকপত্র, মুদ্রণ ও প্রকাশনা, (৬) পল্লী বাংলা, (৭) পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখা রাজনৈতিক নিবন্ধের সংকলন, (৮) অনুবাদ, (৯) গল্প ও কিশোর সাহিত্য, (১০) কোষগ্রন্থ, (১১) রবীন্দ্রনাথ, (১২) বিবিধ। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তার গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় ৮০টি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লিখেছেন ২৩টি গ্রন্থ।
প্রফেসর মুনতাসীর মামুন ভ্রমণ বিলাসী। ইতোমধ্যে বিশেষ প্রায় ৪০টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। আর বাংলাদেশের ৬৪ জেলা তাঁর নখদর্পণে।
তিনি সংগ্রহপ্রবণ। শিল্প সংগ্রাহক হিসেবে তিনি সুপরিচিত। তাঁর সংগ্রহে আছে জয়নুল আবেদিন থেকে তরুণতম শিল্পীর শিল্পকর্ম। তাঁর সংগৃহীত চিত্রকলার সংখ্যা প্রায় আড়াইশ’। শিল্পকলা ছাড়াও তিনি সংগ্রহ করেন মুদ্রা, পুতুল, মুখোশ ও প্রাচীন ভাস্কর্য। তিনি বইও সংগ্রহ করেন। তাঁর গ্রন্থাগারে দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আত্মজীবনী। তিনি গুরুত্ব দেন প্রথম সংস্করণের বই সংগ্রহের।
মামুন স্যার তাঁর লেখালেখি ও প্রকাশিত বইয়ের সম্মানীর অর্থ প্রায় সবই ব্যয় করেন বই কেনা, চিত্রকলা সংগ্রহ, শৈল্পিক গুণসম্পন্ন পাত্র, পুতুল ইত্যাদি ক্রয়ে।
তিনি আত্মীয়, বন্ধু, গুরুজন, ছাত্র-ছাত্রী সকলের প্রয়োজনে ভালবাসার দায়বদ্ধতা নিয়ে পাশে দাঁড়ান। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী ‘মুনতাসীর মামুন-ফাতেমা’ ট্রাস্ট গঠন করেছেন। ট্রাস্ট থেকে দরিদ্র ছাত্র ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে নিয়মিত সাহায্য করা হয়।
প্রফেসর মুনতাসীর মামুনের চেতনা হচ্ছে : গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য। তিনি ঘৃণা করেন ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, ব্যক্তি স্বার্থচিন্তা, ভ-ামী, স্বৈরশাসন।
মামুন স্যার সম্পর্কে কথার শেষ নেই।
২৪শে মে (২০২১) মামুন স্যার ৭০ বছরে পা দেবেন। স্যার যদুনাথ সরকার বেঁচেছিলেন ৮৮ বছর। তিনি ৫৭ বছর বয়সে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ৩১ বছর ধরে লেখালেখি করেছেন, ইতিহাস নিয়ে তাঁর গবেষণা গ্রন্থগুলো এই ৩১ বছরেই লেখা। আমরা চাইব মামুন স্যার শতায়ু হোন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লিখতে সক্ষম থাকুন। আমি তাঁর সুন্দর, সুস্থ, শান্তিময় জীবন কামনা করি।
লেখক: প্রফেসর (অব.), ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়।