মুসলিম মণীষিগণ কর্তৃক বহির্ভারতে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রসার

আপডেট: আগস্ট ২৫, ২০২১, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

ড. কানাইলাল রায়:


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সম্রাট আকবরের শাসনকালের পূর্বে খুব বেশি সংখ্যক সংস্কৃত গ্রন্থ ফারসি ভাষায় অনূদিত হয়নি। ফিরোজ শাহ তোগলকের (১৩৫১-১৩৮৮ খ্রি.) রাজত্বকালে সর্বপ্রথম সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ শুরু হয়। ১৩৭০ খ্রিস্টাব্দে ফিরোজ শাহ যখন নগরকোট জয় করেন তখন তিনি ১৩০০টি সংস্কৃত পান্ডুলিপি লাভ করেন। এইসব পান্ডুলিপি থেকে বেশ কয়েকটি অনুবাদ করার জন্য তিনি পন্ডিত নিযুক্ত করেন। এ সময় আবদুল আজিজ শমস বাহাইনুরী জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত বরাহমিহির রচিত বৃহৎসংহিতা ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন। অনূদিত গ্রন্থের নাম তর্জমা-ই-বরাহী। ইজাজ উদ্দীন খালেদখানী আর একটি জ্যোতির্বিদ্যাবিষয়ক গ্রন্থ অনুবাদ করেন দলীল-ই ফিরোজশাহী শিরোনামে। সুলতান মাহমুদ শাহ বাহমনীর (১৪৬৩-১৪৮২ খ্রি.) রাজত্বকালে অনূদিত হয় ফারসিতে অষ্টাঙ্গহৃদয় গ্রন্থ। গ্রন্থের নামকরণ হয় তিব্ব-ই-মাহমুদ শাহী। চিকিৎসা শাস্ত্রের আর একটি গ্রন্থ সিকন্দার লোদীর রাজত্বকালে (১৪৮১-১৫৯৮ খ্রি.) তিব্ব-ই-সিকান্দারী নামে অনুদিত হয়। (লন্ডনের ‘ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি’তে শেষোক্ত গ্রন্থটির একটি পান্ডুলিপি রক্ষিত আছে।)
খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ তথা আকবরের শাসনকালই সংস্কৃত ভাষা থেকে ফারসি ভাষায় অনুবাদের স্বর্ণযুগ। আকবরের নিজ জীবনের মূল মন্ত্র ছিল ‘সুল্হ-ই-কুল্ল¦’ অর্থাৎ বিশ্বজনের সঙ্গে মৈত্রী। তাই তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় মূল্যবান গ্রন্থাদি অনুবাদের প্রচেষ্টা করেছেন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা কোনো একটি বিশেষ ধর্ম বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন হিন্দুজাতি বিজিত হলেও তাঁরা এক মহান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। আর তাঁদের এই সুউচ্চ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক ছিল সংস্কৃত ভাষা। তাই আকবর সংস্কৃত ভাষার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলি ফারসি ভাষায় অনুবাদের এক বিশাল দায়িত্ব স্বহস্তে গ্রহণ করেন এবং এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি সেই সময়ের প্রসিদ্ধ পন্ডিতদের নিযুক্ত করেন। যে সমস্ত সংস্কৃত গ্রন্থ অনুবাদের জন্য নির্বাচিত হয় তার মধ্যে, রামায়ণ, মহাভারত, ভগবদগীতা, কথাসরিৎসাগর, সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা, শুকসপ্ততী, রাজতরঙ্গিণী, নলদময়ন্তী, অথর্ববেদ, যোগবাশিষ্ঠ প্রভৃতি গ্রন্থও ছিল। এই অনুবাদ কাজে আকবরকে যে সব মুসলমান পন্ডিত সহায়তা করেছিলেন তাঁরা হলেন আবুল ফজল, আবুল ফয়েজ ফয়জী, নকীব খান, আবদুল কাদের বাদাউনী, সুলতান আহমেদ থানেশ্বরী, মুল্লা শেয়েরি, হাজি ইব্রাহিম সরহিন্দি প্রমুখ ব্যক্তি। বহু হিন্দু পন্ডিতও এ-ব্যাপারে মুসলমান পন্ডিতদের সাহায্য-সহযোগিতা করেন।
এই সময়ের একটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল আকবরের সক্রিয় নির্দেশে আবুল ফজলের তত্ত্বাবধানে মুসলমান ও হিন্দু পন্ডিতবর্গের দ্বারা গঠিত একটি বোর্ড কর্তৃক বিশাল মহাভারত গ্রন্থের সম্পূর্ণ ফারসি অনুবাদ। এই অনুবাদের নামকরণ করা হয় ‘রজ্ম নামাহ্’ বা যুদ্ধের ইতিহাস। মহাভারতের ভীষ্ম পর্বান্তর্গত গীতা যে এই মহাকাব্যের প্রধান আকর্ষণ ও মূল দর্শন সেকথা রসজ্ঞ আকবর উপলব্ধি করেছিলেন এবং এই কারণেই কবি ফয়েজীকে তিনি গীতা অনুবাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অবশ্য লন্ডনে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত গীতার গদ্যানুবাদ আবুল ফজল করেছেন বলে রিসু উল্লেখ করেছেন। গীতা বেশ প্রায়শই ফারসি ভাষায় অনূদিত হয় এবং হিন্দু পন্ডিতগণই প্রধানত এই অনুবাদ করেছেন। এমন কি, বর্তমান শতাব্দীতেও জম্মুর বকশী দীননাথ গীতার ফারসি পদ্যানুবাদ করেন।
দর্শনশাস্ত্রীয় গ্রন্থাদির ব্যাখ্যামূলক অনুবাদের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে শাহজাহানের জ্যেষ্ঠপুত্র এবং মুল্লাহ শাহ্-শিষ্য দারাশিকোহ্র (১৬১৫-১৬৫৯ খ্রি.) অনুবাদ এবং এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সিররে আকবর বা ‘সিররে আসরার’ নামক দুই খন্ডে বিভক্ত ৫০টি উপনিষদ ও সংস্কৃত পরিভাষার ফারসি অনুবাদ। ১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে এই অনুবাদ সম্পূর্ণ হয়। সুফিবাদী এই সাধক উপনিষদাদি দর্শন গ্রন্থের মধ্যে একেশ্বরবাদ ও সৌভ্রাতৃত্বের আদর্শ লক্ষ্য করেছিলেন। তাছাড়া, তিনি গীতা, যোগবাশিষ্ঠ প্রভৃতি গ্রন্থেরও ফারসি অনুবাদ করেন। মহাভারতও এঁর নির্দেশে অনূদিত হয় ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে।
কাশ্মীরের সুলতান জয়নুল আবেদিন (১৪২০-১৪৭০ খ্রি.) ছিলেন অতিশয় সাহিত্যানুরাগী ও বিদ্যোৎসাহী। সংস্কৃত গ্রন্থাদির আরবি ফারসি অনুবাদ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, সংস্কৃত পুঁথি সংগ্রহেও তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ। তিনি অর্থ ও নানা স্থান থেকে সংগৃহীত পুঁথি পন্ডিতদের দান করেন। তাঁরই আগ্রহে ঐতিহাসিক কল্হনের রাজতরঙ্গিণী ফারসিতে অনুবাদ করেন মুল্লা আহমেদ। তিনি মহাভারতও অনুবাদ করেন। তাঁরই নির্দেশে পন্ডিত বোধিভট্ট বেশকটি সংস্কৃত গ্রন্থ ফারসিতে অনুবাদ করেন। হিন্দু-মুসলমানে সমদর্শিতা, বিদ্যোৎসাহিতা, কবি-সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রভৃতি কারণে পরবর্তীকালে তিনি ‘কাশ্মীরের আকবর’ নামে পরিচিত লাভ করেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে সুফী শরীফ কুবজাহানী যোগবাশিষ্ঠ অনুবাদ করেন। অনূদিত গ্রন্থের নাম কশফুল কনুজ আতওয়ার দার হালই আসরার। গ্রন্থটি জাহাঙ্গীরের নামে উৎসর্গীকৃত। শেখ সাদুল্লাহ মসীহ তর্জমা-ই-রামায়ণ নামে রামায়ণের অনুবাদ করেন। এই গ্রন্থটিও জাহাঙ্গীরের নামে উৎসর্গীকৃত। এই সময় বনওয়ালী দাসওয়ালী অনুবাদ করেন রাজাবলী। নীলকণ্ঠ রচিত গবেষণামূলক গ্রন্থ তাজিকা অনুবাদ করেন মুকেমাল খান।
সঙ্গীত-সম্রাট তানসেন রচিত বুধপ্রকাশ গ্রন্থটি ‘তাশবির উল মুসিফী’ নামে ফারসিতে অনুবাদ করেন মোহাম্মদ আকবর আরজানী। আওরঙ্গজেবের শাসনকালে সঙ্গীতা গ্রন্থটি শামস্ উল আসওয়াত নামে অনূদিত হয়। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে গণেশ দাস কাব্য সমালোচনামূলক গ্রন্থ চিত্রচন্দ্রিকা অনুবাদ করেন ঘুঞ্জ-ই-বিখার নামে। গল্প সাহিত্যের মধ্যে পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থটি ফারসি পহলবী ছাড়াও পৃথিবীর বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সিংহাসন দ্বাত্রিংশিকা বা সিংহাসন বত্তিশী গল্প গ্রন্থটি অন্তত ১১ জন অনুবাদক অনুবাদ করেন।
ফারসি ভাষায় সংস্কৃত ভাষার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলি অনুবাদের ধারা সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত অনুসৃত হচ্ছে। কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকটি কাব্যে অনুবাদ করেন ভারতে ইরানের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত প্রফেসর আলী আসগর হেকমত। আরও কিছু আগে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হাদি হাসানও অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ নাটকটির ফারসি অনুবাদ করেন। সাম্প্রতিককালে ড. এস.এ. রেজা জালালী নাইনী ঋগে¦দের ফারসি অনুবাদ করেন। এরূপ আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
খলিফা হারুন-অর-রশীদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.) এবং খলিফা আল-মামুনের (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) শাসনামলে সংস্কৃত ভাষায় লিখিত ভারতীয় বহু গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনূদিত হয়। এই গ্রন্থাদির মধ্যে ব্রহ্মগুপ্ত রচিত জ্যোতিষগ্রন্থ ব্রহ্মসিদ্ধান্ত বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আব্বাসীয় খলিফাগণও বেশকিছু ভারতীয় মনীষীকে তাঁদের দরবারে আমন্ত্রণ জানান। তাঁদের মধ্যে মানকাহ ও দুবান নামক দুইজন প্রখ্যাত ভারতীয় পন্ডিত বাগদাদে অবস্থান করে সেখানে অনুবাদ কাজে নিয়োজিত ছিলেন। পক্ষান্তরে আরবেরও বহু শিক্ষার্থী এদেশে আগমন করে বিভিন্ন শাস্ত্রাদি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। যেমন বাগদাদের আবু মাশার বারানসীতে দশ বছর অবস্থান করে জ্যোতির্বিদ্যায় শিক্ষা লাভ করেন। আরবগণ প্রথম ভারতীয় গণিতশাস্ত্রবিদদের কাছ থেকে ‘এক থেকে নয়’ এবং ‘শূন্যে’র ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষালাভ করেন। তারপর তাঁদের কাছ থেকে এই সংখ্যাবোধক জ্ঞান ইউরোপে প্রচার লাভ করে। এটি অংক শাস্ত্রের একটি মৌলিক জ্ঞান।
উল্লেখ্য, এইভাবে ভারতের সঙ্গে বহির্ভারতের শিক্ষা-সংস্কৃতি-কৃষ্টির আদান-প্রদান যার সূত্রপাত হয়েছিল ভারততত্ত্ববিদ মহামতি আল-বেরুনীর সময় থেকে এবং যা মুঘল আমলে সর্বোচ্চ রূপ ধারণ করে, সেই স্রোতধারা বর্তমান কালেও বহমান রয়েছে।
লেখক: প্রফেসর (অবসরপ্রাপ্ত) ভাষা (সংস্কৃত) বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়