মৃত শ্রমিকদের বিমার টাকা দিচ্ছে না পদ্মা লাইফ ইনস্যুরেন্স

আপডেট: জুলাই ১০, ২০১৭, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


অর্থ মন্ত্রণালয়সহ তিন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেও বিমার টাকা পাচ্ছেন না বিকেএমইএ-র সদস্যভুক্ত কারখানার মৃত ১৫৫ শ্রমিকের পরিবার। তিন বছর ধরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মৃত শ্রমিকদের স্বজনরা ।
অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিকদের বিমা বাবদ পাওনা প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করার পাঁয়তারা করছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স। শ্রমিকদের পক্ষে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) চেষ্টা করেও পাওনার টাকা উদ্ধার করতে পারছে না।
এ প্রসঙ্গে বিকেএমই’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলভ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স প্রায় তিন বছর ধরে শ্রমিকদের বিমা দাবির টাকা নিয়ে টালবাহানা করছে। শ্রমিকের টাকা উদ্ধারে আমরা সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে গিয়েছি। বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে অভিযোগ দেওয়া আছে।’
জানা গেছে, দীর্ঘদিনেও টাকা না পেয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করা হয়েছে। এর বাইরে বিমা কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে পাঁচটি মামলা করেছে বিকেএমইএ’র সদস্য কারখানাগুলো। এদের মধ্যে অবন্তি কালার টেক্সটাইল লিমিটেডের মালিক এ এইচ আসলাম সানি, এমবি নিট ফ্যাশনের মালিক মোহাম্মদ হাতেম, রূপসী নিটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সরওয়ার্দী, মডেল ডি ক্যাপিট্যাল লিমিটেডের মালিক মাসুদুজ্জামান ও মিনার ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল হক। এর বাইরে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও এই মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বিকেএমইএ’র পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে এবং আইডিআরএ-র বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটিতে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় প্রত্যেক শ্রমিকের গ্রুপ বিমা দাবি বাবদ দুই লাখ টাকা পরিশোধসহ বিলম্বিত সময়ের জন্য ব্যাংক রেটের ওপর অতিরিক্ত পাঁচ শতাংশ হারে মাসিক ভিত্তিতে সুদ পরিশোধ করার আদেশ চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে মামলা পরিচালনার খরচ এবং মৃত শ্রমিকের মৃত্যু দাবির টাকা না পাওয়ায় তার পরিবারের সদস্যদের দুঃখ কষ্টের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করার আদেশ চেয়েছেন মামলার বাদী বিকেএমইএ’র যুগ্ম সচিব (ফায়ার অ্যান্ড আরবিট্রেশন) মোহাম্মদ মানিক মিয়া। বিকেএমইএ’র অভিযোগ অযৌক্তিক ও বেআইনি- দাবি করে গ্রাহকের প্রাপ্য টাকা না দেওয়ার পাঁয়তারা করছে বিমা কোম্পানিটি। অথচ মৃত শ্রমিকের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিকভাবে সুবিধা দিতেই গ্রুপ বিমার এ চুক্তি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান এএফএম উবাইদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বিকেএমইএ মামলা করেছে। তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করার কিছু নেই।’
সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ১১ এপ্রিল পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে বিমা চুক্তির মাধ্যমে বিকেএমইএ’র সদস্যভুক্ত সব কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের গ্রুপ বিমার আওতাভুক্ত করা হয়। এ চুক্তি ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এরপর ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি আরেকটি চুক্তি করা হয়, যা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
উভয় বিমা চুক্তির শর্ত অনুসারে, বিকেএইএ’র প্রতিটি সদস্য কারখানার জন্য বছরে সর্বোচ্চ ২০ জন শ্রমিকের মৃত্যু দাবি পরিশোধযোগ্য। এক্ষেত্রে যেকোনও কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকের যেকোনও প্রকার মৃত্যুতে দুই লাখ টাকা বিমা দাবি পরিশোধ করা হবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়। দুর্ঘটনার কারণে পঙ্গুত্ব বরণ করলেও একই সুবিধা দেওয়া হবে। যে সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক বিকেএমইএ’র সদস্যভুক্ত নিটওয়ার ফ্যাক্টরির অধীনে পূর্ণকালীন চাকরিতে নিয়োজিত, সুস্থ এবং যাদের বয়স পরবর্তী জন্মদিনে ৬০ বছর উত্তীর্ণ হবে কেবল তাদের জীবন এই চুক্তিনামার আওতাভুক্ত রাখা হয়। তবে কোনও সদস্যের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর চুক্তিনামার আওতায় আসবে না বলে বিমা চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।
২০১৫ সালের বিমা চুক্তিতে প্রতি সদস্যের বিমা করা অর্থের হাজার প্রতি বার্ষিক প্রিমিয়াম হার নির্ধারণ করা হয় ৮ টাকা ৭৫ পয়সা এবং প্রতি ইউনিটের বার্ষিক প্রিমিয়াম ৩৫ হাজার টাকা। এর আগে ২০১৪ সালের চুক্তিতে বিমাকৃত অর্থের প্রতি হাজার টাকার জন্য বার্ষিক প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয় ৬ টাকা ২৫ পয়সা হারে। এক্ষেত্রে প্রতি কারখানার জন্য বার্ষিক প্রিমিয়াম নির্ধারিত হয় ২৫ হাজার টাকা। কোনও কারখানার সদস্যদের তালিকা সরবরাহের পর প্রিমিয়াম পরিশোধের প্রক্রিয়ার জন্য বিকেএমইএ’কে ২০ থেকে ২৫ দিন সময় দেওয়া হয়।
বিমা চুক্তির শর্ত অনুসারে, বিকেএমইএ’র সদস্য কারখানায় চাকরিরত কোনও শ্রমিকের মৃত্যু হলে সে শ্রমিকের বিমা দাবি যোগ্য। এক্ষেত্রে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের কাছে জমা করা সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিক তালিকায় মৃত শ্রমিকের নাম থাকা বাধ্যতামূলক। সব মৃত্যু দাবি উত্থাপন করার পর ১৫ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে তা পরিশোধ করা হবে বলেও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়।
মামলার বাদী বিকেএমইর যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মানিক মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘ তিন বছর ধরে পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্স আমাদের বিমা দাবি পরিশোধ করছে না। যে সরল বিশ্বাসে পদ্মা লাইফ ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে পলিসি করেছি, তা ভঙ্গ করেছে কোম্পানিটি। এ কারণে আমাদের ন্যায্য এবং আইনসঙ্গত বিমা দাবি পেতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটিতে অভিযোগ দাখিল করতে বাধ্য হয়েছি।’-বাংলা ট্রিবিউন