মেডিকেল টেস্ট কী এবং কেন টেস্ট করা হয়?

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৭, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

ডা. আশিকুর রহমান রুপম


আমাদের দেহে যখন বিভিন্ন রোগ বাসা বাধে তখন কিছু লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পায়। তা পর্যালোচনা করে ডাক্তারগণ রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হল একই লক্ষণ-উপসর্গের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন- কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ।
একটা রোগি ভীষণ জ্বরের চোটে কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই একই উপসর্গের কতগুলো কারণ হতে পারে। যেমন- ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়া, প্রস্রাবে ইনফেকশন (ইউটি আই), কোলাঞ্জাইটিস, অ্যাবসেস।
এটা নির্দিষ্ট করে নির্ণয় করার (ডায়াগ্নসিস) জন্য শরীরের বিভিন্ন উপাদান স্যাম্পল হিসেবে নিয়ে যে টেস্ট করা হয়, যেমন- রক্ত, মূত্র, এবং বিভিন্ন ছবি, যেমন- এক্স-রে, আল্ট্রাসাউন্ড করা তাকেই বলা হয় টেস্ট বা প্যাথলজিকাল টেস্ট। মেডিকেল সায়েন্সের ভাষায় একে বলে ইনভেস্টিগেশন। ঠিক একই ভাবে  সংক্রমণের ফলে উৎপাদিত পুঁজ পরীক্ষা করে দেওয়া যায় কোন জীবাণু (ব্যাক্টেরিয়া) দ্বারা সংক্রমণ (ইনফেকশন) হয়েছে।
এমনিভাবে, কাশি পরীক্ষা করে ফুসফুসে যক্ষা বা নিউমোনিয়া বা অন্য কোন ইনফেকশন আছে কিনা। এই যে, কাশির কথা বললাম, এমনি ভাবে কাশি, মল, মূত্র, পুঁজ, কানের রস, গলার রস, যোনি রস, ঘা, খোস, পাঁচরা ইত্যাদি থেকে স্যাম্পল নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে নিয়ে প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ  ডাক্তারগণ তা দেখে  নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারেন, কোন জীবাণু দ্বারা অসুখটি হয়েছে। এবং কালচার-সেন্সিটিভিটি করে বলে দেওয়া যায়, কোন অ্যান্টিবায়োটিকে জীবাণুটি মরবে।
আধুনিক বিজ্ঞান যত উন্নত হয়েছে তার মধ্যে মানুষের জীবনঘনিষ্ট সবচেয়ে বেশি উন্নত হয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানে। এখন আর রোগিকে শুধু চোখে দেখে বা পরীক্ষা করেই চিকিৎসা করা হয় না। টেস্ট করে নিশ্চিত হয়েই চিকিৎসা দেওয়া হয়। এটা রোগির ভালোর জন্যই করা হয়। কারণ, সুনিশ্চিতভাবে রোগ ধরে সেটা চিকিৎসা দিলেই কেবল রোগি পুরোপুরি সেরে ওঠে। তার মানে এই নয় যে, ডাক্তারের জ্ঞান এবং পরীক্ষার কোনো গুরুত্ব নেই এখানে, বরং সঠিক জ্ঞান এবং ক্লিনিকাল পরীক্ষাই বলে দেই কোন কোন টেস্ট করতে হবে। হাতুড়ে ডাক্তার আর প্রকৃত এমবিবিএস ডাক্তারের পার্থক্য মূলত এখানেই। হাতুড়ে ডাক্তার কখনই সুনির্দিষ্ট করে রোগটি ধরে দিতে পারে না। শুধুমাত্র সাময়িক লক্ষণগুলোর উপশম ঘটায়। কিন্তু মূল রোগটি অনেক সময় শরীরে থেকেই যায়। এবং রোগি এসে বলে অনেক ডাক্তারকে দেখিয়েছি কিন্তু ভাল হয় নি। বিশ্বাস করুন, হাতুড়ে ডাক্তারদের জন্য বিনা কালচার-সেন্টসিটিভিটি দ্বারা, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট মানে, ওই অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না। ফলে আরো দামি এবং হাই পাওয়ারের অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়। কিন্তু কালচার করলে নিশ্চিত করলে বলা যায় কোন ব্যাক্টেরিয়া এবং কোন অ্যান্টিবায়োটিকে মরবে।
তাই এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন ওষুধ তৈরির পাশাপাশি কত কম সময়ে বিভিন্ন টেস্টের মাধ্যমে কত দ্রুত ডায়াগ্নসিসের পৌঁছানো যায় সেই চিন্তা করছেন। খুব সহজ করে বলতে গেলে রক্তের খুবই সাধারণ একটি পরীক্ষা হল-  কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট বা সিবিসি। এই ছোট্ট একটা রক্তের টেস্টের মাধ্যমে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। রোগির শরীরে রক্তের পরিমাণ কেমন আছে, এনিমিয়া বা রক্তাল্পতা আছে কিনা- তা জানা যায় ঐন% এবং জইঈ পড়ঁহঃ দেখে। আবার শরীরে ইনফেকশন বা ইনফ্লামেশন (প্রদাহ) আছে কিনা যা বুঝা যায় ডইঈ (ঞঈ) এবং ঘবঁঃৎড়ঢ়যরষ, খুসঢ়যড়পুঃব, ঊঝজ দেখে। আবার কারো এলার্জি আছে কিনা তা দেখতে ঊড়ংরহড়ঢ়যরষ দেখা যায়। বিভিন্ন কৃমিতেও এটা বেড়ে যায়।
কারো জন্মগত রক্তক্ষরণ রোগ বা পরবর্তিকালে রক্তজমাটবাধায় অসুবিধা জনিত রোগে ভুগলে চষধঃবষবঃ দেখা যায়।
এছাড়াও ঈচইঋ এর মাধ্যমে রক্ত নিয়ে তৈরি করা স্লাইডের উপর ফিল্ম বানিয়ে তাতে রক্ত কণিকার সংখ্যা এবং তাদের আকার-আকৃতি দেখে ক্যান্সারের ধারণা দিতে পাবে।
আবার আধুনিক বিজ্ঞানে ঊহফড়ংপড়ঢ়ু এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। ঊহফড়ংপড়ঢ়ু হল একটি পরীক্ষা, যাতে ক্যামেরাযুক্ত নল মুখের বা পায়ুপথের মধ্যে দিয়ে শরীরের ভেতরের অবস্থা কোন রকম কাটা ছেঁড়া ছাড়াই বলে দেওয়া যায়। কোনো ক্যান্সার সন্দেহ হলে সেখান থেকে জীবন্ত কোষ তুলে আনা যায় (স্যাম্পল হিসেবে) যাকে বলে বায়োপসি। এই বায়োপসির মাধ্যমে জীবন্ত কোষ নিয়ে মাইক্রোস্কোপে দেখে  (হিস্টপ্যাথলজি) বলে দেওয়া যায়, ক্যান্সার আছে কিনা?
এছাড়া ব্রেইনের সিটিস্ক্যান করে বলে দেওয়া যায় যে ব্রেইনে কোনো স্ট্রোক ক্যান্সার হয়েছে কিনা। হার্টে এঞ্জিওগ্রাম (ঈঅএ) করে বলে দেওয়া যায় হার্টের রক্তনালিতে ব্লক আছে কিনা, থাকলে কয়টা ব্লক এবং কত %। আবার আরো উন্নত টেস্টের কথা চিন্তা করলে নার্ভ কন্ডাকশন স্টাডি দেখে বলে দেওয়া যায় নার্ভ বা স্নায়ু ঠিক মত কাজ করছে কিনা। এমনকি গর্ভের সন্তানের কোনো জন্মগত ত্রুটি বা থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা অসহরড়ঃরপ ভষঁরফ ংঃঁফু দেখে বলে দেওয়া যায়।
সুতরাং একটি রোগ নিখুতভাবে এবং নিশ্চিতভাবে ধরায় টেস্টের গুরুত্ব অপরিসীম। এবং এই টেস্টের মাধ্যমে সঠিক রোগ ডায়াগ্নসিস করে চিকিৎসা দেওয়া হয় বর্তমানে পৃথিবীর সব জায়গায়, সব দেশেই।  তাই কোনো এমবিবিএস ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কোনো টেস্ট দিলে বিন্দুমাত্র অবহেলা না করে দ্রুত টেস্টগুলো করা উচিৎ। যাতে করে রোগি সঠিক চিকিৎসা পায় এবং কম ওষুধে রোগ ভাল হয়ে যায়।
দ্রুত চিকিৎসা এবং আরোগ্য লাভে দ্রুত টেস্টের বিকল্প নাই।
লিখেছেন : ইন্টার্ন চিকিৎসক, ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল