মেলা শেষে সেরা উদ্ভাবনীগুলো খেলনায় পরিণত হয়!

আপডেট: জানুয়ারি ৩১, ২০২০, ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

শাহিনুল আশিক


বিজ্ঞান মেলার নামে প্রতিবছর উড়ানো হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আয়োজকদের কথা বিজ্ঞানমনস্ক করতে তাদের এই আয়োজন। প্রতিবছরই নতুন নতুন উদ্ভাবন উপহার দেয় শিক্ষার্থীরা। তবে আলোর মুখ দেখে না এসব উদ্ভাবনী। এনিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে এক প্রকারের অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা জানায়, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে অনেক পরিশ্রম দিতে হয়। কিন্তু মেলায় প্রথম বা দ্বিতীয় হলেও সেই আবিষ্কারটি কর্তৃপক্ষ কোনো কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন না। ফলে মেলা পর্যন্তই থাকে আবিষ্কারের মূল্য। মেলা শেষে সেরা আবিষ্কারটি খেলনায় পরিণত হয়।
একযুগ ধরে রাজশাহী বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারে (বিসিএসআইআর) হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা। প্রতিবছর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়Ñ তিনটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের সার্টিফেকেট ও পুরস্কার দেয়া হয়। তারপরে আর খোঁজ থাকে না বিসিএসআইআর কর্তৃপক্ষের। তাহলে বছরে লাখ লাখ টাকা খরচের কী প্রায়োজন- এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রতিবছরের শ্রেষ্ঠ প্রজেক্টগুলো অন্ধকারেই থেকে যায়। মেলায় অংশগ্রহণ করা বিভিন্ন স্টলের শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতিবছর বিজ্ঞান মেলাই হয়। মেলায় প্রথমস্থান অধিকার করা আবিষ্কারটি কোনো কাজে আসে না। এ মেলায় প্রতিযোগিতাপূর্ণ তখনই হবে যখন কর্তৃপক্ষ আবিষ্কারগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করবেন। এখন মেলা পরিণত হয়েছে কিছু স্টল ও দুপুরে খাওয়া আর আড্ডা।
শিক্ষার্থী রহিদুল ইসলাম জানায়, ‘মেলার আগে আমরা খাটাখাটনি (পরিশ্রম) করে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করি। মেলায় তিনদিন প্রদর্শনী হয়। মেলা শেষে সবকিছু বাড়িতে রেখে দিই। ছোট ভাইয়েরা সেগুলো নিয়ে খেলা করে। এনিয়ে আয়োজকরা মেলা শেষ করে দায় শেষ করেছেন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েজন কর্মকর্তা জানান, ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম বিজ্ঞান মেলা শুরু হয়। তারপর থেকে একইভাবে চলে আসছে। প্রথম বছর প্রায় দুই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ হয় মেলায়। তারপর থেকে প্রতি বছরই বাড়ছে মেলার খরচ। এবছর অনুমানিক ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। ১২ বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তহলে এতো টাকা খরচের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি শূন্য- এমন প্রশ্ন উঠেছে। ১২ টি মেলার উদ্ভাবনীগুলোর একটিও জাতীয়ভাবে অনুশীলন হয়নি। আর অনুশূলন না হলে উদ্ভাবনীর যথাযথ গুরুত্বও থাকে না। শিক্ষার্থীরা এরকম মেলায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
জানা গেছে, তিনদিনব্যাপি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় ২০১৯ সালে তিনটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেয়া হয়। ‘ক’ বিভাগের প্রথম হয়েছে শিমুল মেমোরিয়াল নর্থ সাউথ স্কুল, দ্বিতীয় হয়েছে বিসিএসআইআর ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়, তৃতীয় হয়েছে সরকারি পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ‘খ’ বিভাগের প্রথম হয়েছে সরকারি পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও শিমুল মেমোরিয়াল নর্থ সাউস স্কুল, দ্বিতীয় হয়েছে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল, তৃতীয় হয়েছে প্যারামাউন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ‘গ’ বিভাগের প্রথম হয়েছে ফুলকুঁড়ি বিজ্ঞান চক্র, দ্বিতীয় হয়েছে মসজিদ মিশন অ্যাকাডেমি ও কলেজ, তৃতীয় হয়েছে ফিউশন সায়েন্স ক্লাব। এবছর মেলায় অংশগ্রহণকারী তিনটি ক্যাটাগরিতে ৯টি স্টলকে পুরস্কার দেয়া হয়। মেলায় রাজশাহী বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের ৬০টি স্টল অংশ নেয়।
বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিসিএসআইআর চিঠি দেয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা হবে বলে। এরপরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। পরে শিক্ষার্থীদের বিসিএসআইআর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় পাঠানো হয়।
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ড. নূর জাহান বেগম বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা এটা ভালো উদ্যোগ। গত বছর তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় হয়। তার আগের বছর প্রথম হয়।
শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলো নিয়ে কোনো কাজ করতে বিসিএসআইআর গবেষণাগারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয় না। তবে প্রথমস্থান হওয়া আবিষ্কারটি নিয়ে কাজ করার দরকার।
প্রসঙ্গত, গতবছর ৫৬টি স্টলে ৯৬টি প্রজেক্ট স্থান পাই। মেলায় রাজশাহীর ১৯টি স্কুল ও পাঁচটি কলেজ ও ১৮টি বিজ্ঞান ক্লাব বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।
গবেষণাগারের পরিচালক ড. মো. ইব্রাহীম বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য তরুণদের বিজ্ঞানমনস্ক করা। মেলা শেষে প্রজেক্টগুলোর কী অবস্থা হয়- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য প্রথম হওয়া প্রজেক্টটি নিয়ে যেতে বলা হয়। তবে রাজশাহী বিসিএসআইআর থেকে কতটা প্রজেক্ট কেন্দ্রে গেছে তার পরিসংখ্যান জানা নেই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ