মেয়েদের বিয়ের বয়স

আপডেট: ডিসেম্বর ১, ২০১৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ
একজন মানুষ তথা মেয়ের পরিপূর্ণ বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্তই হচ্ছে তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। সুস্থ মন পেতে প্রথমতঃ প্রয়োজন সুস্থ শরীর। সেক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। শরীর বাড়ে সুষম খাদ্যের সাথে সাথে সময়ের সঙ্গে। মনেরও প্রয়োজন সুষম খাবারের। আলু, পঠল, তেল, নুন মাছ-মাংসে মনের ক্ষুধা মেটে না। শুধু তাই নয় শরীর যেমন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার খেলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। মনের ধারণ ক্ষমতার তুলনায় যদি তাকে অতিরিক্ত ভার দেওয়া হয় তাহলে সে সেটা বহন করতে পারে না।
একটা বীজ থেকে যেমন চারাগাছ জন্ম নেয় এবং ধীরে ধীরে সে বড় হয়ে পত্র-পল্লব, ফুল ও ফলে ভরে ওঠে, মেয়েদের জীবনও তেমনি। মেয়েদের বিয়ের বয়স সরকারিভাবে ১৮ বছর করা হয়েছিল। মানে কোন এক সময় ১৮ থেকে কমিয়ে সেটা ১৬ বছর করার সিদ্ধান্তে দেশব্যাপী আন্দোলন হয়েছিল। কিছুদিন পরে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু অতি সম্প্রতি এ বিষয়টি এখন অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়। একদল বিজ্ঞ ব্যক্তি মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ বছর করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। এ সিদ্ধান্তটি সরকারি মহল স্ববিরোধী করে তুলছে। কারণ সরকারই নারী শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলছেন, আবার অন্যদিকে মাত্র ১৬ বছরে বিয়েকে আইনসিদ্ধ করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে নারীকে যদি স্বাবলম্বী হতে হয় তাহলে বাল্য বিয়ে তার অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে অবধারিতভাবে। কারণ, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ১৬ বছর বয়সের একটি মেয়ে অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের গ-িই পেরুতে পারে না। সেক্ষেত্রে তার সামনে পড়ে থাকে এক দুস্তর পথ শিক্ষা জীবনের। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়- যে কোন শিক্ষারই এক একটা সময় ও বয়স থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে যে ব্যতিক্রম নেই তা নয়-ব্যতিক্রম অবশ্যই হাতে গোনা। কিন্তু খুব সংগত কারণেই সুবিবেচক ব্যক্তি মাত্রেই বলবেন ১৬ বছর বয়স কোন দিক দিয়েই বিয়ের উপযুক্ত বয়স নয়।
বিয়ের জন্য একটি মেয়ের যে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকা দরকার এ বয়সে সেটা অর্জন করা সম্ভব নয়-তাকে আরো সময় দেওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে ১৮ বছরও যে উপযুক্ত বয়স তাও কিন্তু নয়। তবে এ বয়সটাকে মন্দের ভালো হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। অনেকক্ষেত্রেই ১৬ বছর বয়সী একটি মেয়ে নিজেকে ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে না। সেক্ষেত্রে সে কীভাবে একটি পরিবারের দায়িত্ব নেবে? অসময়ে বিয়ে দিলে একদিকে তার শিক্ষা বিস্মিত হয় এবং অন্যদিকে যথাযথ জ্ঞানের অভাবে নতুন পরিবার, পরিবেশ ও মানুষদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হিমশিম খায়। অনেকক্ষেত্রেই পরিণতি সুখকর হয় না।
বাল্যবিয়ের ফলে অল্প বয়সেই অনেকে গর্ভধারণ করে-যার পরিণতি আরো ভয়াবহ হয়। অকাল মাতৃত্বের কারণে একদিকে তার শরীর ভেঙ্গে যায় আর অন্যদিকে সন্তান লালন-পালনে তার জ্ঞান না থাকায় মা ও সন্তান উভয়েই বিপদে পড়ে। এ অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি নিশ্চয়ই কারো কাম্য নয়। এক্ষেত্রে একটি মেয়েকে যথোপযুক্ত সময় ও শিক্ষা দেওয়া উচিৎ বিয়ে ও সন্তানধারণ ও লালন পালন সম্পর্কে। যদি কেউ এ ধরনের বিয়ের পরেও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চায় সেটা তার জন্য আরো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা থাকলে কষ্টের বোঝাটা খানিকটা লাঘব হয়। তবে আজকাল পরিবারগুলোও একান্নবর্তী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। সুতরাং, সে সাহায্যও অনেকক্ষেত্রে পাওয়া সম্ভব হয় না। সবচেয়ে বড় কথা একজন ভালো মা হওয়ার জন্য যে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন সেটা এ অল্প বয়সে অর্জন করা সম্ভব হয় না শিশু মৃত্যু, অটিজম, রোগ বালাই লেগেই থাকে।
নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ’এরাব সব ধ মড়ড়ফ সড়ঃযবৎ ধহফ ও রিষষ মরাব ুড়ঁ ধ মড়ড়ফ হধঃরড়হ.’ এড়ড়ফ সড়ঃযবৎ বা ভালো মা হওয়ার জন্য অবশ্যই তার জ্ঞান ও মেধা থাকতে হবে। সে জ্ঞান অর্জন করার কাজটিও মোটেই সহজ নয়। অপরিণত বয়সের চিন্তা- চেতনা জ্ঞান- মেধা পরিণত বয়সের চেয়ে সঙ্গত কারণেই অপরিপক্ক। মা হিসেবে তারা সন্তানকে ¯েœহ-ভালবাসায় হয়তো ভরিয়ে দিতে পারে কিন্তু প্রকৃত অর্থে একজন সুসন্তান বা যোগ্য সন্তান হিসেবে গড়ে তোলাটা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এটা তাদের দোষ নয়- তাদের কম বয়স ও অভিজ্ঞতার অভাবই দায়ী এজন্য। একজন ভালো মা-ই পারেন একজন সুসন্তান তৈরি করতে। অপরিণত বয়স্ক মায়েদের শারীরিক সক্ষমতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পুতুল খেলার বয়স পেরুতে না পেরুতেই মানুষ পুতুলের লালন-পালনের গুরুভার ও দায়িত্ব পালন করা মোটেই সহজ কাজ নয়।
এসব মায়েরা যেমন মানব সম্পদে পরিণত হতে পারে না- তেমনি অনেকক্ষেত্রেই সন্তানদেরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারেনা-এটা একটা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে সমাজে তারা অনেকটাই পরিনির্ভরশীল ও অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে। অথচ এ বৃহৎ জনগোষ্ঠির অনেকের ভেতরেই সুপ্ত থেকে যায় বিপুল সম্ভাবনা। উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ পেলেই তারা হয়তো হয়ে উঠতে পারত দক্ষ জনশক্তি। এ বিশাল ক্ষতির হাত থেকে দেশকে বাঁচানোও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সুতরাং, বিয়ের বয়স ১৬ বছর না করাটা সর্বাংশেই মঙ্গলজনক। নারী জাগরণ, নারীর স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও নারীর ক্ষমতায় নিশ্চিত করতে ১৬ বছরে বিয়ের সিদ্ধান্তটি বাতিল করা একান্ত জরুরি। নারীকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে প্রয়োজন শিক্ষা, চেতনা, অন্তর্জাগরণ ও মেধা মননের সঠিক পরিচর্যা, লালন-পালন, তার স্ফুরণ ও সর্বোপরি চর্চা। তবেই শাণিত হবে তাদের বুদ্ধিমত্তা, জাগরিত হবে আত্মসম্মান ও আত্ম মর্যাদাবোধ। নারী শিক্ষা ও আর্থিক স্বাবলম্বন ছাড়া নারী কখনো মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হবে না। আর এসবের জন্য প্রয়োজন একটা বয়স পর্যন্ত তাকে সময় দেওয়া নিজেকে তৈরি/ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তাকে চার দেওয়ালের মাঝে আটকে না রেখে মুক্ত পরিবেশে স্বাধীন চিন্তা ও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটানো অসম্ভব।
সুতরাং, বিয়ের বয়স ১৬ নিয়ে কোন রাজনীতি না করে বাস্তবসম্মত, যুগোপযোগী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটাই শ্রেয় ও সকলের জন্য মঙ্গলজনক। আমরা চাই নীতি নির্ধারক ও আইন প্রণয়ণকারী সংস্থা সময়ের দাবিকে উপেক্ষা না করে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুন এবং নারী জাতির অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করুন।