‘মেয়ের কাঁধে মায়ের সংসার’

আপডেট: September 24, 2020, 9:27 pm

কুলসুম সাফরিন:


সুখ শব্দটি যাদের কাছে মূল্যহীন। সবকিছু থেকেও তাদের কিছুই নেই। শেষ সম্বল ভিটেটুকুও ছলচাতুরিতে আত্মসাত হয়েছে। এখন নেই ঘর, নেই বাড়ি। ভাড়া বাড়িই ভরসা। দু’বেলা দুমুঠো খাবার ও টিকে থাকার সংগ্রাম করছে মো. রুমির পরিবার।
রুমির মা কাজল রেখা জানান, কষ্টের জীবন। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে রুমির উপরে চলে সংসার। সংসারের বোঝা টানতে গিয়ে বন্ধের উপক্রম লেখাপড়া তার। লেখাপড়া আর সংসার নিয়ে দুশচিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
নগরীর মোল্লাপাড়ার আলীমগঞ্জ এলাকার কাজল রেখা জানাচ্ছিলেন তাদের জীবন সংগ্রামের কথা। চার ছেলে-মেয়ের বিয়ে হয়েছে ইতোমধ্যেই। তারা নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ওরা কেউ যোগাযোগ রাখে না। এখন কাজল রেখা মিলে আমাদের তিনজনের সংসার। মেয়ে মোসা. রুমি (১৭) পড়ে দ্বাদশ শ্রেণি ও ছেলে আকাশ (১৪) ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এখন কাজলই সবকিছু। স্বামী রিয়াজুল অভিমানে ছেড়েছে সংসার। তাই নেয় না খোঁজ-খবর।
জীবিকার তাগিদে রুমি রাজশাহীর বিসিকে এক ফ্যাক্টারিতে কাজ করে। সেখানে মাসে ৫ হাজার টাকা বেতন পায়। ওই টাকাতেই চলে তাদের তিনজনের সংসার। শুধু তাই নয়, নিজের ও ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ রুমিকেই জোটাতে হয়।
মা কাজল রেখা জানায়, শ্বশুরের কিছু সম্পত্তি ছিলো। স্বামী থাকা অবস্থায় হাতছাড়া হয়েছে। দেবর শ্বশুরকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার নামে কোর্টে গিয়ে সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়েছেন নিজেদের নামে। এখন স্বামীও থাকেন না তাদের কাছে। স্বামী রিয়াজুল থাকেন বড় মেয়ের বাড়িতে কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায়। আমাদের তিনজের খবর নেয় না স্বামী। তাই মেয়েটাকেই বইতে হচ্ছে সংসারের বোঝা।
তিনি আরও জানায়, মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল আলীগঞ্জে আদর্শ গ্রামে। বিদেশি সংস্থার টাকায় ঘর তুলে ছিলো তারা। কিন্তু মেয়ে জামাইয়ের টাকার প্রয়োজন ছিলো। তাই বাড়ির উপরে ঋণ নিয়ে টাকা দেয় জামাইকে। কিন্তু সেই ঋণ পরিশোধ করেনি জামাই। ফলে বাড়িটাও হারাতে হয়েছে।
পরে লিলি সিনেমা হল এলাকার মোড়ের কাছে টিনসেড বাড়ি করি। কিছুদিন আগে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সেই বাড়ি থেকে তাদের তুলে দেয়। এখন আলিমগঞ্জ এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকি। মাসে ১২০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। স্বামী যখন চলে যায় তখন ছোট ছেলে আকাশের বয়স ছিলো ১১ বছর। এখানে-ওখানে কাজ করে সংসার চলাতাম। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে আর পারিনা কাজ করতে। এখন একমাত্র সম্বল রুমি।
মোসা. রুমি জানায়, আমি আমচত্বর এলাকার একটি কারিগরি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ি। দারিদ্রের কারণে সংসার বোঝা কাঁধে এসে পড়েছে। বাবা থেকেও নেই। মা অসুস্থ। দুই ভাই বিয়ে করে তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। দুই বোন স্বামীর সংসারে। ছোট ভাই, মা আর আমি- সংসারে।
তিনি আরও বলেন, এখন তো তাদের (মা-ছোট ভাই) কাজে পাঠানো সম্ভব না। মায়ের সংসার আমার কাঁধে পড়েছে। তাই কী করবো নিজেই নেমে পড়েছি জীবনযুদ্ধে। ফ্যাক্টারিতে যে বেতন পাই তাতে কোনো মতে চলে আমাদের সংসার। চেষ্টা করছি ভালো থাকার।