মে দিবসের ভাবনা

আপডেট: এপ্রিল ৩০, ২০১৭, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

অধ্যক্ষ মজিবর রহমান


‘ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস অ্যান্ড লেবার ইউনিয়ন’ ১৮৮৫ সালের অক্টোবর মাসে আমেরিকা সরকারের নিকট শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের দাবি উত্থাপন করে এবং সে দাবিটি ১৮৮৬ সালের মে মাসের ১ তারিখ পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে তা মেনে নেয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। কিন্তু তৎকালীন আমেরিকা সরকার তা মেনে নিতে রাজি না হলে আন্দোলনটি প্রবল আকার ধারণ করে। ১ মে তারিখে গোটা আমেরিকা জুড়ে হরতাল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চলতে থাকে। শিল্প সমৃদ্ধ শিকাগো শহরটি মাসের প্রথম তিন দিনে মিছিলের পর মিছিল এবং বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরদিন অর্থাৎ ৪ মে এক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে। যেমনটি ঘটেছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে। রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা চাই’ আন্দোলনে পাকি-পুলিশ বাহিনী ছাত্র জনতার মিছিলে অতর্কিত এলোপাথাড়ি গুলি চালালে আজকের জাতীয় শহিদ মিনার চত্বর রক্তে রঞ্জিত হয়। শহিদ হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বাররা। কিন্তু তাতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেমে থাকেনি। ঠিক তেমনি শিকাগোতে শ্রমিকরা তাঁদের দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে ৪ মে বিশাল মিছিল বের করে। মিছিল শেষে হে মার্কেট চত্বরে শুরু হয় বক্তৃতা বিবৃতি পর্ব। সে পূর্বে সর্বশেষ বক্তা ছিলেন, আমেরিকার সমাজ সংস্কারক ও শ্রমিক নেতা ‘স্যামুয়েল ফিন্ডেন’। তাঁর বক্তৃতা চলাকালে শিকাগো পুলিশ বাহিনী সভাস্থল ছেড়ে সকলকে চলে যেতে বলে। কিন্তু শ্রমিকরা সভাস্থল ত্যাগ না করলে তাদের উপর বোমা ও এলোপাথাড়ি গুলি ছোঁড়ে। মুহুর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে যায় হে মার্কেটটি। রক্তে রঞ্জিত হয় রাস্তা, পড়ে থাকে শ্রমিকদের লাশ। বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু উল্টো পুলিশ দাবি করে যে তাদের একজন পুলিশ ঘটনাস্থলে মারা যায়, আহত হয় ৬৬ জন। আহতদের মধ্যে থেকে পরবর্তীতে আরো মারা যায় ৬ জন পুলিশ সদস্য। কিন্তু ঐতিহাসিকগণ এতে একমত পোষণ করেন না। তাঁরা বলেন পুলিশের এ দাবি ঠিক নয় বরং পুলিশের এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়ার কারণেই শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। যে সকল আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করা হয় সরকার তাদের বিচার কার্য শুরু করেন। বিচারে জুরিবোর্ড আট জনকে মৃত্যুদ- ও একজনকে পনের বছরের কারাদ- প্রদানের সুপারিশ করলে আদালত সাত জনকে মৃত্যুদ- ও এ জনকে পনের বছরের কারাদ- প্রদান করেন। কিন্তু আমেরিকার ‘ইলিয়ন’ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর রিচার্ড জেমস ১৮৮৭ সালের ১০ নভেম্বর প্রতিবাদী শ্রমিক নেতা ‘ফিন্ডেন’ ও ‘স্রোয়ারের’ মৃত্যুদ- মওকুফ করে তার পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করেন।
১৯১৯ সালে ভার্সাইল চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং সেই চুক্তি অনুসারে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে গোটা বিশ্বজুড়ে শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্ট হতে থাকে। শ্রমিক শ্রেণি তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং ন্যায় বিচার প্রাপ্তি থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। সমাজবিদ ও রাজনীতিবিদগণ দেখলেন, সমাজের এহেন অবস্থা চলতে থাকলে বিশ্ব শান্তির আরও অবনতি ঘটবে ভেবে শ্রমিকদের জন্য একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন’ অর্থাৎ আইএলও প্রতিষ্ঠা করেন। চিন্তাবিদগণ অনুধাবন করেন যে, সমাজের একটি বৃহৎ অংশ হল শ্রমিক শ্রেণি। তারা সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং তাদের ন্যায্য অধিকার ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই অনুধাবন থেকেই জন্ম নেয় ‘লিগ অব নেশনস’। যা পরবর্তীকালে ‘জাতিসংঘ’ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সেই জাতিসংঘেরই একটি এজেন্সির নাম হল আইএলও।
জাতিসংঘের প্রায় সকল রাষ্ট্রই হচ্ছে আইএলও’র সদস্যভুক্ত দেশ। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সংস্থাটির সদরদপ্তর। জাতিসংঘের অন্যান্য সংগঠন থেকে আইএলও’র সাংগঠনিক কাঠামো কিছুটা ভিন্নতর। বলা হয়, সরকার, মালিক এবং শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধির দ্বারা এটি পরিচালিত হবে। এখানে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা দেয়া হয়। নির্দেশনাগুলো এরকম- এক. শ্রমিকদের দৈনিক ও সাপ্তাহিক কর্মের সর্বোচ্চ সময় নির্ধারণ, দুই. শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করণ, তিন. যেকোন বিপদ থেকে শ্রমিকদের রক্ষা করা, চার. শিশু-কিশোর ও নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা করা, পাঁচ. প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা ও মজুরির ক্ষেত্রে সমতা বিধান করা, ছয়. কর্মমুখি ও কারিগরি প্রশিক্ষণে সহায়তা করা এবং সাত. শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত করা প্রভৃতি।
তবে জন্মলগ্ন থেকেই আইএলও’কে নানাবিধ প্রতিকুল অবস্থার সম্মুখিন হতে হয়েছে। অনেক দেশের সরকারই তার কর্ম পরিধি ও এখতিয়ারের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কোন রাষ্ট্র এর নির্দেশনা ও পরামর্শ মেনে চলাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে মনে করে। তাছাড়া মামলা মোকদ্দমা ও ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস এর বিষয়তো রয়েছেই। তবে কোন বিষয়ই দমিয়ে রাখতে পারেনি আইএলও’র অগ্রযাত্রাকে। সংস্থাটির জেনেভার সদরদপ্তর থেকে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা বিষয়ে বিপুল সংখ্যক বই, গবেষণাপত্র, লিফলেট, পোস্টার, প্রতিবেদন প্রভৃতি প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে ইংল্যান্ডের সমাজবিজ্ঞানী ও সমাজ সংস্কারক ‘রবাট ওয়েন’ সর্বপ্রথম শ্রমিকদের দিনে আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা মনোরঞ্জন এবং আট ঘণ্টা বিশ্রামের তত্ত্ব প্রদান করলে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। শ্রমিকরা ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনুভব করে। কিন্তু বাস্তব কর্মজীবনে তার দেখা পাওয়া যায়নি। এর পেছনে কারণ হিসেবে প্রধানত দুইটি বিষয়কে উল্লেখ করা যায়, এক অধিক মুনাফা অর্জন অর্থাৎ তাঁদের নিজেদের মুনাফা অর্জনই ছিল মুখ্য বিষয়। দুই. দ্রুত শিল্পায়নের প্রসার লাভ। তাই শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের কাজের কোন সময় বেঁধে দেয়াতে রাজি ছিলেন না। সে সময় শ্রমিকদের সপ্তাহের ছয় দিনে দৈনিক ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত এমনকি এর চেয়েও বেশি সময় ধরে কাজ করতে হতো। এরফলে তাদের মধ্যে দিনে দিনে ক্ষোভ পুঞ্জীভুত হতে থাকে। শ্রমিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে আমেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে প্রবল আন্দোলন শুরু করে। তার ফলশ্রুতিতেই আজকের এই মহান মে দিবস। দেশে দেশে, সারা বিশ্বে শ্রমিকদের মধ্যে উজ্জীবনী শক্তি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মর্মে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ হোক, মহান মে দিবস অমর হোক। এই হোক সকলের ব্রত।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও প্রবন্ধকার