যাত্রীর ভাড়া বাড়িয়ে, পরিবহন আইনের সাজা কমিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে তো?

আপডেট: ডিসেম্বর ২৭, ২০২১, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু


আইনের প্রয়োগ না থাকায় সড়কে মৃত্যুর মিছিল কমছে না। বছরে বছরে জাতীয় সড়ক দিবস পালিত হয়, ‘গতিসীমা মেনে চলি, দুর্ঘটনা রোধ করি’, ‘সময়ের চেয়ে জীবন মুল্যবান’-এমন বহু শ্লোগান সামনে রেখে আলোচনা সভা, সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, লিফলেট, শোভাযাত্রা, মানববন্ধন, তীব্র প্রতিবাদ- এমনকি যানবাহন ভাংচুর পর্যন্ত হয়। কিন্তু দুর্ঘটনা কমে না। সড়ক পরিবহন আইনের বাস্তবায়ন না থাকা এবং চালক কর্তৃক যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত গতি, ট্রাফিক আইন না মানা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই তা সত্য।

২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে ৩১ হাজার ৬৯৩ টি দুর্ঘটনায় ৪৩ হাজার ৮৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৯৬ হাজার ৫১৭ জন আহত হয়েছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির জরিপ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে দুর্ঘটনা ৫ হাজার ২৮২ টি Ñ মৃত্যু ৭ হাজার ৩০৯ এবং আহত ১৬ হাজার ০৮৬। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের প্রকোপে দেশব্যাপী লকডাউনে পরিবহন বন্ধ থাকলেও ৪ হাজার ৮৯১ টি দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জনের মৃত্যু ও ১৪ হাজার ৫৬৩ জন আহত হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে নিরাপদ সড়ক করার জন্য কোনো প্রতিশ্রুতি কাজ করছে না। ২০১১-২০২১ সালকে সড়ক নিরাপত্তার দশক ঘোষণা করে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি। ধারাবাহিকভাবে তিনবারের ক্ষমতাসীন বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার তৃতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ২০২১ সালের প্রথম ৮ মাসেই বিআরটি-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ৩ হাজার ৭০১ টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৫০২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৪৭৯ জন। এ হিসেব অনুযায়ী ১২ মাসের হিসেবে দুর্ঘটনার পরিমাণ গত ৬ বছরের গড় হিসাবের কিছুটা বেশি হবে। ফলে নিরাপদ সড়কের জনদাবি ও অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের ২৮ বছরের নিরব আন্দোলন বৃথাই গেছে। পরিবহন সেক্টরের জনবিরোধী আন্দোলনের কাছে সরকার জনগণ সবাই হার মেনেছে।

এদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক্টর ও ট্রলির শ্রমিক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় পতিত হয় ৩৩ শতাংশ এবং মোটর সাইকেল, ভটভটি, নসিমন, অটোরিক্সা সিএনজি চালানোর সময় ১৭ শতাংশ দুর্ঘটনায় পতিত হয়। অন্যদিকে এসব যানবাহনের যাত্রী হিসেবে ৪২ শতাংশ এবং পথচারী হিসেবে ৮ শতাংশ দুর্ঘটনার শিকার হন। এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে মটরযানের যাত্রী ও পথচারী ৫০ শতাংশ যেমন হতাহত হয় তেমনি মটরযানের চালক হেল্পার কন্ডাক্টর শ্রমিকও ৫০ শতাংশ হতাহত হয়। এ বিষয়টি চালক মাথায় রাখলেও দুর্ঘটনা কমতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় তারা এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করে সতর্ক হয়না। এজন্য দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত পঙ্গু চালকদের ছবিসহ পরিচয় প্রতিটি পরিবহন শ্রমিকদের আস্তানায় টাঙ্গিয়ে রাখার ব্যবস্থা করলে এবং পাশাপাশি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রতিদিন সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার করলে চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর প্রবণতা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ হতে পারে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের আর একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে ১ হাজার ৬৫৩ টি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৭৫৮ জন নিহত ও ১ হাজার ১২৩ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ৭৫%এর বয়স ১৪ থেকে ৪৫ বছর এবং ৬০% দুর্ঘটনা ঘটেছে চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং উচ্চগতির মোটর সাইকেল ক্রয়, ব্যাবহার, ট্রাফিক আইন না মানা ও না জানা। দেশে এখন ৩৫ লাখ মোটর সাইকেল। এর মধ্যে ৮ লাখই ঢাকায়। ইতোমধ্যে দেশে মোটর সাইকেল তৈরির কারখানা হয়েছে এবং আগামীতে মটরসাইকেল কম দামে ও সহজে পাওয়া যাবে। সেই সাথে সাথে ব্যবহারও বাড়বে। সড়ক ও মহাসড়কের দুর্ঘটনায় মৃতের ৩০% মোটর সাইকেলের চালক ও আরোহী। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, কার ও মাইক্রোতে সিটবেল্টের ব্যবহার এবং মোটর সাইকেল চালকরা হেলমেট ব্যবহার করলে মৃতের হার ৩০/৪০ শতাংশ কমতে পারে। হয়তো তাই। কিন্তু ট্রাফিক আইন না মানলে নিয়ন্ত্রণহীন বেপরোয়া গাড়ি চালালে মৃতের সংখ্যা আদৌ কম হবেনা। এজন্য কঠোরভাবে পরিবহন আইন প্রয়োগ জরুরি।

কিন্তু তা না হয়ে যদি সে আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখানো হয়, সাজা লাঘব করা হয়- তবে দুর্ঘটনা বাড়বে বই কমবে না। পরিবহন আইন ২০১৮ তে যেসব বিষয়গুলোকে অপরাধ বিবেচনা করে শাস্তির বিধান করা হয়েছিল সেগুলোকে সরকার পরিবহন মালিক ও শ্রমিকের চাপে সংশোধন করে শাস্তির পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি কম করেছে। সেগুলো হচ্ছে- ১। ড্রাভিংলাইসেন্স এর যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় পাস এর স্থলে পঞ্চম শ্রেণি বা সমমানের পরিক্ষায় পাস .২। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান চালানোর অর্থদ-ের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকার স্থলে ১৫ হাজার টাকা ৩। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের জন্য ৬ মাসের কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদ-ের স্থলে ৩ মাসের কারাদ- বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদ-। ৪। ট্রাফিক আইন না মানার জন্য ১ মাসের কারাদ- বা ১০ হাজার টাকা অর্থদ-ের স্থলে কারাদ-ের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি এবং অর্থদ- মাত্র ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। ৫। অতিরিক্ত ওজন বহন করার জন্য ১ বছরের কারাদ- বা ১ লাখ টাকা জরিমনার স্থলে ৩ মাসের কারাদ- বা ২৫ হাজার টাকা জরিমনা। ৬। নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টির জন্য ৩ মাসের কারাদ- অথবা ১০ হাজার টাকা অর্থদ-ের স্থলে ১ মাসের কারাদ- বা ৫ হাজার টাকা জরিমনা। ৭। যত্রতত্র পার্কিং বা যাত্রী ওঠানামার জন্য ৫ হাজার টাকা জরিমনার স্থলে মাত্র ১ হাজার টাকা জরিমানা ।

পরিবহন সেক্টর একটি গণবিরোধী শক্তি হিসেবে গোটা জাতির কাছে পরিচিত। তাদের অন্যায় দাবির মুখে যাত্রীদের ভাড়া বাড়িয়ে মালিকদের এবং পরিবহন আইনের সাজা কমিয়ে শ্রমিকদের সুবিধা করে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দেওয়া ছাড়া কিছু হয়নি। তারপরেও এর শুভ পরিণতি দেখার জন্য ২০২২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া জাতির কোনো উপায় নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণের একটি অলিখিত সংস্কৃতি চালু আছে বহুকাল থেকে। তাহলো- দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যদি থানায় মামলা করতে পারে বা পুলিশ দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে মামলার ঝামেলা এড়াতে গাড়ির মালিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ২০/৩০ হাজার টাকা আর পুলিশের সেলামি দিয়ে মিমাংসা করে নেয়। এই সুবিধা অনেকে পায়, আবার অনেকে পায়না। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে সম্প্রতি একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে আইন অনুযায়ী তহবিল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হবে না কেন তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৫৩ ও ৫৪ ধারায় নিহত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ এবং আহত ব্যক্তির চিকিৎসার বিধান রয়েছে। তথাপি তা বাস্তবায়নসহ আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন ও পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হচ্ছে না কেন তা জানতে চেয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আইন সচিব, অর্থ সচিব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অবহিত করেছে হাইকোর্ট। এ পর্যন্ত এ রুলের জবাব পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ ইতোমধ্যে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট থেকে জানা গেছে পঙ্গু ভিক্ষুকদের প্রায় ৮২ শতাংশই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার এবং তাদের মাত্র ১২ শতাংশ চিকিৎসার জন্য সামান্য সহযোগিতা পেয়েছেন। তাই মানবিক দিক থেকেও তহবিল গঠন জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক