যা দেখি, সেটাই আমি : ওলগা তোকারজুক

আপডেট: অক্টোবর ১২, ২০১৯, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

অনুবাদ : আবীর আদনান


ওলগা তোকারজুক এ বছর ২০১৮ সালের সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। এক কথায় তার লেখালেখির মর্ম ও মজ্জায় আছে মানুষের সীমা অতিক্রমের গল্প। তার লেখার বিষয় এবং শৈলী নিয়ে দ্য আইরিশ টাইমসে প্রকাশিত মাইকেল ক্রোনিনের নিবন্ধের অংশবিশেষ বাংলায় অনুবাদ করেছেন আবীর আদনান।
পোল্যান্ডের একটি হাসপাতালের ওয়েটিং রুম। সেখানে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এসেছেন এই সময়ের অন্যতম লেখক ওলগা তোকারজুক। তিনি কিভাবে চিন্তা করেন সে বিষয়ে আমাকে বলেন, এই মহাবিশ্ব, পৃথিবী কিংবা ছোট অণু-পরমাণু সম্পর্কে আমরা বেশ ভালোই জানি। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের দেহ বা আত্মা সম্পর্কে বেশ কম জানি। আমরা আমাদের ভেতরকার ক্ষুদ্রবিশ্ব সম্পর্কে প্রায় জানিই না।
এই ধরনের চিন্তা অযৌক্তিক নয়। ‘ফ্লাইটস’ উপন্যাসের জন্য গত বছর ম্যান বুকার এবং ২০১৮ সালের নোবেল বিজয়ী ওলগার মনটাও তার একক এবং স্বতন্ত্র গদ্যের মতো চটপটে। ‘ফ্লাইটস’-এর পাঠকদের তিনি ১৭ শতকের ফ্লান্ডার্স (বেলজিয়ামের উত্তরের একটি শহর) থেকে ১৮ শতকের ভিয়েনা এবং সেখান থেকে ১৯ শতকের প্যারিসে নিয়ে গিয়েছেন। যদিও এর মধ্যে আলোচনা করেছেন দেহের বিভিন্ন অংশ সংরক্ষণের কৌশল থেকে শুরু মনঃসমীক্ষণ নিয়ে তার ভেতরকার ভ্রমণের আবির্ভাবের কথা-‘যা দেখি, সেটাই আমি’।
ইংরেজিতে সাম্প্রতিক কালে অনূদিত তার উপন্যাস ‘ড্রাইভ ইওর প্লাও ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড’-এ আমরা দেখি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘ইয়ানিনা দুসেইকো’ চেক রিপাবলিকের কাছেই বসবাস করে, এবং সে খুব নিয়মিত বর্ডার ক্রস করে, বলে-এটা আমাকে খুব আনন্দ দেয়, কারণ একটি সময় ছিল যখন এটা সম্ভব ছিল না। বারবার দেশের সীমানা পার হতে আমার খুব ভালো লাগে।
কথা প্রসঙ্গে তোকারজুক তার সাহিত্যিক প্রেরণা হিসেবে স্ট্যানলি কুবরিকের নাম যখন উচ্চারণ করেন তখন একজন পরিচালকের মধ্যে তিনি কিভাবে প্রেরণা খুঁজে পান সে বিষয়ে আমরা না গিয়ে তোকারজুকের সৃজনশীলতা প্রসঙ্গে কথা শুনি। তিনি বলেন, ‘সৃজনশীলতা বলতে আমি বুঝি আগের চেয়ে নতুন উপায়ে, সব সময়ে, নিজেকে অতিক্রম করে নতুন কিছু বলা। ইতোমধ্যেই যা করে ফেলেছেন বা লিখে ফেলেছেন সেটাকে আমি সৃজনশীলতা মনে করি না। নতুন বিষয়, নতুন রীতি নিয়ে সব সময় এগিয়ে যাওয়া উচিত।’
তোকারজুক ১৯৬২ সালে পোল্যান্ডের সুলেখুফে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তার ‘হাউস অব ডে, হাউস অব নাইট’ উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি ইংরেজি ভাষার পাঠকদের নজরে আসেন। প্রথম দিকে এই উপন্যাসটি পাঠকদের বিরক্ত করেছিল এর স্বতন্ত্র রীতির জন্য। যে রীতির নামকরণ করা হয়েছে ‘কনস্টেলেশন’। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই শব্দটি থাকলেও তোকারজুকের আগে সাহিত্যে এই রীতি ছিল না। ‘কনস্টেলেশন’ রীতিতে লিখে বিষয় ও প্রকরণের যত নিরীক্ষা করেছেন, এসব লেখার গভীরে প্রবেশ করলে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় মানুষের গভীর নৈতিক মূল্যবোধ ও দুর্বলতা নিয়ে বিশ্লেষণ।
‘ড্রাইভ ইওর প্লাও ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড’ বইটিকে তোকারজুক ব্যথার বই বলে অভিহিত করেছেন। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইয়ানিনাকে দেখানো হয় প্রাণীদের মুখপাত্র হিসেবে। তোকারজুক বলেছেন, ইয়ানিনা হল সেইসব নির্বাক প্রাণীদের মুখপাত্র যাদের ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা আছে।
লেখালেখির শুরুর দিকে, এক পার্টিতে একজন সৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়, তখনই তার মাথায় ‘কনস্টেলেশন’ রীতিতে লেখার আইডিয়া আসে।
যা হোক, তোকারজুকের ইয়ানিনাকে আমরা আকাশের তারায় উৎসাহী দেখলেও তাকে পাওয়া যায় প্রাণীর প্রতিনিধি হিসেবে, যে তাদের অব্যক্ত কথাগুলো বলে।
এই উপন্যাসটি কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমা বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হওয়ার পর নিন্দার ঝড় ওঠে। পোলিশ গণমাধ্যম বলে, উপন্যাসটি গভীরভাবে অ্যান্টি-ক্রিস্টিয়ান, যা ইকো-সন্ত্রাসবাদকে প্রমোট করে।
তার অতি সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘দ্য বুকস অফ জ্যাকব’। উপন্যাসটির মূল উপজীব্য খ্রিস্টান ধর্মে বর্ণিত ইহুদি নেতা জ্যাকব লেইবোউইজ ফ্র্যাঙ্কের ইতিহাস এবং ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের মধ্য দিয়ে জ্যাকবকে ইয়াকুব হওয়ার যে ভ্রমণ সেটা। উঠে এসেছে ১৮ শতকের পোল্যান্ডও। তিনি সমালোচনা করেছেন ধর্মীয় অন্ধত্বকে।
পোল্যান্ডে একজন ভুক্তভোগী হিসেবে তার জীবন যেসব সমস্যার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, এবং তার লেখায় সেসব সম্পর্কে তার সমালোচনা এবং মন্তব্য, যা ডানপন্থী ও চরমপন্থীদের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হুমকি হয়েছিল তার জন্যও, যে কারণে তাকে সশস্ত্র দেহরক্ষী নিযুক্ত করতে হয়েছিল।
তোকারজুক বলেছিলেন তার ‘দ্য বুকস অফ জ্যাকব’-এর বিক্রি প্রমাণ করে পাঠকরা প্রাচীন পোল্যান্ড এবং প্রাচীন জীবন নিয়ে কেমন নস্টালজিক। প্রসঙ্গক্রমে, শুধুমাত্র পোল্যান্ডে বইটি ১ লক্ষ ৭০ হাজার কপির বেশি বিক্রি হয়েছিল।
তার লেখায় পোল্যান্ড প্রতিনিধিত্ব হয় এভাবে- আমরা পোল্যান্ড থেকে হারিয়ে যাওয়া বহুজাতিক অঞ্চলগুলোর জন্য এক ধরনের যন্ত্রণা অনুভব করি। আমাদেরকে কমিউনিস্টদের বিপরীতে নানা প্রকল্পের ছাঁচে ফেলে দাঁড় করানো হয়েছে।
খাঁটি পোলিশ ও বিশুদ্ধ রক্তের মতো কিছু নেই। আমরা এখানে একইসাথে ইউরোপের করিডোরে, মঞ্চে এবং কেন্দ্রে বাস করছি। তবে জাতিগতভাবে আর খাঁটি হওয়া অসম্ভব।
(বাংলাট্রিবিউন এর সৌজন্যে)