যিশুর জন্মোৎসব বড়োদিন সার্বজনীন

আপডেট: ডিসেম্বর ২৫, ২০২১, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

মিথুশিলাক মুরমু


প্রভু যিশুর জন্মদিনকে বাংলায় ‘বড়োদিন’ আখ্যায়িত করা হয়েছে। কবিগুরু ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৩২ শান্তিনিকেতনে বসে লিখেছিলেন-‘…আজ পরিতাপ করবার দিন, আনন্দ করবার নয়। আজ মানুষের লজ্জা সমস্ত পৃথিবী ব্যাপ্ত ক’রে। আজ আমাদের উদ্ধত মাথা ধুলায় নত হোক, চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে যাক। বড়োদিন নিজেকে পরীক্ষা করবার দিন, নিজেকে নম্র করবার দিন।’ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যর্থাথই বলেছেন, বড়োদিন নিজেকে পরীক্ষা করবার দিন। পবিত্র বাইবেল-এ পাওয়া যায়, ঈশ্বর পৃথিবীর মানুষকে শয়তানের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার লক্ষে মানুষের ভাষায় বোঝাতে মানবরূপ ধারণ করেছেন। আমাদেরকে রক্ষার্থে তিনি নিজেকে শতভাগ মানুষে পরিণত করলেন। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষকে কাছে পেতে স্বর্গ থেকে নেমে আসলেন এটির চেয়ে বড়ো পরীক্ষা আর কী হতে পারে! প্রটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের জনক মহাত্মা মার্টিন লুথার লিখেছেন“পুরাকালে সীনয় পর্বতে ঈশ^র এসেছিলেন প্রচণ্ড ভয়ভীতিকে সহবর্তী করে, কিন্তু এখন তিনি এসেছেন করুণার আধার ও ক্ষমা সুন্দররূপ নিয়ে। সীনয় পর্বতে বজ্রবির্ঘোষ ও বিদ্যুতের চোখ ধাঁধানো বিচ্ছুরণের মধ্যে আবির্ভূত ঈশ্বরকে অবশ্যই ভয় করতে হয়েছিল, কিন্তু এখন তিনি এসেছেন প্রশংসা ভরা স্তবস্তুতি ও ঐশ্বরিক গৌরবগাঁথা নিয়ে। সেদিন ঈশ্বর সদাপ্রভুর সাক্ষাতে সীনয় পর্বতে কম্পমান হয়েছিল এবং বজ্রকণ্ঠে এই কথা তিনি বলেছিলেন, ‘যে কেহ এই পর্বত স্পর্শ করিবে তার মৃত্যু নিশ্চিত’। কিন্তু এখন তিনি ঘোষণা করছেন, ‘হে সিয়োন কন্যা, ভয় করিও না; ঐ তোমার রাজা আসিতেছেন’। সেদিন ঈশ্বরের আবির্ভাব তুরীধ্বনি সহকারে ঘোষিত হয়েছিল, আর আজ তিনি এখানে দাঁড়িয়ে জেরুসালেমের জন্য অশ্রু বিসর্জন করছেন। সেদিন ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর শুনে ইসরায়েল সন্তানেরা ইতস্ততঃ পালিয়ে গিয়েছিল। আর আজ ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য আমাদের অদম্য আকুলতার কোন নিবৃত্তি নেই।”
প্রভু যিশুর জন্মে আকাশ-পাতাল-স্বর্গ আন্দোলিত হয়েছিলো। স্বর্গের দূত, মাঠের রাখাল, পূর্বদেশীয় পণ্ডিতগণ আনন্দিত হয়েছিলেন, নিরানন্দে আতংকিত হয়ে উঠেছিলেন রাজ্যের রাজা হেরোদ। তাঁর জন্মের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, নতুন আদর্শ ও ভাববাণীর পূর্ণতা সম্পন্ন হয়েছে। প্রভু যিশুখ্রিস্ট একমাত্র ব্যক্তি যিনি পৃথিবীর মানুষকে অনন্ত জীবনের বাণী শুনিয়েছেন, স্বর্গীয় পিতার বাড়িতে বসবাসের সুযোগের কথা জানিয়েছেন। পৃথিবীর রাজারা দেশ জয় করেছেন, রাজ্যের পর রাজ্য করায়ত্ব করে প্রাধান্য বিস্তার করেছেন, রাজার ধর্মকে রাজ্যের ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন কিন্তু প্রভু যিশুখ্রিস্ট প্রেমের বাণী, ভালোবাসার কথা এবং পরাক্রমি কাজ দেখিয়ে শান্তির রাজ্য প্রতিষ্ঠার অনুঘটক হয়েছেন। প্রভু যিশুর অহিংস পথ ধরেই মহাত্মা গান্ধী, রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্বনন্দিত হয়েছেন।
প্রভু যিশু খ্রিস্ট যে রাজাদের রাজা, মহান রাজা সেটি পবিত্র বাইবেলে প্রমাণিত হয়েছে। আমি, আমরা যদি খ্রিস্টের অনুসারী হয়ে থাকি, তাহলে বিশ্বাস করতে হবে যে, আমাদের প্রভু যিশু খ্রিস্ট তাঁর দ্বিতীয় আগমণের পর এই পৃথিবীর উপর রাজা হবেন। তাঁর রাজত্ব সম্পর্কে পবিত্র বাইবেলে পাওয়া যায়।

স্বর্গদূত গাব্রিয়েল

তিনি মহান হইবেন, আর তাঁহাকে পরাৎপরের পুত্র বলা যাইবে; আর প্রভু ঈশ্বর তাঁহার পিতা দায়ূদের সিংহাসন তাঁহাকে দিবেন; তিনি যাকোব কূলের উপরে যুুগে যুগে রাজত্ব করিবেন, ও তাঁহার রাজ্যের শেষ হইবে না (লূক ১: ৩২-৩৩)।

যীশু …

কোন দিব্যই করিও না…আর যিরূশালেমের দিব্য করিও না, কেননা তাহা মহান রাজার নগরী (মথি ৫:৩৪-৩৫)।

যিরমিয়

সদাপ্রভু কহেন, দেখ, এমন সময় আসিতেছে, যে সময়ে আমি দায়ুদের বংশে এক ধার্মিক পল্লব উৎপন্ন করিব; তিনি রাজা হইয়া রাজত্ব করিবেন, বুদ্ধিপূর্ব্বক চলিবেন এবং দেশে ন্যায়বিচার ও ধার্ম্মিকতার অনুষ্ঠান করিবেন। তাঁহার সময়ে যিহুদা পরিত্রাণ পাইবে, ও ইস্রারায়েল নির্ভয়ে বাস করিবে, আর তিনি এই নামে আখ্যাত হইবেন, ‘সদাপ্রভু আমাদের ধার্ম্মিকতা’ (যিরমিয় ২৩:৫-৬)।

সখরিয়

আর সেইদিন তাঁহার চরণ সেই জৈতুন পর্ব্বতের উপরে দাঁড়াইবে…আর সদাপ্রভু সমস্ত দেশের উপরে রাজা হইবেন; সেইদিন সদাপ্রভু অদ্বিতীয় হইবেন, এবং তাঁহার নামও অদ্বিতীয় হইবে (সখরিয় ১৪: ৪, ৯)।

পৌল

কেননা তিনি (ঈশ্বর) একটি দিন স্থির করিয়াছেন, যে দিনে আপনার নিরূপিত ব্যক্তি দ্বারা ন্যায়ে জগৎ সংসারের বিচার করিবেন; এই বিষয়ে সকলের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিয়াছেন, ফলতঃ মৃতগণের মধ্য হইতে তাঁহাকে উঠাইয়াছেন (প্রেরিত ১৭: ৩১)।
মহান রাজার জন্মের সংবাদ সমাজের নিম্নস্তর থেকে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে স্বর্গ পর্যন্ত পৌঁছেছিলো। সমাজের অবহেলিতদের সারিতে জন্মিয়ে কুলীনদেরও আকৃষ্ট করেছেন, তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই পৃথিবীর জ্ঞানী-গুণিরা খুঁজে পেয়েছেন সত্যিকার শান্তির মোক্ষম অধ্যায়। প্রভু যিশু খ্রিস্ট শহরের বড় রাস্তায় লোকজনের ভিড়ের সঙ্গে চলাফেরা করতেন, লোকদের বাড়ি বাড়ি খেতেন, অসংখ্য লোকদের শিক্ষা দিতেন এবং আরোগ্য করতেন, শিশুদেরকে আনন্দ দিতেন। তাঁর প্রতিটি শিক্ষায় মানুষজন আশ্চর্যজ্ঞান করত। তাঁর পরাক্রমী শিক্ষার মধ্যে দিয়ে জনসাধারণের মধ্যে একটি পরিবর্তন, চেতনা, আদর্শ ও বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিলেন। অধ্যাপকেরা, শাস্ত্রজ্ঞরাও ধারণা করেছিলেন এই ব্যক্তি সাধারণ কোনো ব্যক্তি নন; সদ্দুকী-ফরিশীরা তাঁর কথায় হতজ্ঞান হতেন। তাঁর জ্ঞান ও বিচক্ষণতার কাছে পরাজিত হয়ে স্বীকার করেছেন সত্যিই তিনি অসাধারণ। তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন তা মানবজাতির জন্য, তিনি যে আদর্শ দেখিয়েছেন সেটি সমগ্র পৃথিবীর জন্যে এবং তিনি যে শান্তির পথের সূচনা করেছেন সেটি আমাদের অনুকরণীয়ের জন্যেই। তাইতো তিনি রাজা, তাইতো তিনি মন্ত্রী, পিতা ও ঈশ্বর। প্রভু যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন বড়দিন আমাদের জীবনে নিয়ে আসুক অনাবিল আনন্দ, ভালোবাসা, সাম্য-সম্প্রীতি ও শান্তি-সৌহার্দ্য আর ক্ষমা। শুভ বড়দিন।
লেখক: সংবাদকর্মি