যীশুর পুরুত্থান : নতুন হওয়ার আহ্বান

আপডেট: এপ্রিল ৪, ২০২১, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

ফাদার প্যাট্রিক গমেজ:


খ্রীষ্টবিশ্বাসের কেন্দ্রিয় রহস্যাবৃত ঘটনাটি হল যীশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থান। পুনরুত্থান করেই যীশু মৃত্যুর উপর জয় ঘোষণা করেছেন, পুনরুত্থান করেই বিজয়ীর কণ্ঠে যেন যীশু বলছেন: ‘হে মৃত্যু ! হে কবর ! তোমার জয় কোথায় হল?’ আমরা বলতে পারি যে, কবর যীশুকে ধরে রাখতে পারে নি; মৃত্যু যীশুকে মৃত ক’রে রাখতে পারে নি। যীশুর মৃত্যু শুধু মনুষ্যপুত্রের দেহাবশেষ নয়, তাঁর মৃত্যু গোটা মানবজাতির পাপময়তার মৃত্যু। পাপের ফলে যে স্বর্গের দুয়ার হয়ে গিয়েছিল রুদ্ধ, যীশুর মৃত্যুর সাথে সাথেই মন্দিরের পর্দা খুলে গেল, রুদ্ধ দুয়ার খুলে গেল। যীশুর পুনরুত্থান তথা যীশুর পুনরুত্থিত অবস্থা, গৌরবান্বিত অবস্থা গোটা মানব জাতিকে করেছে পুনরুত্থিত, গৌরবান্বিত।
যীশুর পুনরুত্থান একটি ঐতিহাসিক সত্য: মাগদালার মারীয়া ও অন্য মারীয়া রবিবার দিন ভোরে যীশুর কবরে যান। দেখতে পান শুন্য কবর। শুভ্র পোষাক-পরা একটি যুবক ডান দিকে বসা। তিনি তাঁদের বলেন : “নাজারেথের যীশু পুনরুত্থিত হয়েছেন, তিনি এখানে নেই।” শুণ্য কবর ও যুবকের এই বাণী হল যীশুর পুনরুত্থানের ঐতিহাসিক সত্যতা। পুনরুত্থানে বিশ্বাসী মারীয়া ছুটে যায় শিষ্যদের কাছে এই পুনরুত্থান-সংবাদ অবগত করতে। শুণ্য কবর যেন মারীয়ার অন্তরে দিয়েছিল এক তাগিদ, একটি জোর আহবান: এই পুনরুত্থান সংবাদ তাঁকে ঘোষণা করতেই হবে। আর মারীয়া তক্ষণই তা করেন; হয়ে উঠেন প্রথম পুনরুত্থানের বার্তা-বাহক (মর্ক ১৬:১-৭)।
জীবন-ঘটনা-অবস্থা একটি আহবান : প্রতিটি মানুষের জীবনে, কোনো পরিবারে, কোনো সমাজে, কোনো দেশে এমন কী এই পৃথিবীতে যখন কোনো কিছু ঘটে, হোক তা সুখময় বা দুঃখময়, পুণ্যময় বা পাপময়, ্আশাব্যঞ্জক বা নৈরাশ্যকর, তিক্ত বা সর্বনাশা, আনন্দময় বা বিষাদময়, সেই ঘটনাটিকে বা সেই অবস্থাটিকে আমরা যদি একটু মনোযোগী হয়ে, ধ্যানমগ্ন হয়ে, গঠনমূলক মনোভাব নিয়ে পর্যালোচনা করি; অন্তরের গহণে ধারণ ক’রে সার্বিকভাবে বিবেচনা করি, তখন আমরা/আমি অবশ্যই অন্তরে একটি তাগিদ অনুভব করব যদি সচেতন থাকি। অন্তরে একটি ডাক শুনতে পাই। সেই ঘটনা বা অবস্থা যেন হয়ে উঠে একটি আহ্বান : পরিত্যাগ বা গ্রহণ করার আহ্বান বা হয়ে উঠার বা হওয়ার আহ্বান।
কভিড ১৯: একটি উদাহারণ : ‘করোনা ভাইরাস’ আহবান জানালো, তাগিদ দিল/দিচ্ছে: নিজেকে রোগমুক্ত রাখার জন্য সচেতন হতে: মাস্ক ব্যবহার করতে, হাত ধোয়া, হ্যান্ড সেনিটাইজার ইত্যাদি ব্যবহার করতে। অন্যকে ক্ষতি না করতে; তাই সামাজিক দূরত্ব। আমি রোগ দেব না; তুমিও আমাকে দিবে না। করোনা আহবান জানায় শান্ত, সুস্থ ও নিরাপদে থাকতে, ঘরে নিরাপদে থাকতে, পারিবারিক বন্ধনকে অধিকতর দৃঢ় করতে; পারিবারিক প্রার্থনা করার আহ্বান জানায় এই করোনা! অতি ব্যস্ততা মানুষকে workaholic করে তোলে। বর্তমানের করোনা-আহ্বান হল টিকা নেবার আহ্বান। এইভাবে আরো দেখি, একজন কঠিন রোগ থেকে সুস্থ হয়েছে। তাগিদ আসে তার কাছে যেতে; আনন্দ করতে। এবং আরো অনেক জীবন কেন্দ্রিক উদাহরণ টানতে পারি।
যীশুর পুনরুত্থান : একটি আহ্বান, একটি তাগিদ : যীশুর পুনরুত্থান হল পাস্কা যার বাইবেলীয় অর্থ ‘লাফিয়ে পার হওয়া’। ই¯্রায়েল জাতি মোশীর নেতৃত্বে লোহিত সাগর পার হয়ে মিশরীয় দাসত্ব থেকে রেহাই পেয়েছিল; সাগর পার হয়ে নতুন দেশে পদার্পণ করেছিল। যীশুর পুনরুত্থান এই ঘটনারই পূর্ণতা। যীশুর পুনরুত্থানে গোটা মানব জাতি পাপের রাজ্য থেকে পেয়েছে নতুন জীবন। তাঁর নতুন জীবনে মানব জাতি পেয়েছে নতুন জীবন। প্রশ্ন : যীশুর পুনরুত্থান ঘটনা, পুনরুত্থার মহোৎসব আমাকে/আমাদেন কী আহ্বান জানায় ?
যীশুর পুনুরুত্থান : নতুন জীবনের আহ্বান ঈশ্বরের পরিকল্পনা মতেই যীশুর মৃত্যু ও যীশুর পুনরুত্থান। ঈশ্বরের পরিকল্পনা হল মানুুষের হারানো মর্যাদাকে ফিরিয়ে আনা; মানুষকে পরিত্রাতা করে আবার তাকে তাঁর সান্নিধ্যে নিয়ে আসা। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হল যীশুর পুনরুত্থান ঘটনায়। যীশুর পুনরুত্থান গোটা মানব জাতির পুনরুত্থান। অতএব প্রতিটি বছর পুনরুত্থান বা পাস্কা মহোৎসব আমাদেরকে ‘পুনরুত্থিত’ হবার তাগিদ দেয়; নতুন হবার আহ্বান জানায়। আসুন চিহ্নিত করি সেই আহ্বান :
ক্স আর নয় কবরে পড়ে থাকা; পাপের গহ্বরে পড়ে থাকা। পাপমুক্ত নবজীবন শুরু করার আহবান;
ক্স শুণ্য কবর দেখার আহ্বান: প্রত্যেকেই যেন অভিজ্ঞতা করি ‘শুণ্য কবর’ দেখার। মৃত্যুঞ্জয়ী যীশুর অভিজ্ঞতা করি। আমার সত্য-সুন্দর জীবন হোক পুনরুত্থিত যীশুর আবাস। আমার পরিবার হোক পুনরুত্থিত যীশুর আবাস।
ক্স চেতনায় অন্তর-বাহিরে নতুন হওয়ার আহ্বান: পুরাতনের বদ অভ্যাস ত্যাগ; অসৎ চিন্তা বর্জন, অসৎ কামনা-বাসনা, ষড়যন্ত্র, ফন্দি-ফিকির, আত্মঅহম, স্বার্থপরতা, বৈষম্য; পদলেহন, পক্ষপাতিত্ব, সুপ্ত বা সূক্ষ¥ রাজনীতি-কূটনীতি, প্রশাসনিক দাম্ভিকতা, অন্যায় অন্যায্যতা উল্লিখিত মন্দগুলো হল বর্তমান যুগের ‘ভাইরাস’ যা করোনা ভাইরাসের চাইতেও মারাত্মক। এগুলো ত্যাগ করে একেবারে যীশুর নতুন জীবনে নতুন হওয়ার আহ্বান। অতএব এবারের পুনরুত্থান এসব মন্দ ভাইরাস নির্মূল করার আহবান। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনৈতিক এই ভাইরাসগুলোকে নির্মূল করে পুনরুত্থিত যীশুর সাথে যেন হতে পারি পুনরুত্থিত।
ক্স আর যদি পুনরুত্থিত যীশুতে আমিও হই পুনরুত্থিত, তবে আমার/আমাদের কাছে আহ্বান আসে, তাগিদ আসে সেই যীশুর পুনরুত্থান ঘটনা মাগদালার মারীয়ার মত তা প্রথমে নিজেেেদর কাছে (পরিবারে, সমাজে, ম-লীতে) এরপর অন্যদের কাছে (আন্তঃধর্মীয়) প্রচার করা: উপাসনায় অংশ গ্রহণ একটি প্রচার; একত্রে অভিনয় করে যীশুর দুঃখভোগ ও মৃত্যু প্রচার; অভিনয় করে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে যীশুর পুনরুত্থান প্রচার; সর্বোপরি নিজ জীবনসাক্ষ্য দ্বারা তথা পরিবর্তিত জীবন, মিলন, শান্তি-সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা, এমন আরো নিত্য দিনের নতুনত্ব দ্বারা যীশুর পুনরুত্থান, নিজ জীবনের ‘পুনরুত্থান’ প্রচার করার আহ্বান।
পহেলা বৈশাখ ও পুনরুত্থান উৎসব: ক’দিন পরেই (১৪ এপ্রিল) বাংলা নতুন বছর শুরু হবে। পহেলা বৈশাখ তো নতুন হওয়ার আহ্বান জানায়। জীর্ণপুরাতন নিপাত যাক; ঝরে মুছে যাক পুরাতন সব; বৈশাখে নতুন পাতার মতই জীবন হোক নতুন। এটাই তো বৈশাখের আহ্বান। আসুন, যীশুর পুনরুত্থানে, পহেলা বৈশাখে নতুন হওয়ার আহ্বান শুনি। নতুন হই অন্তর-বাহিরে, জীবন সাক্ষ্যে দিন দিন প্রতিদিন। যীশুর পুনরুত্থান উৎসব এভাবেই হয়ে উঠুক নিত্য দিনের মহোৎসব। “যীশুর পুনরুত্থান, নতুন হওয়ার আহ্বান” -…এই শ্লোগানটি হোক নিত্য দিবসের শ্লোগান, নিত্য দিনের আহ্বান। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান সবাইকে পাস্কা মহোৎসবের শুভেচ্ছা জানাই।
লেখক: ক্যাথলিক ধর্মযাজক, সেন্ট আন্তনী চার্চ, মহিপাড়া, দুর্গাপুর-রাজশাহী ও আহবায়ক, খ্রীষ্টিয় ঐক্য ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপ কমিশন, রাজশাহী ক্যাথলিক ডায়োসিস