যুক্তরাষ্ট্রে বাইডেন যুগের শুরু

আপডেট: জানুয়ারি ২১, ২০২১, ১:৫৭ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


স্ত্রী জিল বাইডেনকে পাশে রেখে শপথ নেন জো বাইডেন। ছবি: রয়টার্স

নানা অঘটন ঘটিয়ে মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প; যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন জো বাইডেন।
করোনাভাইরাস মহামারীকালে ওয়াশিংটন ডিসিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যে বুধবার বাইবেলে হাত রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বাইডেন।
সমসাময়িককালে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন সঙ্কটকালে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বয়সী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন এই ডেমোক্র্যাট নেতা।
তার সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন কমলা হ্যারিস। যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট; দেশটির প্রথম কালো এবং প্রথম এশীয় বংশোদ্ভূত ভাইস প্রেসিডেন্টও তিনি।
হার না মানা বাইডেন হোয়াইট হাউজে
ক্যাপিটল ভবন প্রাঙ্গণে লেডি গাগার পরিবেশনায় জাতীয় সঙ্গীতের পর শপথের মঞ্চে আসেন কমলা হ্যারিস; তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারক সোনিয়া সোটোমেয়ার।
এরপর জেনিফার লোপেজের গানের পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ; শপথ নিতে দাঁড়ান বাইডেন। তাকে শপথ পড়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস। শপথ নেওয়ার সময় যে বাইবেলে হাত ছিল বাইডেনের তা তার পরিবারের এবং ১২৭ বছরের পুরোনো।
শপথ নেওয়ার পর অভিষেক ভাষণে ঝঞ্ঝামুখর সময় পেরিয়ে আশার বাণী শোনান নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।
তিনি বলেন, “আজ আমেরিকার দিন, গণতন্ত্রের দিন, ইতিহাস গড়া আর প্রত্যাশার দিন, নবসূচনা আর ক্ষত নিরাময়ের দিন।”
ট্রাম্প জমানায় গড়ে ওঠা বিভেদের প্রাচীর ভেঙে ঐক্যের ডাকও দিয়েছেন বাইডেন।
সামনে এগিয়ে যেতে সবাইকে পাশেও চেয়ে বলেছেন, “আমরা আমেরিকার নতুন ইতিহাস রচনা করব। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সব সময় আপনাদের পাশে থাকব।
“আমরা অনেক দূর এগিয়েছে। আরও এগোতে চাই। আমরা এক হলে আরও ভালো কাজ করতে পারি। আমাদের অনেক ক্ষত মেরামতের প্রয়োজন আছে। অনেক কিছু গড়ার আছে।”
পাশে থাকা নতুন ফার্স্টলেডি জিল বাইডেনের উদ্দেশে বাইডেন বলেন, “আমার এই সফরে তোমার সঙ্গ পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আসা পঞ্চদশ ভাইস প্রেসিডেন্ট হলেন বাইডেন।
যার সঙ্গে বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সামলেছিলেন, সেই বারাক ওবামাও ছিলেন অভিষেক অনুষ্ঠানে।
বিবিসি জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে সাবেক প্রেসিডেন্টদের বিল ক্লিনটন উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে নিয়ে। অংশ নেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশও।
বিদায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স উপস্থিত থাকলেও ছিলেন না বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দেড়শ বছরের মধ্যে এই প্রথম বিদায়ী প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতেই হল নতুন প্রেসিডেন্টের অভিষেক।
নির্বাচনের ফল মানতে নারাজ ট্রাম্প আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে যাবেন না।
বাইডেন যখন হোয়াইট হাউজের নতুন বাসিন্দা হতে শপথের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ট্রাম্প তখন হোয়াইট হাউজ ছেড়ে ছিলেন মেরিল্যান্ডে অ্যান্ড্রুস বিমান ঘাঁটিতে।
সেখানেই তিনি তার বিদায়ী আয়োজন সারেন। সংক্ষিপ্ত এক ভাষণে তিনি নতুন প্রশাসনের সাফল্য কামনা করলেও একবারের জন্য বাইডনের নাম নেননি।
‘আমরা আবার ফিরে আসব’- বলে সেই ভাষণ শেষ করে স্ত্রীকে নিয়ে ফ্লোরিডার পাম বিচে রওনা হন ট্রাম্প।
আমেরিকাকে ডুবিয়ে বিদায় হলেন ট্রাম্প
নানা সমালোচনার মধ্যে এক মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর এই আবারও প্রেসিডেন্ট হতে ভোটে ছিলেন ধনকুবের ট্রাম্প; গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার সেই সাধ ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়ছিলেন তিনি।
ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ক্ষমতা না ছাড়তে অনেকটা গোঁয়ারের মতো অবস্থান নিয়েছিলেন ট্রাম্প। আদালতে গিয়ে হালে পানি না পেয়ে সমর্থকদের প্ররোচিত করছিলেন ট্রাম্প; আর তাতেই ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কলঙ্কজনক এক অধ্যায়ের সূচনা।
গত ৬ জানুয়ারি কংগ্রেসে বাইডেনের বিজয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার দিনে বিক্ষুব্ধ ট্রাম্প সমর্থকরা ক্যাপিটল ভবনে নজিরবিহীন হামলা চালায়। তাতে নিহত হয় পাঁচজন।
এরপর বাইডেনের অভিষেকেও ট্রাম্প সমর্থকদের বাধার আশঙ্কায় ওয়াশিংটন ডিসি নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে ফেলা হয়। পথে পথে অবস্থান নেয় সেনারাও।
যা দেখে সাংবাদিক ক্যাথি কে সিএনএনকে বলেন, “২০০১ সালে নাইন-ইলেভেনের সময়ও আমি এখানে ছিলাম, কিন্তু এমন পরিস্থিতি দেখিনি। রাস্তায় সাঁজোয়া যান, টহলে সশস্ত্র সেনা সদস্য, আগে কখনও দেখিনি।”
বিবিসি জানিয়েছে, ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীর ২৫ হাজার সেনা ছিল অভিষেক অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার দায়িত্বে।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার সঙ্গে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রিত। ক্যাপিটলের মলে বরাবরের মতো মানুষের উপস্থিতি ছিল না; সেই অনুপস্থিতি ঢাকা হয় পতাকা সাজিয়ে।
দুই সপ্তাহ আগে এই ক্যাপিটল হলে নৈরাজ্য মেনে নিতে পারেননি ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির অনেক নেতাও। যার কারণে রিপাবলিকান অনেকের ভোটে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হন ট্রাম্প।
রেকর্ড গড়া দুইবার অভিশংসিত ট্রাম্প বিদায় বেলায় বলেছেন যে আবার ফিরবেন; তবে প্রতিনিধি পরিষদের সিদ্ধান্ত সেনেটেও থাকলে ট্রাম্পের সেই আশা আর কখনও মিটবে না।
ট্রাম্প ফেরা অনিশ্চিত হলেও অনেক জঞ্জাল নিশ্চিত চাপিয়ে দিতে পেরেছেন নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাঁধে।
করোনাভাইরাসে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি, মহামারীর ধাক্কায় নাজুক অর্থনীতি, ভেঙে পড়া পররাষ্ট্র নীতি আর দেশে বিভেদের যে বীজ তিনি রেখে গেছেন, তা সামাল দিতে হবে এখন ‘বুড়ো’ বাইডেনকে।
মহামারীতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি নাজেহাল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ রোগের সংক্রমণ এবং মৃত্যু উভয় তালিকাতেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এক নম্বরে। মহামারী মোকাবেলায় ট্রাম্প প্রশাসন রেখে গেছে লেজেগোবরে এক অবস্থা।
আর ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বলে প্রেসিডেন্ট হওয়া ট্রাম্প বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নামিয়ে গেছেন অনেকটাই নিচে। ফলে সেদিক সামলে ওঠাও বড় চ্যালেঞ্জ বাইডেনের সামনে। আর প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম টুইটে তিনি বলেছেন, তার হাতে নষ্ট করার মতো সময় একেবারে নেই।
বন্ধুর এক পথে যাত্রা শুরুর অপেক্ষায় বাইডেন
ট্রাম্প জমানায় ডুবিয়ে দেওয়া সেই আমেরিকাকে তুলতে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ১৫টি অগ্রাধিকার মূলক কাজ করতে যাচ্ছেন বাইডেন।
অভিষেকের আগেই এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, যে ১৫টি নির্দেশে তিনি সই করছেন, তার অন্তত ৬টিই থাকছে অভিবাসন নিয়ে।
যার মধ্যে প্রথমত, ট্রাম্প যে সাত মুসলিম প্রধান দেশের মানুষের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার পথ বন্ধ করেছিলেন, সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন বাইডেন। মেক্সিকো সীমান্তের দেয়াল নির্মাণ বন্ধ করবেন। দেশে অবৈধ অভিবাসীদেরকে বৈধতা দিতে একটি ইমিগ্রেশন বিলও ঘোষণা করবেন।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফেরার কাজটিও শুরুতেই করতে চান বাইডেন।
বাইডেনের প্রথম অগ্রাধিকারে করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলাও রয়েছে। সংক্রমণ রুখতে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ববিধি মেনে চলাসহ সিডিসির নির্দেশনা অনুযায়ী সব স্বাস্থ্যবিধি কেন্দ্রীয় সরকারি ভবন, কর্মচারীর ক্ষেত্রে মেনে চলার নির্বাহী আদেশ দেবেন তিনি।
সব গভর্নর, সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, মেয়র, ব্যবসায়িক নেতা ও অন্যান্য সবাইকে মাস্ক পরা, দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্য সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বানও তিনি জানাবেন।
কঠিন এক পরিস্থিতি যে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন, লড়াই চালিয়ে এতদূর আসা বাইডেন সেটা ভালোই উপলব্ধি করছেন।
আর তাই ওয়াশিংটনে শপথ অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে ডেলাওয়্যারে নিজ শহরে জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, “এখন সময়টা অন্ধকার, কিন্তু আলো সবসময়ই আছে।”
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ