যুদ্ধাপরাধ: পাকিস্তানি সেনা শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন চূড়ান্ত

আপডেট: মার্চ ২২, ২০১৭, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক



বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে এই প্রথমবারের মতো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক এক সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ নামে সাবেক ওই বাঙালি ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটপাট-অগ্নিসংযোগ ও হত্যার মত মানবতাবিরোধী অপরাধের তিন ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হচ্ছে।
মঙ্গলবার ঢাকার ধানমন্ডিতে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়। এ মামলার আসামি শহীদুল্লাহর বয়স ৭৫ বছর, বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার আমিরাবাদ গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই এলাকাতেই তিনি যুদ্ধাপরাধ ঘটান বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পরে তিনি ঢাকা সেনানিবাস থেকে কুমিল্লার সেনানিবাসে যোগ দিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে নিজ এলাকা দাউদকান্দি সদরে ক্যাম্প স্থাপন করেন।
তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ না দেয়ায় শহীদুল্লার বিষয়ে কোনো রেকর্ড বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু আসামি এখনও তার এলাকায় ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে পরিচিত।
২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় জানিয়ে হান্নান বলেন, “দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত চলেছে। আজই এই প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করা হবে।”
প্রসিকিউশনের আবেদনে ট্রাইব্যুনাল গত বছর ২ অগাস্ট শহীদুল্লার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ওই দিনই কুমিল্লা জেলা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আসামিকে হাজির করা হলে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন- এমন অনেক বাঙালি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই তদন্ত চলছে জানিয়ে সানাউল হক বলেন, “তদন্তের স্বার্থেই তাদের নাম-ঠিকানা বা পরিচয় প্রকাশ করতে চাই না। আশা করি পরে ধাপে ধাপে তা আপনাদের কাছে তুলে ধরতে পারব।”
এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আলতাফুর রহমান জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে মোট ১৯ জনকে সাক্ষি করা হচ্ছে। এছাড়া জব্দ তালিকার সাক্ষি করা হয়েছে আরও তিনজনকে।
তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হকসহ কর্মকর্তারা এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
তিন অভিযোগ
অভিযোগ ১: একাত্তরের ৭ জুন বিকালে মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ পাকিস্তানি বাহিনীর ৮/১০ জন সদস্যসহ দাউদকান্দি বাজারে হামলা চালিয়ে হোমিও চিকিৎসক হাবিবুর রহমানকে আটক করেন। পাকিস্তানি ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতনের পর দাউদকান্দি ফেরিঘাটের পাশের গোমতি নদীতে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরে লাশ ফেলে দেয়া হয় নদীতে।
অভিযোগ ২: একাত্তরের ১৬ জুন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহিদুল্লাহ পাকিস্তানি বাহিনীর ৪০/৫০ জন সদস্যকে সঙ্গ নিয়ে দাউদকান্দির উত্তর ইউনিয়নের চেঙ্গাকান্দি ও গোলাপেরচর গ্রামে হামলা চালান। তারা স্বাধীনতার পক্ষের ২০ জনকে আটক করেন এবং পাঁচটি বাড়ির মালামাল লুট করে আগুন ধরিয়ে দেন।
আটকদের মধ্যে ছয়জনকে ছেড়ে দিয়ে বাকি ১৪ জনকে দাউদকান্দি সেনা ক্যাম্পে নেয়ার পথে গোলাপেরচর টেকে তাদের লাইন ধরে দাঁড় করানো হয়। সেখান থেকে একজনকে বের করে গোমতী নদীর পাশে নিয়ে গুলি করে লাশ নদীতে ফেলে দেন শহিদুল্লাহ। পরে অন্যদের ক্যাম্পে এনে নির্যাতনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে খবর দেয়ার শর্তে ছেড়ে দেয়া হয়।
অভিযোগ ৩: একাত্তরের ২১ জুলাই শহিদুল্লাহ পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে দাউদকান্দি বাজারে হামলা চালান। সেখান থেকে কালামিয়া নামে এক গাড়ি চালককে ধরে নির্যাতন চালানো হয়। পরে কালামিয়াকে চান্দিনা থানার চান্দিনা হাসাপাতালের পিছনে নিয়ে গুলি করে হত্যার পর লাশ খালে ফেলে দেন শহীদুল্লাহ।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার নিষ্পত্তির পর এ পর্যন্ত ছয়জনের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এরা সবাই রাজনীতিক; তাদের পাঁচজনই জামায়াতে ইসলামীর নেতা, একজন বিএনপি নেতা। এছাড়া আর যারা দণ্ডিত, তারাও মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী বা মুসলিম লীগে ছিলেন।
একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি নিধন শুরুর পর প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি অনেক সেনা সদস্য যুক্ত হয়েছিলেন। তবে পাকিস্তানেও আটকা পড়েন অনেক সেনা কর্মকর্তা।
বেসামরিক রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর পাশাপাশি বাঙালি সেনা সদস্যদের কেউ কেউ সে সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হয়ে স্বজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলেন।- বিডিনিউজ