যুদ্ধের অনিবার্যতা হয়তো এড়ানো যায়

আপডেট: ডিসেম্বর ৭, ২০২২, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়’… অথবা ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কতপ্রাণ হলো বলিদান’ গানদুটি বাংলাভাষার সাথে সচেতন ব্যক্তিবর্গ কমবেশি পরিচিত। আমরা সেই শৈশব থেকে শুনে আসছি। তবে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ভালো বুঝিনি। নানা সংঘাতে আজো বুঝি না।
স্বাধীনতা এবং মুক্তি মনুষ্যত্ব বিকাশের এপিঠ-ওপিঠ। একটিকে বাদ দিলে অপরটি পূর্ণ কার্যকর নয়। অথচ আমরা যুগের পর যুগ ধরে দিবসটি উদযাপন করে আসছি মহা সমারোহে। দিনটিকে সামনে রেখে আমরা আনন্দ-বিলাস কম করিনা। স্বাধীনতা ও মুক্তির সাথে যুদ্ধের সংশ্লিষ্টতা অবশ্যই আমাদের চেতনাকে আড়ষ্ট করে। তা হলে কি ভাববো আমরা। মুক্তির সাথে যুদ্ধ অভিধাটি যেন বিশিষ্ট থাকে। কথাটি সাধু; কিন্তু জগতের সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসের যুদ্ধকে কি অস্বীকার করে!
প্রাণী-কুল স্বাতন্ত্র্যবিলাসী। অন্যের অধীন থাকে যতদিন আত্মপরিচয় থাকে অজ্ঞাত। মুক্তির আকাক্সক্ষা সকল প্রাণীর প্রবল। তবে মনুষ্যপ্রাণীর প্রবলতর। তাই নিজেকে ও নিজের পরিবেশকে মুক্ত করতে সে মুক্ত কচ্ছ। তার অবিরাম প্রচেষ্টা রূপান্তরিত হয়েছে জনযুদ্ধে।
মানুষ ইতিহাসের কতটুকু আয়ত্ব করেছে। যেটুকু করেছে তাতে দেখা গেছে শক্তির প্রাবল্য। সে শক্তি অবশ্যি জনশক্তি। সে শক্তি দিয়েই অধিকার করায়ত্ব হয়। অনেক সময় অর্জিত অধিকার অস্ত্রের কাছে লুণ্ঠিত হলে অধিকারহারাদের পথে পথে ঘুরতে বাধ্য করে। নিজের বলতে তেমন কিছু থাকেনা। আজও তার ধারাবাহিকতা বর্তমান। তা হলে মানুষ তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে কাগজী সংগ্রাম করে চলেছে, তার সাফল্য খুব বেশি নেই। তাই যুদ্ধ হয়ে পড়ে অনিবার্য। এইতো সেদিন দেখা গেল গণতন্ত্রের সেবা প্রচারকারীদের মাথায় বসে কী ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে গেল!
অবিভক্ত ভারতের এক নিভৃতকোণে নানা সংঘাতের ভেতর দিয়ে আমরা সবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি। বারবার আমাদের মাথায় কড়ি মেরে আমাদের অধিকার বঞ্চিত করা হয়েছে। নানা মুখরোচক বাণী দিয়ে আমাদের ভোলাবার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা সেই কল্পলোকে বুঁদ হয়ে থেকেছি।
শতবর্ষেরও কিছু আগে আমরা জেগে ওঠার চেষ্টা করেছি। দেনদরবার কম হয়নি। কথায় কেউ আমল দেয়নি। আমলে আসলেও ব্যক্তিগত সুখকে মুক্তি ভেবে মুখ গুঁজে দিন গুজরান করেছি। বিদেশিরা আমাদের মাথার ওপর অস্ত্র রেখে শোষণ করে গেছে। আমাদের মুক্তির দিশা হারিয়ে গেছে।
এইতো সেদিন আমরা গা ঝেড়ে উঠলাম, তাও আবার ধর্মের ভিত্তিতে এবং সন্দেহাতীতভাবে তা বহুধাবিভক্ত! বাংলার মানুষের মুক্তির মুক্তিকণ্ঠ শোনা গেল গত শতকের চার এর দশকে, বলতে গেলে বাংলার মানুষের এক মুক্তিপ্রিয় গৃহী ব্যক্তির কণ্ঠে। সে ছিলো প্রকৃত মুক্তির আহ্বান। সে আহ্বান ধ্বনিত হলো আমাদের তন্ত্রীতে। আমরা একত্রিত হলাম। নির্বাচন হলো। পরের ইতিহাস, বিশ^ ইতিহাস যেন সবার জানা।
ধর্মের প্রাধান্য এখানে ছিলোনা। মানুষ তখন অধিকাংশই ছিলো মুক্তিপ্রয়াসী। আমরা বিজয়ী হলাম সেই নির্বাচনে তবে ক্ষমতার নাগালে থেকে বহুদূরে। নানা ছলনার আশ্রয় নিয়ে আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হলো। ইতিহাসের বিস্ময়, নিজেদের সম্পদ নিজেরা আগলিয়ে রাখবো, সে অধিকার থেকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করা হলো। আমরা প্রায় খালি হাতে মনের শক্তিতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। প্রতিবেশী ভারত নানাভাবে আমাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের গ্রামীণ তরুণরা বেশিরভাগ যুদ্ধে গেছে। আমরা বীরের জাতি হিসেবে যুদ্ধ জয় করেছি। অথচ কখনোই আমরা যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। আমাদের বাধ্য করা হয়েছে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে। আমরা আমাদের অসংখ্য স্বজন হারিয়ে পেয়েছি দেশ। যার জন্য আমাদের চিরকালের আকুতি। অনস্বীকার্য যে যুদ্ধ ছিলো অনিবার্য, তাই আমাদের ত্যাগের বোঝা ছিলো দুর্বহ। আমরা স্বাধীন হয়েছি। গঁতে বাঁধা ভাষায়। জন স্টুয়ার্ট্ মিল যাকে বলেছেন ডেড আইডিয়া। আমরা আশা করেছিলাম আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার পরিসমাপ্তি। হয়নি। হবে কি আদৌ!
কারণে-অকারণে না চেয়েও যুদ্ধ আসে। যা এড়িযে যেতে পারছে কতজন। স্বীকার্য, আমাদের একাত্তরের যুদ্ধ ছিলো আমাদের অস্তিত্বের চাবি-কাঠি। যা এড়িয়ে যাওয়া ছিলো মৃত্যুসেলের অধিক। আর আত্মসমর্পণ করলে তাৎক্ষণিক প্রাণরক্ষা; কিন্তু তিল তিল করে দহনে আত্মনিমজ্জন। যা মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণার।
মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি। কৃষক-শ্রমিক, রণজীবী মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে। যাদের অধিকাংশ বিলীন হয়ে গেছে। অধিকাংশ যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁদের অনেকেই ছিলেন উভয়কুলাশ্রয়ী। জয়ী হলে একটা সুখকর পদ, আর বিপরীত হলে কর্তৃত্ব না পেলেও পদলেহী হয়ে দিন গুজরান। সে অবস্থা আমাদের পিছু ছাড়েনি।
যুদ্ধ ছিলো, আছে এবং থাকবে। হাতের নাগালে শক্ত হাতিয়ার আর ঘরে খাবারের ব্যবস্থা থাকলে মানুষ অনেকটা নিষ্ক্রিয় থাকে। টান পড়লেই উপায় খোঁজে। তখন থেকে মুক্তির সর্বশেষ শিক্ষা হলো মানবমুক্তির চেতনা। সেখানে থাকবে জীবনমুখি যুক্তি আর মানুষের জন্য ত্যাগ। তাতে হয়তো যুদ্ধ তফাৎ থাকে আর শুভবুদ্ধির আলোকে জীবন উদ্ভাসিত হবে। তখন আনন্দ গানই হবে মানুষের জীবন সংগীত।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ