যে কথা হয়নি বলা

আপডেট: জানুয়ারি ২৯, ২০২০, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
২৫ মার্চ, ১৯৭১ রাত একটা তিরিশ মিনিট বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা সেনানিবাসে এবং এর তিনদিন পর তাঁকে বন্দি অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় করাচিতে। করাচি বিমান বন্দরে অবস্থানকালে তাঁর একটি ছবি মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়। সেই ছবিতে দেখা গেল দুইজন সশস্ত্র প্রহরীর মাঝখানে বঙ্গবন্ধু সোফাতে বসে আছেন বিমর্ষ অবস্থায় যা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাঁর মুখের হাসি কোত্থেকে থাকবে। কোথায় বাংলাদেশ, কোথায় জনগণ, কোথায় তাঁর পরিবারের সদস্যগণ। সব কিছুইতো অনিশ্চিত। এদিকে বেগম মুজিবও দারুণ চিন্তিত। কোথায় আছেন বঙ্গবন্ধু, কীভাবে আছেন, জীবিত আছেনতো? এইসব চিন্তাভাবনা করে তিনিও বিনিদ্র রাত্রি যাপন করতে লাগলেন। এই অনিশ্চয়তা ভীতি চলতে থাকে মাসের পর মাস অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। এইভাবে বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব দীর্ঘ নয় মাসের বেশি সময় ধরে দুর্বিসহ জীবন কাটিয়েছেন। ঘরে তিন ছেলে, দুই মেয়ে সবই নাবালক। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা আরও বেশি। তার চিন্তা বাংলাদেশের জনগণ ও তাঁর প্রাণপ্রিয় পরিবারের সদস্য।
বাংলাদেশের সকল ফ্রন্টে যুদ্ধ চলছে, এদেশের কোটি কোটি মানুষ দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছে। এর মধ্যেই আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে এলো শেখ হাসিনার কোল জুড়ে একটি ফুট ফুটে পুত্রসন্তান। তারিখটা ছিল ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই। সেই মুহুর্তে বঙ্গবন্ধু থাকলে ৩২ নম্বর বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো, হাজার হাজার মানুষকে মিষ্টি মুখ করানো হতো, আনন্দ, ফূর্তি হতো। কিন্তু কোথায় বঙ্গবন্ধু? সব কিছুই অনিশ্চিত। বঙ্গবন্ধু থাকলে কত না খুশি হতেন। তাঁর প্রথম সন্তানের প্রথম সন্তান অর্থাৎ তিনি নানা হয়েছেন। এর থেকে খুশির খবর আর কি হতে পারে। সবকিছুই অনিশ্চিয়তার মধ্যে দিয়েই কাটতে লাগলো। বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন তো? পরে অবশ্য বঙ্গবন্ধুই এই শিশুর নাম রেখেছিলেন সজীব ওয়াজেদ জয়। এই নামের একটি যৌক্তিকতাও ছিল। সজীব অর্থ জীবন্ত, সতেজ, ওয়াজেদ শিশুর পিতার নাম আর জয় শব্দটা তিনি নিয়েছেন বিজয় থেকে।
পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুকে করাচি থেকে লায়ালপুর, পাঞ্জাব জেলে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। জেলখানার জীবন আরও দুর্বিসহ। সেখানে তিনি দেশে বিদেশের কোনো সংবাদই পেতেন না। নয়মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে স্বাধীন হয়েছে সে খবরও তাঁকে জানতে দেয়া হয়নি। তারা এতো বড় একজন জাতীয় নেতাকে জেলখানায় না রেখে, কোনো একটা বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখতে পারতো। অন্তত মাসে একবার তাঁর পবিবারের সঙ্গে টেলিফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়ে দিতো পারতো। তারা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে মেতে উঠেছিলো। বঙ্গবন্ধু কখনই রক্তপাতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর আন্দোলন ছিলো সব সময় শান্তিপূর্ণ। তবে তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক দর্শনে কিছুটা হলেও প্রভাবিত হয়েছিলেন। অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ স্বৈর শাসক মানবতাবাদী নেতা নেলসন মেন্ডেলাকে দক্ষিণ আফ্রিকার ছোট একটি দ্বীপে ২৮ বছর ধরে বন্দি করে রেখেছিলো। তবুও মেন্ডেলা পরাজিত হননি। তিনি সসম্মানে মুক্তি পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের পদ অলংকৃত করেছিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরই আন্তর্জাতিক চাপে জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। দ্বিতীয়ত, ভুট্টোর ধারণা ছিল যে, ভারত পূর্বপাকিস্তান দখল করে নিয়েছে। কাজেই বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে না দিলে এবং তিনি বাংলাদেশে যেতে না পারলে ভারত হয়তো বা বাংলাদেশের মাটি থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করবে না। তাই তিনি তড়িঘড়ি করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিয়ে কিছুটা হলেও আত্মতৃপ্তি লাভ করলেন। আট জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুকে কড়া প্রহরায় বিমানযোগে লন্ডন পাঠিয়ে দেয়া হয়। লন্ডনে পৌঁছে বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম জানতে পারেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। তিনি এই স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি। তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। যা হোক, ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে রাজকীয় বিমানযোগে ঢাকা রওয়ানা হয়ে পথে ভারতের নয়া দিল্লিতে স্বল্প সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি করেন। নয়াদিল্লিতে অবতরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারত সরকার ও ভারতের জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। ভারতবাসী নিজের অনেক ক্ষতি স্বীকার করেও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। যা হোক ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে পর্দাপণ করেন। ঢাকা বিমান বন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য লাখো মানুষের সমাগম ঘটেছিলো। সেখান থেকে সোজা চলে যান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবং সেখানে এক বিরাট জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে ভাষণ দিয়েছিলেন। আবার সেই বজ্রকন্ঠ। তাঁর শরীর বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু কন্ঠের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেখান থেকে বাসায় ফিরে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন। দীর্ঘ নয় মাসের বেশি সময় ধরে তাঁদের যে দুর্বিসহ জীবন কাটাতে হয়েছিল তার সমাপ্তি ঘটে। আমরা সবসময়ই চিন্তিত ছিলাম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। তিনি কোথায় আছেন, কিভাবে আছেন, আদৌ জীবিত আছেন কিনা? বঙ্গবন্ধু সুদূর পাকিস্তানের জেলে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছিলেন আর তাঁর চিন্তা ছিল বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যে কি জুটলো। আমার কত লক্ষ মানুষকে তারা হত্যা করলো। তার পরিবারের সদস্য বিশেষ করে নাবালক সন্তানেরা কে কোথায় আছে, কেমন আছে, কোনো কিছুইতো জানা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু বেগম মুজিব, এক মহীয়সী নারী কিভাবে যে তার নাবালক সন্তানদের নিয়ে দুর্বিসহ জীবন কাটিয়েছেন সে চিন্তা কি আমরা কোনোদিন করেছি? সেই সময় প্রতিটি মুহূর্ত ছিল ভয়াবহ, অনিশ্চিত, মৃত্যুর প্রহর গনা ছাড়া আর কিইবা ছিল। অন্যদিকে শেখ হাসিনার কোলে নবজাতক শিশুর কতই না আদরের। কোথায় বঙ্গবন্ধু! তাঁরই কি মর্মপীড়া কম হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নেই তো কোনো আনন্দফূর্তি নেই। এই বিষয়গুলো কি আমরা কোনোদিন অনুধাবন করেছি? দেশ স্বাধীন করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের যে ত্যাগ তা ইতিহাস নজিরবিহীন।
যা হোক, বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের মাত্র দুই মাসের মাথায় অর্থাৎ মার্চ মাসের ১২ তারিখ ঢাকা স্টেডিয়ামে ভারতীয় বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিজয়ী কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অভিবাদন গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী মিত্রবাহিনী ভারতীয় স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সকল সদস্য ভারতে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে।
এখানে উল্লেখ্য যে, ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন সময়ে বড় বড় রাজনৈতিক সভায় যোগদান ও বক্তৃতা উপলক্ষে এবং দলীয় সংগঠন ও প্রচার কাজে মাঝ মধ্যেই রাজশাহী আসতেন এবং তার সঙ্গীদের নিয়ে অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের বাসায় রাত্রি যাপন করতেন। তাঁর বাসাটা বেশ বড় ছিল এবং সন্নিকটেই মাদ্রাসার মাঠ। বড় বড় সভা সম্মেলন এই মাঠেই হতো।
(চলবে)
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা